আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে দেশজুড়ে রাজনীতির মাঠ সরগরম হয়ে উঠেছে। কিন্তু শরীয়তপুরের রাজনৈতিক চিত্র আগের তুলনায় একেবারেই ভিন্ন। দীর্ঘদিন ক্ষমতাসীন দল হিসেবে আওয়ামী লীগের দৃঢ় উপস্থিতি আর নিয়ন্ত্রণের জায়গা এবার হঠাৎ নীরব। মাঠে তাদের অনুপস্থিতি এক ধরনের শূন্যতা তৈরি করেছে, যা রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের নতুন করে তাদের অবস্থান শক্ত করার সুযোগ দিয়েছে। এ পরিস্থিতি ভোটারদের মধ্যে নৈতিকতা, সততা ও আল্লাহভীতি-ভিত্তিক নেতৃত্বের দিকে আকর্ষণ বাড়িয়েছে, ফলে ভোটের মাঠ যেন নতুন ধারণায় রঙিন হয়ে উঠেছে।
শরীয়তপুর–১ (সদর–জাজিরা): আধিপত্যের ইতিহাস, বদলে যাওয়া রাজনীতি
বিজ্ঞাপন
দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের অপ্রতিদ্বন্দ্বী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত শরীয়তপুর–১ (সদর–জাজিরা) আসনে এবার রাজনীতির চেনা সমীকরণ বদলে যেতে বসেছে। প্রায় ৩ লাখ ৮০ হাজার ভোটার সমৃদ্ধ এই আসনে একসময় নির্বাচন মানেই ছিল একতরফা ফলের পূর্বাভাস। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেই হিসাব আর আগের মতো নেই।
মনোনয়ন যাচাই-বাছাই শেষে এই আসনে ছয়জন প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। বৈধ প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন— বিএনপি মনোনীত প্রার্থী, সাঈদ আহমেদ আসলাম, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী, ড. মোশাররফ হোসেন মাসুদ, খেলাফত মজলিসের মনোনীত প্রার্থী জালালুদ্দীন আহমেদ, জাতীয় নাগরিক পার্টির মনোনীত প্রার্থী, মো. আব্দুর রহমান, ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশ এর মনোনীত প্রার্থী, মো. তোফায়েল আহমেদ।
বিএনপি মনোনীত প্রার্থী সাঈদ আহমেদ আসলাম জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে তৃণমূলে পরিচিত মুখ। অন্যদিকে জামায়াতের প্রার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি ড. মোশাররফ হোসেন মাসুদ। সাবেক ছাত্রনেতা হিসেবে শিক্ষিত সমাজ ও তরুণ ভোটারদের মধ্যে আলাদা আগ্রহ তৈরি করেছেন।
স্থানীয়ভাবে আলেম সমাজ, মসজিদকেন্দ্রিক মুসল্লি ও ধর্মপ্রাণ ভোটারদের একটি অংশ এবার রাজনীতিতে নৈতিকতার প্রশ্নকে সামনে আনছেন। ফলে ইসলামী দলগুলোর উপস্থিতি এই আসনে ভোটের ব্যবধান কমিয়ে দিতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বিজ্ঞাপন
শরীয়তপুর–২ (নড়িয়া–সখিপুর):
প্রায় ৪ লাখ ২৬ হাজার ভোটার নিয়ে গঠিত শরীয়তপুর–২ আসনেও আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি ভোটের লড়াইকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। এই আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মো. শফিকুর রহমান (কিরণ) জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য। তিনি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও উন্নয়নমূলক প্রতিশ্রুতি সামনে রেখে প্রচারণা চালাচ্ছেন। সখিপুরকে উপজেলায় উন্নীত করা, মেঘনা নদীর ওপর সেতু নির্মাণসহ অবকাঠামোগত উন্নয়ন তার বক্তব্যে গুরুত্ব পাচ্ছে।
অন্যদিকে জামায়াত মনোনীত অধ্যাপক ডা. মাহমুদ হোসেন বকাউল সুশাসন, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ এবং ধর্মীয় আদর্শভিত্তিক রাজনীতির আহ্বান জানিয়ে ভোটারদের কাছে যাচ্ছেন। তার প্রচারণায় আমানতদার নেতৃত্ব ও আল্লাহভীরু জনপ্রতিনিধির বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে আসছে। অনেক ভোটার মনে করছেন, এই নির্বাচন উন্নয়ন আর নৈতিকতার মধ্যে এক ধরনের তুলনামূলক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্র তৈরি করেছে।
শরীয়তপুর–৩: গণঅভ্যুত্থান–পরবর্তী রাজনীতির প্রতিফলন
গোসাইরহাট, ডামুড্যা ও ভেদরগঞ্জের একাংশ নিয়ে গঠিত শরীয়তপুর–৩ আসন রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল। প্রায় ৩ লাখ ৪৩ হাজার ভোটারের এই আসনে বিএনপি মনোনয়ন দিয়েছে মিয়া নুরুদ্দিন আহমেদ অপুকে। অতীতে কারাবরণ ও রাজনৈতিক দমন-পীড়নের অভিজ্ঞতা থাকা এই নেতা গণঅভ্যুত্থান–পরবর্তী বাস্তবতায় নিজেকে নতুনভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন।
জামায়াতের প্রার্থী মোহাম্মদ আজহারুল ইসলাম শ্রমজীবী মানুষের অধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার ও ইসলামী মূল্যবোধের কথা তুলে ধরে মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। উঠান বৈঠক ও ব্যক্তিগত সংযোগে তিনি ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর কৌশল নিচ্ছেন।
বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে নির্বাচন
শরীয়তপুর সরকারি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. তোয়াব হোসেন বলেন, আওয়ামী লীগ মাঠে না থাকলেও তাদের ভোটাররা সমাজে রয়েছে। তারা কোন দিকে ঝুঁকবেন—সেটাই এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা। শরীয়তপুরে এবারের নির্বাচন রাজনৈতিক ধারার মোড় ঘোরাতে পারে।
ভোটারদের প্রত্যাশা
এবারের নতুন ভোটার জাজিরার দেলোয়ার বলেন, আমরা এমন এমপি চাই, যিনি আল্লাহকে ভয় করবেন, মানুষের হক নষ্ট করবেন না।
নড়িয়ার লিজা রহমান নামের এক নারী ভোটার জানান, দল নয়—চরিত্র দেখে ভোট দেব। এলাকায় শান্তি আর নিরাপত্তা চাই।
সুশাসনের দাবি সামনে
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) শরীয়তপুর জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম বলেন, দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে ভোটারদের উচিত প্রার্থীর সততা, নৈতিকতা ও জবাবদিহি বিবেচনা করা। এই নির্বাচন সমাজকে কোন পথে নেবে—সেই দায় ভোটারদের হাতেই।
ফেব্রুয়ারির ভোটের দিকে এগোচ্ছে শরীয়তপুর, যেখানে রাজনীতি এখন দ্বিমুখী—আওয়ামী লীগের উপস্থিতি নেই, কিন্তু তাদের রেখে যাওয়া রাজনৈতিক বাস্তবতা এখনো প্রভাবশালী। সেই বাস্তবতার ভেতর দিয়ে বিএনপি ও জামায়াতের লড়াই শেষ পর্যন্ত কোন পথে মোড় নেয়, তা শুধু জেলার জন্য নয়, জাতীয় রাজনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হয়ে উঠতে পারে।
প্রতিনিধি/এসএস

