শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

কবি নজরুলের শতবর্ষ আগের চিঠি

ড. হাফিজ রহমান
প্রকাশিত: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৩৩ এএম

শেয়ার করুন:

কবি নজরুলের শতবর্ষ আগের চিঠি
ড. হাফিজ রহমান ও কবি কাজী নজরুল ইসলাম। ছবি: সংগৃহীত

তৃতীয় পর্ব
“তোমায় লিখতে বলেছি, আজো বলছি লিখতে। বললেই যে লেখা আসে, তা নয়। কারুর বলা যদি আনন্দ দেয়, তবে সেই আনন্দের বেগে সৃষ্টি হয়তো সম্ভব হয়ে ওঠে। তোমরা আমায় বলেছ লিখতে। সে-বলা আমায় আনন্দ দিয়েছে, তাই সৃষ্টির বেদনা জেগেছে অন্তরে। তোমাদের আলোর পরশে শিশিরের ছোঁওয়ায় আমার মনের কুড়ি বিকচ হয়ে উঠেছে। তাই চট্টগ্রামে লিখেছি। নইলে তোমরা বললেই লেখা আসত না। তোমার মনের সুন্দর যিনি, তিনি যদি খুশি হয়ে ওঠেন, তাহলে সেই খুশিই তোমায় লিখতে বসাবে। আমার বলা তোমার সেই মনের সুন্দরকে অঞ্জলি দেওয়া। বলেছি, অঞ্জলি দিয়েছি। তিনি খুশি হয়ে উঠেছেন কিনা তুমি জানো। তুমি আজো অনেকখানি বালিকা। তারুণ্যের যে উচ্ছ্বাস, যে আনন্দ, যে ব্যথা সৃষ্টি জাগায়, সেই উচ্ছ্বাস, সেই আনন্দ, সেই ব্যথা তোমার জীবনে আসার এখনো অনেক দেরি। তাই সৃষ্টি তোমার আজো উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল না। তার জন্য অপেক্ষা করবার ধৈর্য অর্জন করো। তরুর শাখায় আঘাত করলে সে ফুল দেবে না, যখন দেবে সে আপনি দেবে। আমাদের দেশের মেয়েরা বড় হতভাগিনী। কত মেয়েকে দেখলাম কত প্রতিভা নিয়ে জন্মাতে, কিন্তু সব সম্ভাবনা তাদের শুকিয়ে গেল সমাজের প্রয়োজনের দাবিতে। ঘরের প্রয়োজন তাদের বন্দিনী করে রেখেছে। এত বিপুল বাহির যাদের চায়, তাদের ঘিরে রেখেছে বারো হাত লম্বা আটহাত চওড়া দেওয়াল। বাহিরের আঘাত এ দেওয়ালে বারেবারে প্রতিহত হয়ে ফিরল। এর বুঝি ভাঙন নেই অন্তর হতে মার না খেলে। তাই নারীদের বিদ্রোহিনী হতে বলি। তারা ভেতর হতে দ্বার চেপে ধরে বলছে আমরা বন্দিনী। দ্বার খোলার দুঃসাহসিকা আজ কোথায়? তাকেই চাইছেন যুগদেবতা। দ্বার ভাঙার পুরুষতার নারীদের প্রয়োজন নেই, কারণ তাদের দ্বার ভিতর হতে বন্ধ, বাহির হতে নয়। তোমারও যে কী হবে বলতে পারিনে। তার কারণ তোমায় চিনলেই তো চলবে না, তোমায় চালাবার দাবি নিয়ে জন্মেছেন যাঁরা তাঁদের আজো চিনিনি। আমার কেন যেন মনে হলো বাহার তোমার অভিভাবক নয়। ভুল যদি না করে থাকি, তাহলেই মঙ্গল। অভিভাবক যিনিই হন তোমার, তিনি যেন বিংশ শতাব্দীর আলোর ছোঁয়া পাননি বলেই মনে হলো। তোমায় যে আজ কাঁদতে হয় বসে বসে কলেজে পড়তে যাবার জন্য, এও হয়তো সেই কারণেই। মিসেস আর. এস. হোসেনের মতো অভিভাবিকা পাওয়া অতি বড় ভাগ্যের কথা। তাঁকেও যখন তাঁরা স্বীকার করে নিতে পারলেন না, তখন তোমার কী হবে পড়ার, তা আমি ভাবতে পারি নে! তোমার আর বাহারের ওপর আমার দাবি আছে-স্নেহ করার দাবি, ভালোবাসার দাবি, কিন্তু তোমার অভিভাবকদের ওপর তো আমার দাবি নেই।” 

কাজী নজরুল ইসলামের পত্রাংশটির জীবনবোধ, নারী-চেতনা, সৃষ্টির ও সমাজ দর্শন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। চিঠির ভাষা সহজ ও আন্তরিক। কিন্তু সেই সহজ কথার মধ্যেই গভীর দর্শন ও সৌন্দর্য ফুটে উঠেছে। এর প্রধান দার্শনিক দিক হলো সৃষ্টির স্বাধীনতা। কবি মনে করেন, শুধু কাউকে বললেই সে সৃষ্টি করতে পারে না। সৃষ্টির জন্য প্রয়োজন আনন্দ, অনুভূতি ও অন্তরের তাগিদ। তিনি লিখেছেন, ‘তোমরা আমায় বলেছ লিখতে। সে-বলা আমায় আনন্দ দিয়েছে, তাই সৃষ্টির বেদনা জেগেছে অন্তরে।’ এখানে সৃষ্টি একই সঙ্গে আনন্দ ও বেদনার বিষয়। অর্থাৎ, সৃষ্টিশীলতা শুধু ইচ্ছার ব্যাপার নয়; এর সঙ্গে মনের গভীর অনুভূতির সম্পর্ক আছে। আগুনে পুড়ে যেমন সোনা খাঁটি হয়, তেমনি সৃষ্টির পেছনে থাকে বেদনা। দুঃখ-ক্লেশ। সীমাহীন কষ্ট। এর ভেতর থেকে বেদনাউদ্ভূতক লেখা স্বমহিমায় প্রজ্জ্বোল হয়ে ওঠে। কবি নজরুল পত্রপ্রাপিকার সৃষ্টিশীলতা নিয়েও বাস্তব কথা বলেছেন। তার মতে, জীবনের উচ্ছ্বাস, আনন্দ ও ব্যথা মানুষকে সৃষ্টিশীল করে তোলে। তাই সময়ের আগে সৃষ্টি করার জন্য চাপ দেওয়া ঠিক নয়। তিনি বলেছেন, ‘তরুর শাখায় আঘাত করলে সে ফুল দেবে না, যখন দেবে সে আপনি দেবে।’ এই কথার মধ্যে ধৈর্য ও স্বাভাবিক বিকাশের দর্শন প্রকাশ পেয়েছে। মানুষকেও গাছের মতো নিজের সময় ও স্বাভাবিক গতিতে বিকশিত হতে দিতে হবে। লেখালেখির চিরন্তন সত্য এখানে প্রকাশিত হয়েছে। তা হলো- সৃষ্টিশীলতা কোন জোরাজুরির বিষয় নয়। প্রসব বেদনার মতো যখন লেখার প্রবল প্রচাপ তৈরি হয়, তখনই লেখা উচিত। কলম-কাগজ নিয়ে বসলাম। লিখে উঠবোই। এই মানসকিতা সঠিক কবির চিন্তা নয়। চিন্তা হওয়াও উচিত নয়। কবি নজরুল তা মর্মে মর্মে অনুভব করতেন বলেই, তার লিখিত পত্রে এমন দার্শনিক সত্য তুলে এনেছেন। 
এই পত্রাংশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নারীমুক্তির দর্শন। নজরুল দেখেছেন, সমাজের নানা বাধায় নারীর প্রতিভা ও সম্ভাবনা নষ্ট হয়ে যায়। ঘরের দায়িত্ব ও সামাজিক নিয়ম তাদের বন্দি করে রাখে। তাই তিনি নারীদের ‘বিদ্রোহিনী’ হতে বলেছেন। তার কাছে নারীমুক্তি শুধু বাইরে যাওয়ার স্বাধীনতা নয়, বরং নিজের ভেতরের ভয় ও বাধা ভেঙে বেরিয়ে আসা। ‘দ্বার ভিতর হতে বন্ধ’ কথাটির মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে নারীর মুক্তির জন্য তার নিজের সাহস ও প্রতিবাদ সবচেয়ে জরুরি।

“তবু ওপর-পড়া হয়ে অনেক বলেছি এবং তা হয়তো তোমার আম্মা ও নানীসাহেবাও শুনেছেন। বিরক্তও হয়েছেন হয়তো। আলোর মতো, শিশিরের মতো আমি তোমার অন্তরের দলগুলি খুলিয়ে দিতে পারি হয়তো, দ্বারের অর্গল খুলি কি করে?- তুমি আমার সামনে আসতে পারোনি বলে আমার কোনোরূপ কিছু মনে হয়নি। তার কারণ, আমি তোমাকে দেখেছি এবং দেখতে চাই লেখার মধ্য দিয়ে। সেই হল সত্যিকার দেখা। মানুষ দেখার কৌতূহল আমার নেই, স্রষ্টা দেখার সাধনা আমার। সুন্দরকে দেখার তপস্যা আমার। তোমার প্রকাশ দেখতে চাই আমি, তোমায় দেখতে চাইনে। সৃষ্টির মাঝে স্রষ্টাকে যে দেখেছে, সেই বড় দেখা দেখেছে। এই দেখা আর্টিস্টের দেখা, ধেয়ানীর দেখা, তপস্বীর দেখা। আমার সাধনা অরূপের সাধনা। সাত সমুদ্দুর তেরো নদীর পারের যে রাজকুমারীর বন্দিনী সেই রূপকথার অরূপাকে মায়া, নিদ্রা হতে জাগাবার দুঃসাহসী রাজকুমার আমি। আমি সোনার কাঠির সন্ধান জানি-যে সোনার কাঠির ছোঁয়ায় বন্দিনী উঠবে জেগে, রূপার কাঠির মায়ানিদ্রা যাবে টুটে, আসবে তার আনন্দের মুক্তি। যে চোখের জল বুকের তলায় আটকে আছে, তাকে মুক্তি দেওয়ার ব্যথা-হানা আমি। মানস সরোবরের বদ্ধ জলধারাকে শুভ শঙ্খধ্বনি করে নিয়ে চলেছি কবি আমি ভগীরথের মতো। আমার পনেরো আনা রয়েছে স্বপ্নে বিভোর, সৃষ্টির ব্যথায় ডগমগ, আর এক আনা করছে পলিটিক্স, দিচ্ছে বক্তৃতা, গড়ছে সঙ্ঘ। নদীর জল চলছে সমুদ্রের সাথে মিলতে, দুধারে গ্রাম সৃষ্টি করতে নয়। যেটুকু জল তার ব্যয় হচ্ছে দুধারের গ্রামবাসীদের জন্য, তা তার এক আনা। বাকি পনেরো আনা গিয়ে পড়ছে সমুদ্রে। আমার পনেরো আনা চলেছে আর চলেছে সৃষ্টি-দিন হতে আমার সুন্দরের উদ্দেশে। আমার যত বলা আমার সেই বিপুলতরকে নিয়ে, আমার সেই প্রিয়তম, সেই সুন্দরতমকে নিয়ে। তোমাকেও বলি, তোমার তপস্যা যেন তোমার সুন্দরকে নিয়েই থাকে মগ্ন। তোমার চলা, তোমার বলা যেন হয় তোমার সুন্দরের উদ্দেশে, তাহলে তোমায় প্রয়োজনের বাঁধ দিয়ে কেউ বাঁধতে পারবে না। তোমার অন্তরতমকে ধ্যান করো তোমার বলা দিয়ে। বাধা যেন তোমার ভিতর দিক থেকে জমা না হয়ে ওঠে। এক কাজ করতে পারো, নাহার? তোমার সকল কথা আমায় খুলে বলতে পার? কী তোমার ব্রত, কী তোমার সাধনা-এই কথা। আমার কাছে সঙ্কোচ কোরো না। আমি তাহলে তোমার গতির উদ্দেশ পাব, আর সেইরকম করে তোমায় গড়ে উঠবার ইশারা দিতে পারব। আমি অনেক পথ চলেছি, পথের ইঙ্গিত হয়তো দিতে পারব। তাই বলে আমি পথে চালাব, এ ভয় কোরো না।

