শুক্রবার, ১৯ জুন, ২০২৬, ঢাকা

এক সাহিত্য সম্পাদকের প্রস্থান, এক যুগের অবসান

মজিদ মাহমুদ
প্রকাশিত: ১৯ জুন ২০২৬, ০৪:৫৩ পিএম

শেয়ার করুন:

sahitta
কবি আল মুজাহিদী, ইনসেটে মজিদ মাহমুদ। ছবি: সংগৃহীত

কবি আল মুজাহিদী আজ ইহজগত ত্যাগ করলেন। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। সাতের দশক থেকে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত তিনি দৈনিক ইত্তেফাকের দৌর্দণ্ডপ্রতাপ সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন। দৈনিক বাংলার কিংবদন্তি সাহিত্য সম্পাদক কবি আহসান হাবীব ১৯৮৫ সালে মৃত্যুবরণ করার পর সারা দেশের সাহিত্যযশপ্রার্থীরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতেন ইত্তেফাকের সাহিত্যপাতার জন্য।

কবি আল মুজাহিদীর রাজনৈতিক পক্ষপাত ও মতাদর্শগত বিবর্তন থাকলেও সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে তিনি ছিলেন উল্লেখযোগ্যভাবে নিরপেক্ষ। আমার প্রবন্ধ রচনার ব্যাপকতা শুরু হয়েছিল মূলত তাঁর উৎসাহ, আগ্রহ ও অব্যাহত তাগিদে। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে তাঁর স্নেহমিশ্রিত নির্দেশে আমি লিখেছিলাম একাধিক প্রবন্ধ—শামসুর রাহমান, শহীদ কাদরী, সৈয়দ শামসুল হক, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, প্রেমেন্দ্র মিত্র, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সৈয়দ আলী আহসান, মাহমুদুল হক, রাহাত খান, জীবনানন্দ দাশ, বিষ্ণু দে, ফররুখ আহমদ, রফিক আজাদ, জসীমউদ্দিন, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলকে নিয়ে। এমনকি ১৯৯৩ সালে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মৃত্যু শতবর্ষ  উপলক্ষেও তিনি আমাকে দিয়ে একটি প্রবন্ধ লিখিয়ে নিয়েছিলেন।


বিজ্ঞাপন


আরও পড়ুন

কবি ও ছড়াকার মানসুর মুজাম্মিল আর নেই

কবিতার পাশাপাশি গদ্যচর্চা আমার আগে থেকেই ছিল, কিন্তু তাঁর উৎসাহেই এই শাখায় আমার যাত্রা নিয়মিত ও সুসংহত হয়ে ওঠে। সে সময় অন্য কোনো সাহিত্য সাময়িকী এতটা বৈচিত্র্যপূর্ণ ছিল না। তখনো প্রথম আলো বা এ ধরনের পত্রিকার আবির্ভাব ঘটেনি। ইত্তেফাক, দৈনিক বাংলা ও দৈনিক সংবাদই ছিল সাহিত্যচর্চার প্রধান আশ্রয়। দৈনিক বাংলায় কর্মসূত্রে নানা বিষয়ে লিখতে হতো। আবুল হাসনাত ভাই জীবিত থাকাকালে সংবাদেও কিছু লেখা প্রকাশিত হয়েছে। তবে ইত্তেফাকে লেখা ছাপা হওয়া কিংবা বাংলাদেশ টেলিভিশনে মুখ দেখানো—দুটিই তখন লেখকসমাজে বিশেষ মর্যাদার বিষয় ছিল এবং সহজেই সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করত।

Mujahidi
দীর্ঘ অসুস্থতার পর আজ পরপারে পাড়ি জমালেন কবি আল মুজাহিদী। ছবি: সংগৃহীত

কবি হিসেবেও তিনি ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ ও স্বতন্ত্র। কবিতার বিষয় ও শৈলীর প্রতি তাঁর ছিল গভীর মনোযোগ। শব্দ নির্বাচনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সতর্ক; একটি কবিতার জন্য দীর্ঘ সময় ধরে তিনি শব্দ ও পঙ্ক্তি নিয়ে কাজ করতেন। তাঁর কবিতায় মিথ, প্রতীক ও চিত্রকল্পের ব্যবহার বিশেষভাবে লক্ষণীয়। বিষয় নির্বাচনের ক্ষেত্রেও তিনি মহাকাব্যিক অনুষঙ্গ ও পৌরাণিক উপাদানের প্রতি আকর্ষণ বোধ করতেন। বিস্তৃত পাঠাভ্যাস, জ্ঞানান্বেষণ এবং ভাষা শিক্ষার প্রতিও তাঁর ছিল গভীর আগ্রহ।


বিজ্ঞাপন


আরও পড়ুন

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু: অনন্য সাধারণ একজন অনুবাদক

সৌন্দর্যবোধ, রুচিশীলতা, বাগ্মিতা এবং পোশাক নির্বাচনের স্বাতন্ত্র্য ছিল তাঁর সহজাত ব্যক্তিত্বের অংশ। যদিও দীর্ঘদিন তাঁর সঙ্গে আমার দেখা-সাক্ষাতের সুযোগ হয়নি, তবু প্রায় এক বছর আগে তাঁকে নিয়ে বাংলাদেশ টেলিভিশনের একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের সময় তাঁকে নিয়ে কিছু বলার জন্য বিটিভি আমাকে ডেকেছিলেন। তখনই তাঁর সঙ্গে আমার শেষ সাক্ষাৎ হয়—সম্ভবত ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে। তিনি তাঁর সাক্ষাৎকারে বললেন, ১৭ বছর পরে বিটিভি তাকে ডাকলো!

কবি আল মুজাহিদীর প্রস্থান আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতির পরিসরে শূন্যতা তৈরি করল। তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।

লেখক: কবি, প্রাবন্ধিক ও গবেষক

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর