রাজধানীর ভাসানটেক সরকারি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী সুজানা (১৭) আদমজী ক্যান্টনমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী সাইনুর রশীদ কাব্য (১৬)। কোচিং সেন্টারে পড়াশুনার কারণে দু’জনের মাঝে তৈরি হয় বন্ধুত্ব। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে পূর্বাচল থেকে ১৭ ডিসেম্বর সুজানা এবং ১৮ ডিসেম্বর কাব্যের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। সুজানা কচুক্ষেত এলাকার মৃত আব্বাস মিয়ার মেয়ে। আর কাব্য কচুক্ষেত বউবাজার এলাকার হারুনুর রশীদের ছেলে।
গত ১৭ ডিসেম্বর সকালে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের পূর্বাচলে লেকের পানিতে ভেসে ওঠে কলেজ ছাত্রী সুজানার লাশ। কাঞ্চন-কুড়িল বিশ্বরোডের বউরারটেক এলাকায় পূর্বাচল উপ-শহরের ২ নম্বর সেক্টরের ৪ নম্বর সেতুর নিচে তার লাশ পাওয়া যায়। পুলিশ সেটি উদ্ধার করে। সঙ্গে পাওয়া যায় একটি হেলমেট। যার সূত্র ধরে মেলে সুজানার সঙ্গেই লেকের পানিতে প্রাণ যাওয়া এক তরুণের। নাম তার সাইনুর রশীদ কাব্য।
বিজ্ঞাপন
পুলিশ বলছে, দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে সুজানা আর কাব্য। তবে তাদের মৃত্যু দুর্ঘটনায় হয়েছে এমনটা মানতে নারাজ দুই পরিবার। তারা সুজানা আর কাব্যের মৃত্যু কারণ জানতে তদন্ত দাবি করছে।
নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার প্রত্যুষ কুমার মজুমদার বলেন, মঙ্গলবার সকালে কলেজছাত্রী সুজানার লাশ উদ্ধারের পর নিখোঁজ কাব্যর মরদেহ ও মোটরসাইকেল একই লেক থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। তারা দু’জন বন্ধু ছিল। তার মোটরসাইকেলযোগে পূর্বাচলে ঘুরতে এসেছিল। অতিরিক্ত গতিতে মোটরসাইকেল চালানোর ফলে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তারা ব্রিজের উপর থেকে নিচে লেকের পানিতে ডুবে যায়। এটি একটি সড়ক দুর্ঘটনা বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ময়নাতদন্তের পর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে।
নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের মর্গের সামনে কথা হয় সুজানার মা চম্পা বেগমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ১৬ ডিসেম্বরও বাসায় ফিরতে দেরি দেখে সন্ধ্যার পর থেকে মোবাইল ফোনে কল দিতে থাকি। রাত ৯টায় মেয়ের ফোনে ঢোকে শেষ কল, এরপর থেকে বন্ধ। মেয়ে সুজানা আর ফেরেননি।
বিজ্ঞাপন
সুজানার মা বলেন, আমি তো মনে করছি আমার মেয়ে হারাইয়া গেছে পাচ্ছি না। আর ওই ছেলেও (কাব্য) হারাইয়া গেছে শুনেছি। তাইলে মনে হয় আমার মেয়েরে থানায় নিয়া আসছে, তাই থানায় যাই। থানায় তারা নিজেরা কথা বলাবলি করতাসিল-মেয়েডা তো মারা গেছে। আমি শুইন্নালাইসি গো…. আমি তো শুইন্না পাগলের মতো কানসি।’
তিনি বলেন, আমাদের অনেক আদরের মেয়ে ছিল সুজানা। আমি আর আমার মেয়ে বান্ধবীর মতো ছিলাম। আমার মেয়েরে মাইরা ফালাইছে, আমি সঠিক বিচার চাই।
সুজানার ভাই মেহেদী হাসান বলেন, সুজানা আর কাব্যের মৃত্যুটা পূর্ব শত্রুতার জেরে হয়েছে কি না তদন্ত করা দরকার। কাব্যের শত্রু অথবা আমার বোনের কোনো শত্রু এ ঘটনা ঘটাতে পারে। আমরা চাই প্রশাসন সুষ্ঠু পদক্ষেপ গ্রহণ করুক।
