শনিবার, ১৪ মার্চ, ২০২৬, ঢাকা

হাতিয়ায় রেনু মাছের শুঁটকি তৈরির ধুম, বেড়েছে শিশু শ্রমের ঝুঁকিও

ছায়েদ আহামেদ, প্রতিনিধি হাতিয়া (নোয়াখালী)
প্রকাশিত: ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮:৩৩ পিএম

শেয়ার করুন:

dried fish Hatiya 3
হাতিয়ায় রেনু বা ছোট আকৃতির মাছের শুঁটকি উৎপাদনে কর্মযজ্ঞ। ছবি- ঢাকা মেইল

সারি সারি মাছ রোদে বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। কেউ মাছ বিছাচ্ছেন, কেউবা উল্টে-পাল্টে দিচ্ছেন। আবার কেউ কেউ শুকানো মাছ গুছিয়ে রাখছেন।

নোয়াখালীর উপকূলীয় হাতিয়া উপজেলার রহমত বাজার গোলপাতা পর্যটন কেন্দ্রের পাশে খোলা জায়গায় এখনকার নিত্যদিনের চিত্র এটি।


বিজ্ঞাপন


শুধু রহমত বাজার এলাকাই নয়, হাতিয়ার বিভিন্ন মৎস্য ঘাটে এখন সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত চলছে মাছ শুকিয়ে শুঁটকি উৎপাদনে কর্মযজ্ঞ।

রেণু মাছ, ছোট চিংড়ি ও ছেউয়া মাছ প্রক্রিয়াজাত করে শুঁটকি তৈরিতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন স্থানীয় জেলে পরিবারগুলো।

তাদের ভাষ্য, চলতি মৌসুমে উৎপাদন তুলনামূলক ভালো হওয়ায় আয়ও বেড়েছে।

dried_fish_Hatiya_1
হাতিয়ায় শুঁটকি উৎপাদনে চলছে কর্মযজ্ঞ। ছবি- ঢাকা মেইল

হাতিয়ার কাজিরবাজার, জঙ্গলিয়া, জাহাজমারা কাটাখালী ও নিঝুমদ্বীপ এলাকা সরেজমিনে ঘুরেও জেলেদের শুঁটকি উৎপাদনে জেলে পরিবারের কর্মব্যস্ততা লক্ষ্য করা গেছে।

শুঁটকি উৎপাদনকারীরা বলছেন, ছোট চিংড়ির শুঁটকি মাছ চাষ ও পশু খাদ্যের জন্য মণপ্রতি ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

হাতিয়ার খাসের হাট, ওছখালী ও তমরুদ্দি বাজার ছাড়াও জেলার বাইরেও ব্যবসায়ীদের কাছে এসব শুঁটকি সরবরাহ করা হচ্ছে।

এ মৌসুমে উৎপাদন তুলনামূলক ভালো হচ্ছে। তাই আয় ও লাভ দুটুই বেড়েছে বলে জানিয়েছেন শুঁটকি উৎপাদনকারী।

স্থানীয় জেলেরা জানিয়েছেন, গত এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে জেলেদের জালে প্রচুর পরিমাণে ছেউয়া মাছ ধরা পড়ছে। বড় আকৃতির তাজা ছেউয়া মাছ পাইকারি বাজারে কেজিপ্রতি ৬০ থেকে ১০০ টাকা দরে বিক্রি হলেও অপেক্ষাকৃত ছোট মাছগুলো শুঁটকি উৎপাদনের জন্য খোলা মাঠে শুকানো হচ্ছে।

প্রাকৃতিকভাবে শুকানো এসব শুঁটকির স্বাদ আলাদা হওয়ায় পর্যটকরাও কিনে নিয়ে যাচ্ছেন বলে জানান ব্যবসায়ীরা।

রেণু মাছ শুকানোতে মারাত্মক ক্ষতির শঙ্কা

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, শুঁটকি তৈরিতে অনেক ক্ষেত্রেই রেনু মাছ শুকানো হচ্ছে। বিশেষ করে সেখানে জেলেদের জালে প্রচুর পরিমাণে ছোট আকৃতির চিংড়ি ধরা পড়ছে। রেনু মাছ ও ছোট চিংড়ির চাহিদা একেবারেই কম। এগুলো ব্যবসায়ীরা নিচ্ছেন না। ফলে এগুলো শুকিয়ে শুঁটকি তৈরি করছেন জেলেরা।

dried_fish_Hatiya
হাতিয়ায় শুঁটকি করার জন্য স্তুপ করে রাখা আছে ছোট আকৃতির চিংড়ি ও রেনু মাছ। ছবি- ঢাকা মেইল