বড় বড় কবির কাব্য পড়া এই জন্য দরকার যে তাতে কল্পনার জট খুলে যায়, চিন্তার বদ্ধ ধারা মুক্তি পায়। মনের মাঝে প্রকাশ করতে না পারার যে উদ্বেগ, তা সহজ হয়ে ওঠে। মাটির মাঝে যে পত্র-পুষ্পের সম্ভাবনা, তা বর্ষণের অপেক্ষা রাখে। নইলে তার সৃষ্টি-বেদনা মনের মাঝেই গুমরে মরে।

আমার কাছে দামি কথা শুনতে চেয়েছ। দামি কথার জুয়েলার আমি নই। আমি ফুলের বেসাতি করি। কবি বাণীর কমল-বনের বনমালী। সে মালা গাঁথে, সে মণি-মাণিক্য বিক্রি করে না। কবি কথাকে দামি করতে পারে না, সুন্দর করতে পারে। ‘বৌ কথা কও’ যে কথা কয়, কোকিল যে কথা কয় তার এক কানাকড়ি দাম নেই। ওরা দামি কথা বলতে জানে না। ওদের কথা শুধু গান। তাই বুদ্ধিমান লোক তোতাপাখি পোষে, ময়না পাখি পোষে, ওরা ওদের রোজ ‘রাধা কেষ্ট’ বুলি শোনায়। আমরা যা বলি, তার মানেও নেই, দামও নেই। তোমায় বুদ্ধিমান লোকের দলের জানিনে বলে এত বকে যাচ্ছি। শুনতে যদি ভালো না লাগে জানিয়ো, সাবধান হবো।”

পত্রের এই অংশটিতেও গভীর জীবনদর্শন ও শিল্পভাবনা প্রকাশ পেয়েছে। এখানে কবি মানুষের বাহ্যিক রূপের চেয়ে তার অন্তরের সৌন্দর্যকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি সৃষ্টি, সৌন্দর্য, আত্মপ্রকাশ ও স্বাধীনতা সম্পর্কে নিজের চিন্তা প্রকাশ করেছেন। তাই এই পত্রাংশ কবির অন্তর্জগতেরও পরিচয়। অন্তরের সৌন্দর্যের সন্ধান মানব জীবনের অন্যতম উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। নজরুল বলেন, ‘আমি তোমাকে দেখেছি এবং দেখতে চাই লেখার মধ্য দিয়ে। সেই হল সত্যিকার দেখা।’ তার কাছে কাউকে চোখে দেখা বড় কথা নয়। তার চিন্তা, অনুভূতি ও সৃষ্টির মধ্য দিয়ে তাকে চেনাই আসল পরিচয়। তিনি বলেন, ‘মানুষ দেখার কৌতূহল আমার নেই, স্রষ্টা দেখার সাধনা আমার।’ এর মাধ্যমে বোঝা যায়, নজরুল সৌন্দর্যের মধ্যে স্রষ্টার প্রকাশ দেখতে চান। তার শিল্পদর্শনে বাহ্যিক রূপের চেয়ে অন্তরের প্রকাশ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নজরুলের কাছে সৃষ্টি হলো মনের বন্দিত্ব থেকে মুক্তি। মানুষের মনে অনেক কথা ও অনুভূতি জমে থাকে। সেগুলো প্রকাশ না পেলে মনের মধ্যে কষ্ট তৈরি হয়। তাই কবির কাজ হলো সেই বদ্ধ অনুভূতিকে মুক্ত করে দেওয়া। ‘যে চোখের জল বুকের তলায় আটকে আছে, তাকে মুক্তি দেওয়ার ব্যথা-হানা আমি’ এই কথায় সৃষ্টির এই মুক্তিদায়ী শক্তি প্রকাশ পেয়েছে। পত্রাংশে কবি নজরুল নিজের জীবনদর্শনও তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, তার জীবনের ‘পনেরো আনা’ স্বপ্ন ও সৃষ্টির জন্য এবং ‘এক আনা’ রাজনীতির জন্য। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, তার কাছে কবিতা ও সৌন্দর্যের সাধনাই জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য। রাজনীতি ও সমাজসেবা তার কাছে প্রয়োজনীয় হলেও তা তার মূল সত্তা নয়।