সুজানার ভাই দাবি করেন, কাব্যের শত্রু অথবা আমার বোনের কোনো শত্রু এ ঘটনা ঘটাতে পারে। এছাড়া হয়তো অন্য কোনো বন্ধু ওদের একসঙ্গে পেয়ে সন্দেহবশত ওদের মেরে ফেলতে পারে। এখন আমরা চাই প্রশাসন সুষ্ঠু পদক্ষেপ গ্রহণ করুক। আমরা সুজানা হত্যার বিচার চাচ্ছি। প্রশাসন যেন এগিয়ে আসে। ফরেনসিক বিভাগ, সিআইডি এটার যেন সুষ্ঠু একটা তদন্ত করে। এই স্বাধীন বাংলাদেশে খুন, গুম, হত্যা এগুলো আমরা এখন আর চাই না।
ছেলের মৃত্যুকে স্বাভাবিক মানতে নারাজ কাব্যের মা সোনিয়া রশিদ। তিনি বলেন, পুলিশ আমাদের বলছে, ওদের মৃত্যু মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় হয়েছে। কিন্তু আমার কাছে এই মৃত্যু স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না। আমার দাবি থাকবে, পুলিশ যেন তদন্ত করে। আসলেই দুর্ঘটনা হয়েছে নাকি অন্যকিছু?
তিনি বলেন, কাব্য প্রায়ই মোটরসাইকেল নিয়ে ঘুরতে বের হতো। ১৬ ডিসেম্বর সন্ধ্যায়ও মোটরসাইকেল নিয়ে বের হয় সে। রাত ৯টার দিকে সর্বশেষ তার সঙ্গে কথা হয়। এরপর থেকে মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায়। সেদিন রাতে বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেও কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি কাব্যের। এজন্য রাজধানীর কাফরুল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করি আমরা।
সোনিয়া জানান, কাব্যের ফুফাতো ভাই আর সুজানা সহপাঠী। একই কোচিংয়ে যাতায়াতের সুবাদে সুজানার সঙ্গে কাব্যের পরিচয় হয়। মাসখানেক হয়েছে তাদের বন্ধুত্ব। সুজানা একাধিকবার আমাদের বাড়িতে এসেছে। কিন্তু ১৬ ডিসেম্বর যে তারা দু’জন একত্রে মোটরসাইকেল নিয়ে বেরিয়েছে তা জানতাম না। ওই রাতে কাব্য বাসায় না ফেরায় সুজানার আরেক বন্ধুকে কল করেছিলাম, কিন্তু সেও তখন কিছু জানত না।
জানা গেছে, চার বছর আগে সুজানার বাবা মারা যান। বড় ভাই মেহেদী হাসান আহসানউল্লা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক পাস করে চাকরি খুঁজছেন। বাবাহীন সুজানা নিজের পড়ালেখার খরচ চালাতেন টিউশনি করে। একই সঙ্গে জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য উচ্চ মাধ্যমিকের নির্বাচনী পরীক্ষারও প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন ছিল সুজানার। ছোটবেলা থেকে সাইকেল চালাতে পছন্দ করতেন। মোটরসাইকেল চালানোরও শখ ছিল তার। প্রায়ই বন্ধুদের সঙ্গে বাইকে ঘুরতে বের হতেন। তবে, বিজয় দিবসের সন্ধ্যায় কাব্যের সঙ্গে মোটরসাইকেলে ঘুরতে বের হওয়ার কথা জানত না সুজানার পরিবার।
নায়ারণগঞ্জ জেলার সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (সার্কেল-গ) মেহেদী ইসলাম বলেন, নিহত দু’জনের কারও কাছ থেকেই কিছু খোয়া যায়নি। দেখে দুর্ঘটনাই মনে হচ্ছে। এরপরও তদন্ত অব্যাহত থাকবে। তাছাড়া আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ক্যামেরার ভিডিও সংগ্রহের কাজ করছে পুলিশ।
রূপগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) লিয়াকত আলী বলেন, দুই পরিবারের পক্ষ থেকে দু’টি মামলা হয়েছে। ময়নাতদন্তের পর মরদেহ দু’টি যার যার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
প্রতিনিধি/এসএস