বিপুল পরিমাণ এই ছোট মাছ শুঁটকি বানানোর কারণে লাভের আড়ালে ক্ষতিই বেশি হচ্ছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল। কারণ এতে ভবিষ্যতে মৎস্য সম্পদের মারাত্মক ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের গুরুত্ব দেওয়া কথা বলছেন স্থানীয়দের একটি অংশ।

শুঁটকি উৎপাদনের মাধ্যমে একদিকে যেমন স্থানীয়দের জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, অন্যদিকে মৌসুমজুড়ে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে। জেলে পরিবারগুলো বলছেন, স্থানীয় উৎপাদকদের প্রত্যেকের অধীনে গড়ে ১০ থেকে ১২ জন করে শ্রমিক কাজ করছে। কেউ দৈনিক মজুরিতে, কেউ আবার মাসিক বেতনে কাজ করছে।

শিশুশ্রমের বেড়াজালে শৈশব

কিন্ত হাতিয়ার শুঁকটি শুকানোর মাঠগুলোতে শিশু ও কিশোর বয়সী শ্রমিকদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। সোহেলের বয়স এখন ১২ বছর। আর আলিফের বয়স ১০ বছর। তাদের সঙ্গে আছে ৭-৮ বছরের রিপন ও সাইফুলও।

dried_fish_Hatiya_2
হাতিয়ায় শুঁটকি উৎপাদনে বড়দের সঙ্গে কাজে নিয়োজিত আছে শিশু-কিশোররাও। ছবি- ঢাকা মেইল

সোহেল জানায়, সে মাসিক ৫ হাজার টাকা বেতনে নবীর মাঝির অধীনে কাজ করে। আলিফও একই হারে বেতন পায়। তবে রিপন ও সাইফুল জানায়, তারা দৈনিক ২০০ থেকে ৩০০ টাকা মজুরিতে কাজ করছে।

তবে শিশু ও কিশোর শ্রমের ব্যবহার সামাজিক ও আইনী দিক থেকে উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

হাতির শুঁটকি উৎপাদন নিয়ে যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা

ব্যবসায়ী নবীর জানান, প্রতি মৌসুমে হাতিয়া থেকে লাখ লাখ টাকার শুঁটকি দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়।

‘এতে স্থানীয় অর্থনীতিতে গতি এলেও উৎপাদন প্রক্রিয়াটি এখনো পুরোপুরি অপ্রাতিষ্ঠানিক রয়ে গেছে’, বলেন হাতিয়ার এই শুঁটকি ব্যবসায়ী।

dried_fish_Hatiya_4
হাতিয়ায় শুঁটকি উৎপাদনে চলছে কর্মযজ্ঞ। ছবি- ঢাকা মেইল

এ বিষয়ে হাতিয়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. ফয়জুর রহমান বলেন,  যেসব এলাকায় শুঁটকি উৎপাদন হচ্ছে, সেখানে উৎপাদকদের আগ্রহ থাকলে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে।

‘এতে কেমিক্যালমুক্ত ও পরিবেশবান্ধব উপায়ে শুঁটকি উৎপাদন সম্ভব হবে’, যোগ করেন মৎস কর্মকর্তা।

সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা, মৎস্য সম্পদ সংরক্ষণ ও শিশু শ্রম নিরুৎসাহিত করার উদ্যোগ নেওয়া গেলে শুঁটকি শিল্প হাতিয়ার জন্য হতে পারে টেকসই আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত।

তবে তাদের এও আশঙ্কা,  মৎস্য সম্পদ সংরক্ষণ ও শিশু শ্রম নিরুৎসাহিত না করে তাৎক্ষণিক লাভের চিন্তা করলে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির বুঝা বইতে হতে পারে দ্বীপবাসীকেই।

এএম

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর