images

নারী ও শিশু

আমি সরি আম্মু!

১০ মে ২০২৬, ০২:৪০ পিএম

আজকে ‘বিশ্ব মা দিবস’। মায়ের জন্য ফুল, কার্ড আর শুভেচ্ছার বন্যা। খুব ভালো কথা। কিন্তু আমার কয়েকটা কথা আছে। এই যে আমরা যারা মা দিবস পালন করি, আজকের দিনে সোশ্যাল মিডিয়ায় জবুথবু মায়ের ছবি দিয়ে ভাসিয়ে ফেলি—একটু ভাবি তো, কয়জন মাকে সত্যিকার অর্থে তার প্রাপ্য সম্মান পুরো জীবনে দিয়েছি? কয়জন পরিবারের সিদ্ধান্তদাতা হিসেবে মাকে ভেবেছি?

সবচেয়ে বড় কথা, ছোটবেলায় কয়জন বুক ফুলিয়ে বলেছি যে, ‘আমি আমার মায়ের মতো হতে চাই?’ বলিনি। কারণ, মাকে আমরা সংসারে দ্বিতীয় শ্রেণির প্রাণী ভাবি।

আমার প্রজন্ম করেনি, তার আগের প্রজন্মও করেনি। এমনকি এখনকার বিরাট আধুনিক উদারমনা ‘জেন-জি’ প্রজন্মও করে না। আমি ঠিক যে টোনে আমার মাকে বলতাম, ‘তুমি বুঝবে না’।  সেই একই টোনে আমার পুত্রও আমাকে বলে, ‘তুমি বুঝবে না।’ তার মানে, মাকে শ্রদ্ধা বা সম্মান না করাটা যেন আমাদের জিনের মধ্যেই আছে।

মজার ব্যাপার হলো, এটাকে আবার জায়েজ করা হয় এই বলে যে-মা এতটাই আপন যে তার সাথে যেমন খুশি আচরণ করা যায়; মা-সন্তানের ভালোবাসার কারণে মা এসব মনে রাখেন না।

এটা স্রেফ আমাদের চোখের ওপর একটা পর্দা টানা, পিতৃতান্ত্রিক সমাজের একটা ছলনা। এটা আমরা বুঝি না বা আমাদের বোঝানো হয় না যে—যে ভালোবাসায় সম্মান থাকে না, সেই ভালোবাসা নকল। ফলে মায়েরাও তার অবস্থান নিয়ে সব সময় একটা দুর্বল জায়গায় থাকেন। বড় আবদার করতে পারেন না, কড়া শাসন করতে পারেন না; সব পরিবারের প্রধান কর্তা বাবার জন্য তুলে রাখেন।

এমনকি প্রতিদিন যে রান্নাটা হয়, সেখানেও একজন মা প্রথমে তার স্বামী, এরপর তার সন্তান, তারপর নিজের কথা ভাবেন। আর এভাবেই সন্তানেরা জেনে যায় মা ‘দ্বিতীয় শ্রেণি’। মাকে যেমন খুশি ব্যবহার করা যাবে।

একটা ছোট উদাহরণ দেই। যতবার ঢাকা থেকে বাড়ি যাই, মাকে জিজ্ঞেস করি, ‘তোমার কী লাগবে?’ আমার মা বলতে থাকেন, ‘তোমার বাবার এটা লাগবে, সে এটা খেতে পছন্দ করে, ওটা পরতে পছন্দ করে।’

আমি যতই চিৎকার করি যে, ‘তোমার কী লাগবে বলো’, সে বোকার মতো আমার দিকে তাকায়। যেন এটা বিরাট চিন্তার বিষয় যে তার নিজের কী লাগবে! কেন তাকায়? কারণ, অন্যদের চাওয়া পূরণ করতে করতে সে ভুলেই গেছে তার নিজের কী লাগবে।

সব পরিবারে এরকম একজন মা আছেন। তারা জানেনই না যে তাদেরও ভালোবাসা লাগবে, ভালো খাবারটা তারও প্রাপ্য, নিজের জন্য একটু সময় লাগবে, বিশ্রাম লাগবে। ঈদ, পূজা, বড়দিন, পয়লা বৈশাখ কিংবা ফুটবল-ক্রিকেটের ওয়ার্ল্ড কাপ ফাইনালের দিন তিনি শুধুই অন্যদের জন্য রান্না করবেন না, সারাক্ষণ রান্নাঘরে থাকবেন না-তিনিও পরিবারের অন্যদের মতো খেলা দেখবেন, সাজবেন, রেস্ট নেবেন।

তার বাপের বাড়ির আত্মীয়দের সামনে, বাচ্চার বন্ধুদের সামনে, ছেলের বউয়ের সামনে কিংবা মেয়ের জামাইয়ের সামনে তার সম্মানটা লাগবে। তাকে ‘ডিসিশন মেকিং’ বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গায় থাকতে হবে।

মা দিবসে ফুল বা শাড়ি না দিয়ে বরং বলা উচিত- ‘আমি সরি মা’। শিরিন রহমান (মায়ের নাম), আনন্দিত হওয়ার কিছু নেই। আমি আজীবন তোমার সাথে বেয়াদবের মতো ঝগড়া করেই যাব। তোমার বাকি দুই পোটলা তোমাকে আহ্লাদ করবে, আর আমি ঝগড়া করবো। ওকে?

লেখক: সংবাদকর্মী