একুশে পদকপ্রাপ্ত লালনপন্থি সাধক কবি খোদা বক্স সাঁইয়ের দুই দিনব্যাপী ৩৬তম স্মরণানুষ্ঠান শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার জাহাপুর গ্রামে কবির আখড়াবাড়িতে এই স্মরণানুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়।
স্মরণানুষ্ঠান উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাঁচ শতাধিক সাধু-বাউল ও ভক্ত-অনুসারী কবির আখড়াবাড়িতে সমবেত হয়েছেন। প্রথম দিনের আয়োজনের মধ্যে ছিল প্রদীপ প্রজ্বলন, দিন ডাকা, সাধুদের ভক্তি নিবেদন, মুড়ি সেবা, কবির জীবন ও দর্শন নিয়ে আলোচনা, সংগীতানুষ্ঠান এবং মধ্যরাতে অধিবাস।
বিজ্ঞাপন

অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলা একাডেমির উপপরিচালক সাইমন জাকারিয়া, কণ্ঠশিল্পী সৃজনী তানিয়া এবং কবির একমাত্র ছেলে বাউল আবদুল লতিফ শাহ।
অনুষ্ঠানের শুরুতে কবির পরিবারের সদস্য ও ভক্তরা খোদা বক্স সাঁইয়ের সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর বাউলশিল্পীরা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে কবির লেখা ও সুর করা গান পরিবেশন করেন। এ সময় লালন শাহর গানও পরিবেশিত হয়।

বিজ্ঞাপন
কবির একমাত্র ছেলে বাউল আবদুল লতিফ শাহ বলেন, স্মরণানুষ্ঠানকে ঘিরে দীর্ঘদিনের ধারাবাহিকতায় এবারও আখড়াবাড়িতে বাউলদের মিলনমেলা বসেছে। বাবার লেখা এক হাজারেরও বেশি গান রয়েছে। দূরদূরান্ত থেকে আগত পাঁচ শতাধিক সাধু-বাউল এসব গান পরিবেশন করবেন। তারা সবাই নিরামিষভোজী। শুক্রবার সকালে দুধের পায়েস এবং দুপুরে পূর্ণ সেবার (দুপুরের আহার) মধ্য দিয়ে আয়োজনের সমাপ্তি ঘটবে। এরপর সবাই নিজ নিজ আখড়ায় ফিরে যাবেন।

কবি খোদা বক্স সাঁইয়ের নাতনি ও কণ্ঠশিল্পী সৃজনী তানিয়া বলেন, আজ আমার দাদুর তিরোধান দিবস। সামনে নির্বাচন এবং দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতির মধ্যেও গ্রামবাসী ও প্রশাসনের সহযোগিতায় প্রতিবছরের মতো এবারও স্মরণানুষ্ঠানটি সুন্দরভাবে আয়োজন করা হয়েছে। আমি আমার দাদুকে চিনেছি তার ভক্তবৃন্দ ও রচিত সংগীতের মাধ্যমে। তার বাণীতেই আমি তার অস্তিত্ব অনুভব করেছি। তার রচিত উল্লেখযোগ্য গানগুলোর একটি হলো- 'শুভ সাধুসঙ্গ লয়ে সাঙ্গপাঙ্গ'।
বাংলা একাডেমির উপ-পরিচালক সাইমন জাকারিয়া বলেন, একুশে পদক ও বাংলা একাডেমির সম্মানসূচক ফেলোশিপপ্রাপ্ত লালনপন্থি সাধক, সংগীতগুরু, সুরকার ও কবি সংগীতসাগর খোদা বক্স সাঁইজির তিরোধান দিবস উপলক্ষে এই সাধুসঙ্গ শুরু হয়েছে। ফকির লালন–পরবর্তী বাংলাদেশে হাতে গোনা যে কজন সাধু-বাউল আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছেন, তাদের মধ্যে খোদা বক্স সাঁইজি অন্যতম।

তিনি আরও বলেন, জীবদ্দশায় তিনি প্রায় এক হাজার গান রচনা করেছেন। এসব গানে সুফি সাধনা, দেহতত্ত্ব, মারফতি, কীর্তন, গোষ্ঠগান, মায়ের বন্দনা, শ্যামাসঙ্গীত, শিবসঙ্গীতসহ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বাংলাদেশকে ধারণ করা হয়েছে। এই গানগুলো দুই বাংলার বাউলদের মুখে মুখে ফেরে।
সাইমন জাকারিয়া জানান, খোদা বক্স সাঁইজির শিষ্যদের মধ্যে অনেক কিংবদন্তি শিল্পী রয়েছেন। সম্প্রতি প্রয়াত লালনগীতির সম্রাজ্ঞী ফরিদা পারভীন ছাড়াও জীবিতদের মধ্যে দীপ্তি রাজবংশী, চন্দনা মজুমদার ও দিল আফরোজ রেবা তারই শিষ্য, যারা বিশ্বব্যাপী তার গান ছড়িয়ে দিয়েছেন।

উল্লেখ্য, ১৯৯০ সালের ১৫ জানুয়ারি (পয়লা মাঘ) খোদা বক্স সাঁই প্রয়াত হন। একই বছরের একুশে ফেব্রুয়ারি তৎকালীন সরকার তাকে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করে।
প্রতিনিধি/এসএস

