চুয়াডাঙ্গা জেলায় আবাদি কৃষিজমির পরিমাণ ক্রমেই কমছে। গত এক দশকে জেলায় অন্তত ৫ হাজার হেক্টর মাঠ ফসলের জমি হ্রাস পেয়েছে।
কৃষি বিভাগের তথ্য বলছে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে জেলায় আবাদি জমির পরিমাণ ছিল ৯৯ হাজার ৪৮১ হেক্টর। কিন্তু ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা দাঁড়িয়েছে মাত্র ৯৪ হাজার ২২০ হেক্টরে। অর্থাৎ এক দশকে এ জেলায় কৃষিজমি কমেছে ৫ হাজার ২৬১ হেক্টর।
বিজ্ঞাপন
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিজমি হারানোর প্রধান কারণ হলো— কংক্রিটের দালান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, কলকারখানা ও ইটভাটা নির্মাণ।
![]()
কৃষকদের অভিযোগ, জমির দাম ও রেজিস্ট্রেশন খরচ তুলনামূলক কম হওয়ায় এক শ্রেণির লোকজন কৃষিজমি দখল ও ক্রয়ের মাধ্যমে তা ধ্বংস করছে। এর ফলে উৎপাদন কমছে, আবার কৃষি পরিবেশ ও জলবায়ুর ওপর পড়ছে বিরূপ প্রভাব।
সরেজমিনে দেখা গেছে, চুয়াডাঙ্গা শহরের দৌলতদিয়া-আলুকদিয়া সড়কের দুই পাশে একসময় দিগন্তজোড়া ধানক্ষেত দেখা যেত। এখন সেই দৃশ্য অনেকটাই অপরিচিত। অর্ধেকের বেশি ফসলি জমি দখল হয়ে গেছে কংক্রিটের দালান ও বাণিজ্যিক স্থাপনায়। কোথাও কলকারখানা, কোথাও ইটভাটা, আবার কোথাও বহুতল ভবন গড়ে উঠছে।
বিজ্ঞাপন
চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার আলুকদিয়া গ্রামের কৃষক মজিদ মিয়া বলেন, আগে এই মাঠগুলোতে শুধু ধান, সবজি, তুলা হতো। কিন্তু এখন ঘরবাড়ি আর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান উঠে পড়েছে। কৃষিজমি না থাকায় চাষাবাদও কমছে।
![]()
সদর উপজেলার ঝোড়াঘাটা গ্রামের কৃষক কাশেম আলী জানান, মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে আমাদের চোখের সামনে উর্বর জমি নষ্ট হয়ে গেল। এসব জমিতে আগে ধান, মাসকলাই, পেঁয়াজসহ সব ফসল হতো। এখন শুধু বিল্ডিং।
আলুকদিয়া গ্রামের কৃষক শাহাবুল ইসলাম বলেন, জমির দাম ও রেজিস্ট্রার খরচ কম হওয়ায় জমি সহজে হাতবদল হচ্ছে। এই সুযোগে লোকজন কৃষিজমি কিনে কলকারখানা করছে। ফসল উৎপাদন কমে যাচ্ছে। তাই কৃষিজমি বিক্রি বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
সদর উপজেলার হুচুকপাড়া গ্রামের কৃষক মুজিবুল হক বলেন, দশ বছর আগেও ভালাইপুর মোড়ে প্রচুর ধানক্ষেত ছিল। এখন শুধু দালানকোঠা। আমাদের উর্বর জমি ধ্বংস হচ্ছে।
চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে কৃষি জমির পরিমাণ ছিল ৯৯ হাজার ৪৮১ হেক্টর। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে কমে দাঁড়ায় ৯৮ হাজার ৭৪০ হেক্টর। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে হয় ৯৮ হাজার ৪০০ হেক্টর। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে আরও কমে ৯৮ হাজার ২৭৪ হেক্টরে ।২০১৯-২০ অর্থবছরে দাঁড়ায় ৯৭ হাজার ৫৭৩ হেক্টর। ২০২০-২১ অর্থবছরে নেমে আসে ৯৭ হাজার ৭৯ হেক্টরে। ২০২১-২২ অর্থবছরে জমির পরিমাণ হয় ৯৬ হাজার ৩৫৩ হেক্টর। ২০২২-২৩ অর্থবছরে কমে দাঁড়ায় ৯৫ হাজার ৬৩৯ হেক্টর। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে হয় ৯৪ হাজার ৯২৭ হেক্টর। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নেমে আসে ৯৪ হাজার ২২০ হেক্টরে।
![]()
অর্থাৎ, গেল এক দশকে জেলায় আবাদি জমি কমেছে ৫ হাজার হেক্টর এর বেশি। কৃষি বিভাগের হিসাবে, বছরে গড়ে ০.৭২ শতাংশ হারে জমি কমছে।
চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান সরকার বলেন, আবাদি জমি কমে গেলে খাদ্য ঘাটতি দেখা দেবে। উৎপাদনও কমছে। আমরা লক্ষ্য করেছি জেলার বিভিন্ন মাঠে ধানক্ষেতের জায়গায় কলকারখানা ও কংক্রিটের দালান উঠছে। তবে আমরা কৃষকদের সচেতন করছি জমি রক্ষা করতে।
তিনি আরও বলেন, জমি কমে যাওয়ার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে একই জমিতে বছরে ৩/৪ বার চাষের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।
চুয়াডাঙ্গার আবাদি জমি কমে যাওয়ার প্রবণতা খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষির ভবিষ্যৎ এবং পরিবেশের জন্য বড় হুমকি। কৃষকরা মনে করেন, কৃষিজমি রক্ষায় কড়া আইন প্রয়োগ করতে হবে এবং অনিয়ন্ত্রিত জমি বিক্রি বন্ধ করতে হবে।
প্রতিনিধি/টিবি




