নিজস্ব প্রতিবেদক
২৪ আগস্ট ২০২৬, ০১:৫২ পিএম
নারীর নিরাপদ ডিজিটাল উপস্থিতি নিশ্চিত করতে প্রযুক্তিনির্ভর জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা (TFGBV) প্রতিরোধে বিদ্যমান আইন সংস্কারসহ ছয় দফা সুপারিশ করেছে মাল্টিপার্টি অ্যাডভোকেসি ফোরাম (ম্যাফ), ঢাকা।
সংগঠনটির পক্ষ থেকে সাইবার সহিংসতার শিকার নারীদের দ্রুত সহায়তা, পরিচয় ও ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা নিশ্চিত এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর জবাবদিহি বাড়ানোর দাবি জানানো হয়েছে।
সোমবার (২৪ আগস্ট) জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, অনলাইন যৌন হয়রানি, অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া, ডিপফেক, সেক্সটরশন, সাইবারস্টকিং, ডক্সিং ও দলবদ্ধ অনলাইন হয়রানিসহ বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর সহিংসতা নারীর নিরাপত্তা ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলছে। এসব কারণে অনেক নারী অনলাইনে মতপ্রকাশ এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে ভয় পান।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের ‘নারীর প্রতি সহিংসতা জরিপ ২০২৪’ অনুযায়ী, প্রযুক্তি ব্যবহারকারী নারীদের ৮ শতাংশ জীবদ্দশায় প্রযুক্তিনির্ভর জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন। ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে এ হার ১৬ শতাংশ, যা সংশ্লিষ্ট বয়সভিত্তিক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ।
এ ছাড়া পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন (PCSW)-এর তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৬০ হাজার ৮০৮ জন নারী সাইবার অপরাধের ঘটনায় সহায়তা চেয়েছেন। তাদের কাছে আসা অভিযোগের ৪১ শতাংশ ছিল ডক্সিং-সংক্রান্ত।
ম্যাফের পক্ষ থেকে বলা হয়, সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৬ ডিজিটাল নিরাপত্তা ও সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলেও প্রযুক্তিনির্ভর জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা মোকাবিলায় আইনে এখনো কিছু ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে ডিপফেক, সেক্সটরশন, সাইবারস্টকিং, ডক্সিং ও দলবদ্ধ অনলাইন হয়রানির মতো নতুন ধরনের অপরাধের জন্য স্পষ্ট বিধান প্রয়োজন।
সংবাদ সম্মেলনে TFGBV-এর একটি সহজ ও পরিষ্কার আইনি সংজ্ঞা নির্ধারণ, নতুন ধরনের ডিজিটাল সহিংসতার জন্য নির্দিষ্ট বিধান যুক্ত করা, ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক সুরক্ষা ব্যবস্থা চালু, দ্রুত সহায়তা ও কার্যকর তদন্ত নিশ্চিত এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়।
এ ছাড়া ভুক্তভোগীদের জন্য সহজ ও নিরাপদ অভিযোগের ব্যবস্থা, পরিচয় ও ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা, প্রয়োজন অনুযায়ী সুরক্ষা আদেশ, পুনর্বাসন ও মানসিক সহায়তার ব্যবস্থা রাখার আহ্বান জানানো হয়। ক্ষতিকর কনটেন্ট দ্রুত অপসারণ, ডিজিটাল প্রমাণ সংরক্ষণ এবং সময়মতো তদন্তের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সংবাদ সম্মেলনে গণমাধ্যমের ভূমিকার বিষয়েও গুরুত্বারোপ করা হয়। ভুক্তভোগীর পরিচয়, ছবি ও ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ না করা এবং তাকে দোষারোপ করে এমন ভাষা পরিহারের আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে ডিপফেক বা বিকৃত ছবি যাচাই ছাড়া প্রকাশ না করতে সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়।
ম্যাফ বলেছে, প্রযুক্তির ব্যবহার যেন সহিংসতা, ভয় বা নারীর অংশগ্রহণের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায় এ জন্য সরকার, সংসদ সদস্য, সরকারি প্রতিষ্ঠান, আইন বিশেষজ্ঞ, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। এ লক্ষ্যেই সরকারের সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের কাছে সুপারিশগুলো বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় আইন সংস্কার ও কার্যকর বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে আয়োজকরা বলেন, শুধু আইন করলেই হবে না; প্রতিরোধ, দ্রুত সহায়তা, ভুক্তভোগীর সুরক্ষা, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি সবগুলো বিষয় একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে। নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল পরিবেশ গড়ে তুলতে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তারা।
এম/এআরএম