নান্দনিক দিক থেকেও চিঠিটির এই অংশটি অত্যন্ত সুন্দর। নজরুলের ভাষায় প্রকৃতির নানা উপমা ও চিত্রকল্প এসেছে। ‘আলোর পরশে শিশিরের ছোঁয়ায় আমার মনের কুঁড়ি বিকচ হয়ে উঠেছে’ এই বাক্যে মনের আনন্দকে ফুলের কুঁড়ি ফোটার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। এতে অনুভূতি পাঠকের চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ওঠে। অলংকারের ব্যবহারও স্বাভাবিক ও অর্থবহ। ‘মনের কুঁড়ি’ একটি রূপক। ‘আলোর পরশ’ ও ‘শিশিরের ছোঁয়া’তে মানবিক অনুভূতিকে প্রকৃতির উপাদানের সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া হয়েছে। ‘তরুর শাখায় আঘাত করলে সে ফুল দেবে না’ এখানে রূপকের মাধ্যমে মানুষের স্বাভাবিক বিকাশের কথা বোঝানো হয়েছে। ‘বারো হাত লম্বা আট হাত চওড়া দেওয়াল’ নারীর সামাজিক বন্দিত্বের একটি শক্তিশালী চিত্রকল্প। সাহিত্যমানের দিক থেকে পত্রাংশটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এখানে ব্যক্তিগত আবেগ, সমাজচিন্তা, নারীস্বাধীনতা এবং সৃষ্টির দর্শন একসঙ্গে মিশেছে। ভাষা কৃত্রিম নয়; কথোপকথনের মতো স্বাভাবিক। অথচ এর প্রতিটি ভাবের মধ্যে কবিসুলভ কল্পনা আছে। ব্যক্তিগত চিঠিকে নজরুল এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, যেখানে ব্যক্তিগত অনুভূতি হয়ে উঠেছে সামাজিক ও মানবিক সত্যের প্রকাশ। কবি বিমূর্ত ভাবকে প্রকৃতি ও রূপকথার চিত্রের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। ‘আলোর মতো, শিশিরের মতো’ কথায় কোমলতা ও পবিত্রতার অনুভূতি তৈরি হয়েছে। ‘মানস সরোবরের বদ্ধ জলধারা’ মানুষের মনের জমে থাকা অনুভূতির সুন্দর প্রতীক। আবার ‘সাত সমুদ্দুর তেরো নদীর পারের রাজকুমারী’ ও ‘সোনার কাঠি’-র কল্পনা পত্রাংশে রূপকথার আবহ তৈরি করেছে। অলংকারের ব্যবহারও এখানে স্বাভাবিক ও অর্থবহ। ‘মনের দলগুলি খুলে দেওয়া’, ‘সোনার কাঠির ছোঁয়ায় বন্দিনী জেগে ওঠা’ এবং ‘কবি বাণীর কমল-বনের বনমালী’ এসব রূপক ও চিত্রকল্পের সুন্দর উদাহরণ। নদীর জল সমুদ্রের দিকে যাওয়ার উপমার মাধ্যমে কবি তার সৃষ্টির প্রতি একাগ্রতাকে বোঝিয়েছেন। পৌরাণিক ভগীরথের উল্লেখ পত্রাংশের ভাবকে আরও গভীর করেছে।

সব মিলিয়ে, এই পত্রাংশে নজরুলের বিদ্রোহী চেতনা যেমন আছে, তেমনি আছে কোমল হৃদয়ের কবি-সত্তা। সৃষ্টি, স্বাধীনতা ও নারীমুক্তি সম্পর্কে তার চিন্তা আজও প্রাসঙ্গিক। সরল ভাষা, গভীর দর্শন, জীবন্ত চিত্রকল্প এবং মানবিক আবেদন, এই চারটি বৈশিষ্ট্যই পত্রাংশটিকে বাংলা সাহিত্যে মূল্যবান করে তুলেছে। এই পত্রাংশে নজরুলের কবিসত্তা, সৌন্দর্যবোধ ও মানবমুক্তির আকাঙ্ক্ষা একসঙ্গে প্রকাশ পেয়েছে। অন্তরের সৌন্দর্যকে জাগিয়ে তোলা এবং তাকে সৃষ্টির মাধ্যমে প্রকাশ করাই এখানে মূল কথা। সহজ ভাষা, গভীর দর্শন, সুন্দর প্রতীক ও জীবন্ত কল্পনার কারণে পত্রাংশটি বাংলা গদ্যসাহিত্যে বিশেষ মর্যাদার অধিকারী।

লেখক: শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত গীতিকার ও নজরুল গবেষক।

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর