প্রাণ বাচাঁতে শেষ চেষ্টাটুকুও করেছিলেন রুপলাল ও প্রদীপ লাল। দুইহাত জোড় করে প্রাণ ভিক্ষা চেয়েছিলেন তারা। শতশত মানুষের ভিড়ে দুই হাতজোড় করে বলেছিলেন, ‘আমি চোর না, ডাকাত না’। কিন্তু তাতেও মনে গলেনি উত্তেজিত জনতার। শেষ রক্ষা হয়নি রুপলাল দাস ও প্রদীপ লালের। গণপিটুনিতে প্রাণ হারিয়েছেন তারা। প্রাণ বাঁচাতে দুই হাতজোড় করে প্রাণ ভিক্ষা চাওয়ার সেই মর্মস্পর্শী আকুতির ভিডিও এখন ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। যা দেখে হতবাক নেটিজেনরা। মানুষ এতটা শক্ত মনের হতে পারে।
ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, স্থানীয় কয়েকজন মিলে বটতলা এলাকায় ভ্যান থামিয়ে রুপলাল ও প্রদীপকে আটক করেন। ভ্যানে থাকা প্লাস্টিকের বস্তায় কি আছে এবং এসময় তাদের নাম-পরিচয় জিজ্ঞেস করলে তারা চুপ ছিল। এসময় উত্তেজিত হয়ে কয়েকজন তাদের মারতে যান। কিন্তু মেহেদী হাসান নামের এক যুবক তাদের মারধর করতে বাধা দেন এবং পুলিশে খবর দেওয়ার কথা বলেন তাদের।

এসময় রুপলাল দু’হাত জোড় করে উত্তর দেন ‘আমি চোর না, ডাকাতও না। আমি মুচি, তারাগঞ্জ বাজারে জুতা সেলাই করি’। কথা শেষ না হতেই ভিড়ের মধ্যে কেউ একজন উচ্চস্বরে বলে ওঠে ‘তুই চোর-ডাকাইতের বাপ’। এসময় রুপলাল প্রস্রাবের কথা জানালেও, পালিয়ে যাবে ভেবে তাকে সুযোগ দেয়নি উত্তেজিত জনতা। এরমধ্যে হঠাৎ মাটিতে লুটিয়ে পড়েন রুপলাল। এসময় ভ্যানের ওপরে বসা প্রদীপকে লক্ষ্য করে লোকজন বলতে থাকে ‘মাল খেয়ে আসছে, অভিনয় করছে’।
এদিকে ভ্যানে থাকা বস্তা থেকে প্লাস্টিকের বোতল বের করে নাকে নিয়ে গন্ধ শুকেন মেহেদী হাসান নামের এক যুবক। গন্ধ শুকার কিছুক্ষণ পরই তিনি বলেন, ‘এ ভাই, দয়া করে আমাকে ধরো’ বলে মাটিতে পড়ে যান। এসময় দু’জন তাকে ধরে সরিয়ে নেওয়া হয়। এ ঘটনার পরপরই ক্ষুব্ধ জনতা রুপলাল ও প্রদীপকে মারধর শুরু করে।
পরে রাত ১১টার দিকে পুলিশ এসে দু’জনকে উদ্ধার করে তারাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। চিকিৎসক রুপলালকে মৃত ঘোষণা করেন। গুরুতর আহত প্রদীপকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়, সেখানে ভোর ৪টার দিকে তারও মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় রোববার রুপলালের স্ত্রী ভারতী রানী বাদী হয়ে ৫০০-৭০০ জন অজ্ঞাতনামাকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন। ইতোমধ্যে পুলিশ ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে রাতে অভিযান চালিয়ে সয়ার ইউনিয়নের বালাপুরের এবাদত হোসেন (২৭), বুড়িরহাটের আক্তারুল ইসলাম (৪৫), রফিকুল ইসলাম (৩৩) এবং রহিমাপুরের মিজানুর রহমানকে (২২) গ্রেফতার করেছে।

এ বিষয়ে তারাগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এমএ ফারুক বলেন, রুপলাল ও প্রদীপ লাল নিহতের ঘটনায় ভিডিও ও স্থানীয়দের তথ্যের ভিত্তিতে চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতার ব্যক্তিদের আদালতে পাঠানো হয়েছে। এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত কেউই রেহাই পাবে না। অভিযান অব্যাহত থাকবে।
প্রতিনিধি/এসএস




