ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের বাকি আর মাত্র কয়েকদিন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টায় ভোটগ্রহণ শুরু হবে। হাতে আছে সপ্তাহখানেক সময়, তাই দিন রাত একটানা নিজেদের প্রচার প্রচারণা চালাচ্ছেন সংসদ সদস্য পদ প্রার্থীরা। আর প্রার্থীদের নানাবিধ গুণাবলি বিচার বিশ্লেষণ করে ভোটের সমীকরণ মেলাচ্ছেন সাধারণ ভোটাররা।
পদ্মা নদী তীরবর্তী জেলা রাজবাড়ী। রাজবাড়ী জেলা বাংলাদেশের মধ্যাঞ্চলের ঢাকা বিভাগের একটি প্রশাসনিক অঞ্চল। এটি মূলত নদী বিধৌত একটি পলিগঠিত এলাকা, যা ১৮১১ সালে ফরিদপুর জেলার অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং পরবর্তীতে ১৯৮৪ সালের ১ মার্চ পূর্ণাঙ্গ জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
বিজ্ঞাপন
রাজবাড়ী জেলায় রয়েছে ৫টি উপজেলা। এর মধ্যে রাজবাড়ী সদর ও গোয়ালন্দ উপজেলা নিয়ে রাজবাড়ী- ১ ও পাংশা,কালুখালী ও বালিয়াকান্দি উপজেলা নিয়ে রাজবাড়ী- ২ আসন গঠিত।
রাজবাড়ী-১ আসনে এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন মোট ৪ জন। এদের মধ্যে (১) বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকে আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম, (২) বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে মো. নূরুল ইসলাম, (৩) জাতীয় পার্টি লাঙল প্রতীকে খোন্দকার হাবিবুর রহমান, (৪) জাকের পার্টি গোলাপফুল প্রতীকে মোহাম্মদ আলী বিশ্বাস ভোটের মাঠে নেমেছেন।

এদিকে রাজবাড়ী -২ আসনে এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন মোট ৯ জন। এদের মধ্যে (১) বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকে মো. হারুন অর রশীদ, (২) জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপি শাপলাকলি প্রতীকে জামিল হিজাযী (৩) খেলাফত মজলিস দেয়াল ঘড়ি প্রতীকে কাজী মিনহাজুল আলম (৪) গণ অধিকার পরিষদ জিওপি ট্রাক প্রতীকে জাহিদ সেখ (৫) বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট হাতের লাঠি প্রতীকে মো. আব্দুল মালেক মন্ডল, (৬) স্বতন্ত্র হিসেবে কলস প্রতীকে মো. নাসিরুল হক সাবু (৭) জাতীয় পার্টি লাঙল প্রতীকে মো. শফিউল আজম খান (৮) ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ হাত পাখা প্রতীকে মোহা. আব্দুল মালেক (৯) স্বতন্ত্র ফুটবল প্রতীকে সোহেল মোল্লা ভোটের মাঠে নেমেছেন।
বিজ্ঞাপন
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে জমে উঠছে নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণা। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থী ও নেতাকর্মীরা মাঠে নেমে ভোটারদের কাছে নিজেদের পক্ষে সমর্থন চাইছেন। গ্রাম থেকে শুরু করে হাট-বাজার, গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও জনসমাগমস্থলে চলছে পথসভা, গণসংযোগ ও লিফলেট বিতরণ।
প্রার্থীরা ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময় করে উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। রাস্তাঘাটের উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নসহ এলাকার সার্বিক উন্নয়নকে সামনে রেখে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। পোস্টার, ব্যানার ও মাইকিংয়ের মাধ্যমে প্রার্থীদের প্রচারণায় সরব হয়ে উঠেছে পুরো রাজবাড়ী জেলার দুটি আসন।
রিকশাচালক করিম শেখ বলেন, আমরা এমন একজন এমপি চাই যিনি নিজের আখের গোছাবেন না, গরিব অসহায় মানুষের কল্যাণে কাজ করবেন।
শিক্ষার্থী সুমন ইসলাম বলেন, রাজবাড়ী জেলায় শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মান উন্নয়নের বিষয়ে যিনি গুরুত্ব দেবেন তাকেই ভোট দেব।

গৃহবধূ নাফিসা বেগম বলেন, নারী অধিকারের বিষয়ে আমরা গুরুত্ব চাই। এমন একজন কে এমপি হিসেবে চাই যিনি নারীদের শিক্ষা, কর্মসংস্থানসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করবেন।
রাজবাড়ী-১ আসনে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম বলেন, আমাদের এ এলাকায় পদ্মা সেতুটা খুবই দরকার। এখানে পদ্মা সেতু হলে ঢাকার দূরত্ব কমে যাবে। আমরা ১৯৯২ সাল থেকে এখানে পদ্মা সেতুর জন্য অনেক আন্দোলন, মিছিল, মিটিং করেছি। কিন্তু পদ্মা সেতু চলে গেল ঐদিকে। মাওয়া পদ্মা সেতু হওয়ার পর আমরা হতাশায় পড়ে গেলাম, পরে আমরা ভেবেছি আর দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ঘাটে আর পদ্মা সেতু বা ব্যারেজ হবে না। আমরা ভাবলাম আমাদের এখানে আর উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। এখন যে সুযোগটা আমাদের সামনে আসছে আমরা ইচ্ছা করলে সামনে পদ্মা সেতু করতে পারি। পদ্মা সেতু হলে এই অঞ্চলে গ্যাসের লাইন, শিল্প কারখানা, বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজসহ বিভিন্ন ব্যবসা বাণিজ্য বাড়বে। কোনো লোক তখন ঢাকা থাকবেনা। পদ্মা সেতু হলে দ্রুত ঢাকায় যাওয়া যাবে এবং বাড়ি থেকে অফিস করা যাবে। পদ্মা সেতু হলে এই অঞ্চলের মাটি সোনায় পরিণত হবে। আমাদের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া রাজবাড়ী এসে কিন্তু পদ্মা সেতু করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকার এখানকার পদ্মা সেতুর কোনো কাজই বাস্তবায়ন করেনি। তাই আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল পরিমাণ ধানের শীষে ভোট দিয়ে দেশকে উন্নয়ন করার সুযোগ দিন আপনারা।

রাজবাড়ী-১ আসনের ১১ দলীয় জোটের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী অ্যাড. মো. নূরুল ইসলাম বলেন, গত ৫৪ বছরে তিনটি দল ক্ষমতায় ছিল। তারা শাসন করেছে দেশ, তাদের মাধ্যমে শুধু ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে, শাসন আর শোষণের পালাবদল হয়েছে। তাদের টার্গেট হলো শুধু ক্ষমতায় থাকা। ক্ষমতায় গিয়ে সম্পদ আহরণ করা, নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করা। নিজেদেরকে মোটাতাজাকরণ করা ও আত্মীয়দের মোটাতাজাকরণ করাই হচ্ছে তাদের লক্ষ্য। তাদের মাধ্যমে দেশের মানুষের ভাগ্যের কোনো উন্নয়ন হয়নি। এই ৫৪ বছরে আমাদের ভাগ্যকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হয়েছে। এই ৫৪ বছরে আমাদের অর্থনৈতিক মুক্তি আসেনি, গণতান্ত্রিক মুক্তি আসেনি, মত প্রকাশের স্বাধীনতা আসেনি, ভোটাধিকার ফিরে আসেনি। সারাদেশের মানুষ তাদেরকে আজ প্রত্যাখান করেছে। তাই আমরা স্বপ্ন দেখছি ৫৪ বছর পর দেশে একটা পরিবর্তন আনার জন্য। এখন আমাদের সময় এসেছে দেশকে নতুন করে গড়ার। দেশবাসী জামায়াতে ইসলামীকে মুক্তির ঠিকানা হিসেবে গ্রহণ করেছে।
রাজবাড়ী-২ আসনের ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী জামিল হিজাযী বলেন, এই এলাকার প্রধান সমস্যাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো চাঁদাবাজি। আমরা এই রাজবাড়ীর মাটি থেকে চাঁদাবাজি নির্মূল করে ছাড়ব। এ অঞ্চলের হাট-বাজারে মাত্রা অতিরিক্ত খাজনা নেওয়া হয় সেটা আমরা বন্ধ করে দেব। পদ্মা নদী ও পদ্মা নদীর তীরবর্তী যে গ্রামগুলো রয়েছে সেই গ্রামগুলোতে আমরা রিভার এবং ভিলেজ টুরিজম করব। নারী শিক্ষার জন্য কালুখালীতে যে মহিলা কলেজটি রয়েছে সেটি এখনো এমপিওভুক্ত হয়নি আমরা সেটিকে এমপিওভুক্ত করে সরকারীকরণের জন্য দাবি জানাব।

রিটার্নিং অফিসার ও জেলা প্রশাসক সুলতানা আক্তার বলেন, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট-২০২৬ উপলক্ষে রাজবাড়ী-১ ও ২ আসনের ভোটগ্রহণকারী প্রিজাইডিং, সহকারী প্রিজাইডিং ও পোলিং অফিসারদের প্রশিক্ষণ কর্মশালায় দায়িত্ব, কর্তব্য ও নির্বাচনকালীন করণীয় ও বর্জনীয় বিষয় সম্পর্কে অবগত করা হয়েছে। একটি অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ একটি সুন্দর নির্বাচন নিশ্চিতকরণে আইন অনুযায়ী নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে সচেতন থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। রাজবাড়ীতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে উৎসবমুখর পরিবেশ বজায় রাখতে এবং প্রার্থীর সমর্থকদেরকে নির্বাচনি আচরণ বিধিমালা প্রতিপালনের বিষয়ে সচেতন করতে মোবাইল কোর্ট ও টহল অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। আচরণ বিধিমালার দায়িত্বে নিয়োজিত এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবিসহ যৌথ টহল অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব প্রার্থী ও তাদের কর্মী সমর্থকদের নির্বাচনি আচরণবিধি সঠিকভাবে মেনে চলার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, রাজবাড়ী-১ আসনে দুটি উপজেলার ১৮টি ইউনিয়ন ও ২টি পৌরসভার মোট ভোটার রয়েছে ৪ লাখ ৩০ হাজার ২১৫ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ১৬ হাজার ১৪৯ জন, মহিলা ২ লাখ ১৪ হাজার ৫৮ জন ও তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ৮ জন এবং ভোট কেন্দ্র রয়েছে ১৫৬টি।
অপর দিকে রাজবাড়ী ২ আসনে ৩টি উপজেলা, ১টি পৌরসভা ও ২৪টি ইউনিয়নে মোট ভোটার সংখ্যা রয়েছে ৫ লাখ ৫৯ হাজার ৬৯৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৮৫ হাজার ৬০৯ জন, মহিলা ২ লাখ ৭৪ হাজার ৭৯ জন ও তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ৫ জন এবং ভোট কেন্দ্র রয়েছে ১৯৮টি।
প্রতিনিধি/এসএস

