সিরাজগঞ্জের তাড়াশে ভূমি ব্যবস্থাপনা নীতিমালা লঙ্ঘন করে উর্বর তিন ফসলি জমি কেটে দিনে-রাতে পুকুর খনন করা হচ্ছে। আইনের তোয়াক্কা না করে জমির শ্রেণি পরিবর্তন এখন ‘ওপেন সিক্রেট’। বিশেষ করে রমজান মাসের শুরু থেকে প্রায় শতাধিক অবৈধ পুকুর খনন করা হয়ে গেছে। তারপরও চলছেই অবাধে।
কৃষি অফিসসহ কৃষকরা জানিয়েছেন, শস্যভাণ্ডার হিসাবে খ্যাত সিরাজগঞ্জ তাড়াশ উপজেলা। সিরাজগঞ্জের নয়টি উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ধানের আবাদ হয় তাড়াশে। কিন্তু তিন ফসলি উর্বর জমি কেটে পুকুর খনন করার ফলে প্রতি বছর আবাদযোগ্য কৃষি জমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে। গত কয়েক বছর ধরে উপজেলার সর্বত্রই উর্বরা ফসলি জমিতে পুকুর খনন করা হচ্ছে। উচ্চমূল্যে জমি ভাড়া কিংবা কিনে একশ্রেণির লোক বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষের জন্য নির্বিচারে পুকুর ও দীঘি খনন করছেন। ফলে উদ্বেগজনক হারে তাড়াশে কৃষিজমি কমে যাচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
অভিযোগ রয়েছে, পুকুর খনন বন্ধে স্থানীয় প্রশাসন মাঝে মধ্যে অফিস স্টাফদের পাঠালেও তারা মাটি খননযন্ত্র ভেকুর চাবি নিয়ে আসেন। পরে দেনদরবারের মাধ্যমে তা ফিরিয়ে দেন তারা। এ অবস্থা চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে এ উপজেলায় থাকবে না কোনো ফসলি জমি। ফলে দেখা দেবে খাদ্যশস্যের সংকট। এমনই আশঙ্কা করেছে কৃষি বিভাগ।
উপজেলা মৎস্য বিভাগের তথ্যমতে, গত কয়েক বছরে এ উপজেলায় পুকুর-দীঘির সংখ্যা বেড়েছে কয়েকগুণ। আর পরিবেশ অধিদফতর বলছে, পুকুর খননের ফলে ভূমির শ্রেণি পরিবর্তন হচ্ছে। এতে পরিবেশগত প্রতিক‚ লতার আশঙ্কা বাড়ছে।
বিজ্ঞাপন
উপজেলা কৃষি বিভাগ জানিয়েছেন, ২০০৮ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ২ হাজার ৫৩৯টি পুকুর খনন করা হয়েছে। এই এক দশকের বেশি সময়ে আবাদি জমি কমেছে ১ হাজার ৯২০ হেক্টর। তাড়াশ উপজেলায় দ্রুত হারে কমছে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ।
বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বির্স্তীর্ণ মাঠে-মাঠে পুকুর খনন করা হচ্ছে। আগে সাধারণত রাতে খনন করতেন। উপজেলার আট ইউনিয়নেই পুকুর খনন চলছে। সব চেয়ে বড় বড় পুকুর খনন করা হচ্ছে নওগাঁ ইউনিয়নের মাঠে-মাঠে। কোনো কোনো পুকুরে রাতে পাঁচটি ভেক্যু মেশিন দিয়ে মাটি কাটা হয়। দিনে একটি দিয়ে খনন করেন। রাতের খনন কাজের শেষে একটি মেশিন পুকুরে রেখে বাকিগুলো পুকুরের আশপাশের বাড়িতে আড়ালে রেখে দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে অবৈধ পুকুর খননে বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন নওগাঁ ইউনিয়নের বাবু তালুকদার, আলাউদ্দীন, আলম, শফি, শামিম হোসেন, আলী, আফছার, আকিব্বর, খাজা, আফজাল হোসেন ও জহুরুল ইসলাম। এদের খনন করা কোনো কোনো পুকুর ২০ থেকে ৬৭ বিঘা আয়তনের।
অবৈধ পুকুর খনন করার অপরাধে জমির মালিকদের বিরুদ্ধে ২৪ মামলা, ১৪১ জনকে আসামি করে মামলা —অফিসার ইনচার্জ (ওসি)
এ পর্যন্ত ভ্রাম্যমাণ আদালতে কয়েক লাখ টাকা জরিমানা ও বেশ কয়েকজনকে জেল দেওয়া হয়েছে —এসিল্যান্ড
২০০৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ছোট বড় ১৫শ ৮৬ টি পুকুর খনন। আবাদি জমি কমেছে ৮শ ১৫ হেক্টর—কৃষি কর্মকর্তা
অভিযান অব্যাহত রেখেছেন ভূমি ব্যবস্থাপনা নীতিমালা লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে — উপজেলা নির্বাহী অফিসার
চলতি মাসের আইনশৃঙ্খলা সভায় সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, তাড়াশে আর একটি পুকুর খনন করতে দেওয়া হবে না। বরং পুকুর থেকে ভেক্যু মেশিন রয়েছে জব্দ করে আদালতে পাঠানো হবে। এরপরও থেমে নেই পুকুর খনন। রমজান মাসের শুরু থেকে শতাধিক অবৈধ পুকুর খনন করা হয়ে গেছে। এভাবেই ২০০৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ছোট বড় ১৫শ ৮৬ টির মত পুকুর খনন করা হয়েছে। আবাদি জমি কমেছে ৮শ ১৫ হেক্টর।
প্রান্তিক কৃষক মনছুর রহমান, সুলতান মাহমুদ, ছোহরাব আলী, শামসুল হক, ছাবেদ আলী, জুরান আলী, মজিবর মল্লিক, রেজাউল করিম, জহুরুল ইসলাম, আব্দুল মোতালেব, শাহাদত হোসেন বলেন, সাধারণ কৃষকের কথা চিন্তা না করে যাদের জমি বেশি তারা অপরিকল্পিতভাবে যত্রতত্র পুকুর খনন করছেন। এসব পুকুরের পাড় ঘেঁষে আমাদের যেটুকু জমি রয়ে গেল তাতে নিশ্চিত জলাবদ্ধতা দেখা দেবে। ফসলের আবাদ করে খেতে পারব না।
তাড়াশ থানা অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. নজরুল ইসলাম বলেন, অবৈধ পুকুর খনন করার অপরাধে জমির মালিকদের বিরুদ্ধে ২৪টি মামলা হয়েছে। তার মধ্যে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করেছে ১১টি। ডিবি বাদী হয়েছে ১টি মামলার। অন্য ১২টি মামলার বাদী ইউনিয়ন সহকারী ভূমি কর্মকর্তারা। এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে ১৪১ জনকে। এরা অধিকাংশই জমির মালিক। মামলাগুলো আদালতে বিচারাধীন। আসামিরা জামিনে রয়েছেন।
তাড়াশ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) খালিদ হাসান বলেন, এ পর্যন্ত ভ্রাম্যমাণ আদালতে কয়েক লাখ টাকা জরিমানা ও বেশ কয়েকজনকে জেল দেওয়া হয়েছে। তারপরও অবৈধ পুকুর খনন বন্ধ করা যাচ্ছে না।
তাড়াশ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ২০০৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ছোট বড় ১৫শ ৮৬টির মত পুকুর খনন করা হয়েছে। এতে আবাদি জমি কমেছে ৮শ ১৫ হেক্টর। একই সঙ্গে শস্য ভান্ডার হিসাবে খ্যাত তাড়াশ উপজেলায় খাদ্য উৎপাদন ব্যাপক হারে কমতে শুরু করেছে।
এ প্রসঙ্গে তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সুইচিং মং মারমা বলেন, অধিকাংশ পুকুর রাতে খনন করা হয়। ভূমি ব্যবস্থাপনা নীতিমালা লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে আমরা অভিযান অব্যাহত রেখেছি।
প্রতিনিধি/টিবি




