নিজস্ব প্রতিবেদক
২০ জুন ২০২৬, ০৭:২৩ পিএম
বাংলাদেশে নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব বিকাশের পথে সহিংসতা, বৈষম্য, পুরুষতান্ত্রিক রাজনৈতিক পরিবেশ, আর্থিক সংকট এবং পারিবারিক বাধা বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করছে। রাজনীতিতে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা শুধু মাঠ পর্যায়ে নয়, অনলাইন পরিসরেও বিদ্যমান, যা নারীদের রাজনৈতিক অঙ্গনে সক্রিয় অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বে আসার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
শনিবার (২০ জুন) রাজধানীতে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) এবং ইউএন উইমেন আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, প্রতিনিধিত্ব ও নেতৃত্ব গঠনে সুযোগ এবং বাধাসমূহ নিয়ে পরিচালিত গুণগত গবেষণার ফলাফলে এসব তথ্য উপস্থাপন করা হয়। জাতিসংঘের নির্বাচনি সহায়তা কার্যক্রম (ডিআরআইপি/ব্যালট)-এর আওতায় পরিচালিত এই গবেষণায় রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণের পথে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরা হয়।
গবেষণায় নারী সংসদ সদস্য, স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি এবং রাজনৈতিক দলের সদস্যদের সঙ্গে ৪৩টি নিবিড় সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট আইন ও নীতি কাঠামো পর্যালোচনার মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের সংবিধান নারীর সমান অধিকার নিশ্চিত করলেও বাস্তব রাজনৈতিক পরিবেশে নারীরা এখনো নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হচ্ছেন।
অনুষ্ঠানে বিআইজিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ইমরান মতিন বলেন, নারীর জনজীবনে অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক সক্রিয়তা, দলীয় কার্যক্রম এবং দলের ভেতরে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নেতৃত্বে তাদের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা ছাড়া নারীদের বিষয়ে কোনো আলোচনা সম্পূর্ণ হয় না। গবেষণালব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে আলোচনার মাধ্যমে গণতন্ত্রের চর্চাকে আরও শক্তিশালী করাই এ উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য। এটি শুধু গণতন্ত্রের বিষয় নয়, এটি নারীর প্রতি যে অন্যায় হয়েছে তা প্রতিকারেরও বিষয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
ইউএন উইমেনের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ গীতাঞ্জলি সিং বলেন, একটি সুষ্ঠু গণতন্ত্রের জন্য নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ অপরিহার্য। এটি শুধু ন্যায়বিচারের প্রশ্ন নয়, কার্যকর শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় নারীর অংশগ্রহণ বাড়লে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, শিশু পরিচর্যা, অবকাঠামো এবং নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আরও কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্ভব হয়।
অনুষ্ঠানে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন রাজনীতিতে নারীদের প্রতিকূল পরিস্থিতির অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, নির্বাচনি সময়ে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়েছিল যে, তার স্বামী ভিন্ন নির্বাচনি এলাকার হওয়ায় তিনি নিজ এলাকার চেয়ে স্বামীর এলাকাকে প্রাধান্য দেবেন। এসব অভিযোগ ব্যর্থ হওয়ার পর অনলাইন ও সরাসরি হয়রানিমূলক প্রচারণা চালানো হয়, যার বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশন ব্যবস্থা নিয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, নিজের একটি স্বতন্ত্র পরিচয় থাকা সত্ত্বেও যদি একজন নারী এ ধরনের হয়রানির শিকার হন, তাহলে যেসব নারী তুলনামূলক কম সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন তারা প্রতিদিন কী ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন তা ভাবার বিষয়।
সংরক্ষিত নারী আসন প্রসঙ্গে সংসদ সদস্য রাশেদা বেগম হিরা বলেন, সংরক্ষিত আসন এখনো নারীদের মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ও আস্থা অর্জনের সুযোগ তৈরি করে। তিনি বলেন, পুরুষ ভোটারদের মধ্যেও নারী জনপ্রতিনিধিদের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হচ্ছে, কারণ তারা মনে করেন নারীরা তাদের সমস্যাগুলো গুরুত্ব দিয়ে শুনছেন।
জাতীয় নারী শক্তির কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মনিরা শারমিন বলেন, রাজনৈতিক দলের ভেতরে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও নারীরা বৈষম্যের মুখোমুখি হন। নারী প্রার্থীদের অনেক সময় যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বাদ দেওয়া হয় এই যুক্তিতে যে, তাদের সংরক্ষিত আসনে সুযোগ দেওয়া যাবে।
গবেষণায় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা নারীদের কাঠামোগত বাধার বিষয়টিও উঠে এসেছে। সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেন, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তিনি নির্বাচনী পরিবেশ তৈরিতে নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকার প্রশংসা করেন।
গণসংহতি আন্দোলনের রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য তাসলিমা আক্তার বলেন, নারী প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে দল, সমাজ ও পরিবার—সব জায়গাতেই নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। তিনি বলেন, একজন নারীকে তার স্বামীর পরিচয়ে নয়, বরং তার নিজস্ব যোগ্যতা ও কাজের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
আলোচনায় ড. মনীষা চক্রবর্তী বলেন, নারীদের সমানভাবে প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে হলে আইন ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায়ও সমতার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। নারীদের জন্য আলাদা বাধা রেখে তাদের সমানভাবে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা করা সম্ভব নয়।
পরে সমাপনী অধিবেশনে যোগ দেন বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ। তিনি বলেন, সর্বশেষ নির্বাচনে নারীদের অংশগ্রহণ আগের তুলনায় বেড়েছে। তবে শুধু অংশগ্রহণ নয়, নারীরা যেন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন সেটি নিশ্চিত করা জরুরি।
অনুষ্ঠানে সংসদ সদস্য, নির্বাচন কর্মকর্তা, রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, উন্নয়ন সহযোগী ও গবেষকরা অংশ নেন। বক্তারা বলেন, নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হলে সহিংসতা, বৈষম্য ও কাঠামোগত বাধা দূর করার পাশাপাশি রাজনৈতিক দল ও প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হবে। এতে দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা আরও শক্তিশালী হবে।
এএইচ/ক.ম