শুক্রবার, ২৮ মার্চ, ২০২৫, ঢাকা

শত বছরের বাঁশের হাট

জেলা প্রতিনিধি, মৌলভীবাজার
প্রকাশিত: ২৪ মার্চ ২০২৫, ০৩:৩০ পিএম

শেয়ার করুন:

loading/img

শত বছরের বাঁশের হাট, যেখানে শত বছর আগে বাঁশ বিক্রি শুরু হয়েছিল, সেই ধারাবাহিকতা আজও টিকে রয়েছে।

এখানে আমি কথা বলছি মৌলভীবাজারের রাজনগরের কাউয়াদীঘি হাওরপারের কালারবাজারের বাঁশের হাটের কথা। এই হাট এখনও বাঁশের জন্য আলাদা পরিচিতি নিয়ে চলছে। শুধু মৌলভীবাজার জেলাতেই নয়, বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলেরও একটি পরিচিত ‘বাঁশের হাট’ এটি।


বিজ্ঞাপন


সম্প্রতি রাজনগর উপজেলার উত্তরভাগ ইউনিয়নের কালারবাজারে গিয়ে দেখা গেছে, নানান ধরনের পণ্য থাকলেও প্রায় সব হাটে যেমন কিছু বিশেষ পণ্যের পরিচিতি থাকে, তেমনি এই হাটেও রয়েছে বিশেষ পণ্য বাঁশ।

চাঁদনীঘাট-হলদিগুল সড়কের উত্তর পাশের নিচু জমিতে থরে থরে লম্বা, মাঝারি ও ছোট দৈর্ঘ্যের বহু বাঁশ বিছিয়ে রাখা হয়েছে। ক্রেতারা আসছেন, প্রয়োজনীয় বাঁশ পছন্দ করছেন। দরদামে পোষালে বাঁশ আলাদা করে রাখছেন।

এ সময় দেখা যায়, অল্প বাঁশের জন্য টেলাগাড়ি এবং বেশি পরিমাণে বাঁশের জন্য পিকআপ ভ্যানে বাঁশ তুলছেন ক্রেতারা, গন্তব্যে নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে।

বাঁশ ব্যবসায়ী ও স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, হাওরপারের কালারবাজার এলাকায় শত বছর আগে গড়ে উঠেছিল একটি গ্রামীণ হাট। দূরদূরান্তের মানুষ এই হাটে নানান পণ্যের পাশাপাশি বাঁশ কিনতে আসেন। আর এই বাঁশ বিক্রির ঐতিহ্য শত বছরের পুরোনো। কাউয়াদীঘি হাওর ও কুশিয়ারা নদীকে কেন্দ্র করে যোগাযোগের সুবিধার্থে হাটটি গড়ে উঠেছিল। দূরদূরান্ত থেকে পণ্য আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রে এই অঞ্চলের মানুষের পানিপথই ছিল ভরসা। এই পথে শুধু নৌকা নয়, একসময় লঞ্চও চলাচল করত। যার ফলে বাঁশসহ অন্যান্য পণ্য পরিবহন সহজ ছিল।


বিজ্ঞাপন


হাটের সূচনাকাল থেকেই এই বাঁশের হাট গড়ে উঠেছিল। এই হাটে বালাগঞ্জ, নবীগঞ্জ, আজমিরিগঞ্জ, সিলেট, সুনামগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ এসে বাঁশ কিনে নিয়ে যান।

তারা আরও জানান, আগের যোগাযোগ ব্যবস্থা এখন বদলে গেছে। বর্তমানে বাজারে আসা-যাওয়া করার জন্য পাকা সড়ক হয়ে গেছে। তবে এখনও অনেকেই পানিপথেই বেশি বাঁশ পরিবহন করেন। কাঁচা ঘর তৈরি, বহুতল ভবন নির্মাণসহ নানা কাজে বাঁশ ব্যবহার করা হয়। এই হাটে নিয়মিত ২৫ থেকে ৩০ জন বাঁশ ব্যবসায়ী আছেন, যারা বারো মাসই এখানে ব্যবসা করেন।

এই হাটে প্রায় ৩৫ বছর ধরে বাঁশের ব্যবসা করছেন বাছিত মিয়া। তিনি বলেন, জেলার রাজনগর, শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ, কুলাউড়া সহ বিভিন্ন এলাকা থেকে বাঁশ সংগ্রহ করা হয়। এই হাটে প্রতিদিনই বাঁশ বেচাকেনা চলে। তবে সাপ্তাহিক হাট বসে সোম ও শুক্রবার। এই দুইদিন দূরদূরান্তের মানুষ আসেন বাঁশ কিনতে। প্রতিহাটে ২ থেকে ৩ লাখ টাকার বাঁশ বিক্রি হয়। তবে শুক্রবার বেশি বাঁশ বিক্রি হয়। ওই দিন ৫ থেকে ৬ লাখ টাকার বাঁশ বিক্রি হয়।

বাঁশ ব্যবসায়ী ও খুচরা বিক্রেতা কালাম মিয়া বলেন, বর্তমানে সোজা, লম্বা ও মজবুত বাঁশের সরবরাহ কম। আগে গ্রামগঞ্জে যেসব জায়গায় বাঁশঝাড় ছিল, এখন সেখানে বাড়িঘর উঠছে। ফলে উৎপাদন কম, সরবরাহও কম। তারপরও কালারবাজার বাঁশের জন্য সবার কাছে পরিচিত।

bss

জেলা শহর থেকে কালারবাজারে বাঁশ কিনতে এসেছেন নির্মাণাধীন একটি ভবনের ঠিকাদার আবু তাহের। তিনি বলেন, সাধারণত সব ধরনের বাড়ি বা ভবনে ঢালাইয়ের সময় বাঁশ খুঁটি হিসেবে ব্যবহার হয়। ভবনের নির্মাণকাজে প্রচুর পরিমাণে বাঁশ লাগে। দুইতলা-পাঁচতলা যাই হোক, ভেতরে বা বাইরে, প্রতিটি ফ্লোরে মাচা তৈরি করতে হয় বাঁশ দিয়ে। সেই সঙ্গে এগুলোর খুঁটি হিসেবেও বাঁশের ব্যবহার হয়। এই হাটে চাহিদামতো ও সস্তায় বাঁশ পাওয়া যায়।

উত্তরভাগ ইউনিয়নের রাজাপুর গ্রামের বেত শিল্পের কারিগর ষাটোর্ধ্ব মহেন্দ্র সরকার। তিনি বলেন, ৪০ বছর ধরে এই বাজার থেকে বাঁশ কিনি। সেই বাঁশ দিয়ে টুকরি, কুলা ও খলই তৈরি করি। আমাদের এলাকায় এমন বড় বাঁশের হাট আর আছে কি না, আমার জানা নেই।

প্রতিনিধি/একেবি

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর