নিশীতা মিতু
১০ মে ২০২৬, ০৮:২২ এএম
মোবাইল বা ঘড়িতে অ্যালার্ম সেট করা থাকে ঠিকই। তবে সেটি বেজে উঠার আগেই ঘুম ভাঙে যে নারীটির তিনি মা। শুরু হয় চুলা ধরিয়ে সকালের নাশতার আয়োজন। বাচ্চার টিফিন রেডি করা, তাকে ঘুম থেকে উঠিয়ে তৈরি করা, সবার সারাদিনের পরিকল্পনা গুছিয়ে নেওয়া— চলতেই থাকে। যেন অদৃশ্য এক টু ডু লিস্ট মানে তালিকা ধরে কাজের চিত্র।
যদিও এসব কাজের কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই, নেই কোনো পারিশ্রমিকও। তবুও রোজ নিঃশব্দে চলতে থাকে এক অদেখা চাকরি। যাকে আমরা সহজেই মাতৃত্ব বা মায়ের দায়িত্ব বলে পাশ কাটিয়ে যাই।
ঘরের কাজকে আমরা বেশিরভাগই কাজ হিসেবে দেখি না। ঘর গোছানো, রান্না করা, কাপড় ধোয়া এ আর এমন কী। অথচ পেশা দিয়ে সংজ্ঞায়িত করতে গেলে একজন মা পরিবারের ম্যানেজার, কেয়ারগিভার, কাউন্সেলর-সবকিছুই। কে কখন খাবে, কখন বাইরে যাবে, কার শরীর খারাপ, কার যত্নের প্রয়োজন, কার কী লাগবে, কাকে কখন সময় দিতে হবে সবকিছু মাথায় অটো সেট করে রাখেন তিনি।
সংসারের প্রতিটি সদস্যকে ভালো রাখার জন্য সব মানসিক চাপ সামলে নেন হাসিমুখেই। অফিসের কাজের নির্দিষ্ট সময় থাকে, মেলে সাপ্তাহিক ছুটি। সবচেয়ে বড় কথা মাসশেষে পাওয়া যায় বেতন। কিন্তু মায়ের কাজে কোনো সময়সীমা নেই, অফ ডে বলতে থাকে না কিছুই। মাসশেষে মেলে না বেতনও।
নিজে অসুস্থ হলেও তিনি নেন না সিক লিভ। পরিবারের সবার প্রয়োজন মেটানো, সন্তান অসুস্থ হলে সারারাত জেগে থাকা সবই তার দায়িত্বের অংশ হয়ে যায়। এমনকি উৎসবের দিনগুলোতেও অন্যদের আনন্দের আড়ালে তার ব্যস্ততা বেড়ে যায় কয়েক গুণ। মা কখনো তার কাজের তালিকা সন্তানের সামনে তুলে ধরেন না। কাজ নিয়ে তার কোনো আপত্তিও নেই। কিন্তু কাজের স্বীকৃতিই বা পায় কজন মা?
ঘরের কাজকে অনেক সময় ‘স্বাভাবিক’ বলে ধরে নেওয়া হয়। ‘তুমি তো সারাদিন বাসায় থাকো, এগুলো করাই তোমার কাজ’- এমন ধারণা মায়ের শ্রমকে আরও অদৃশ্য করে দেয়। আর তাই তার ক্লান্তি, মানসিক চাপ, মনের কথা রয়ে যায় অদৃশ্যে।
প্রতিবছর মে মাসের দ্বিতীয় রোববার পালিত হয় ‘মা দিবস’। মায়ের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতে মা কে ফুল, খাবার বা পোশাক উপহার দেন সন্তানরা।
সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করেন মায়ের সঙ্গে ছবি কিংবা তার প্রতি নানা অনুভূতি। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, বছরের বাকি দিনগুলোতে কী হয়? একজন মায়ের প্রতি সত্যিকারের সম্মান কি কেবল একদিনেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত, নাকি প্রতিদিনের আচরণেই সেটা ফুটে ওঠা দরকার? প্রশ্ন উঠতে পারে, তাহলে করণীয় কী?
বাস্তবতা বদলাতে সবার প্রথমেই দরকার সচেতনতা। পরিবারের অন্য সদস্যদের এগিয়ে আসতে হবে। কাজ ভাগ করে নেওয়া, মায়ের জন্য কিছুটা ‘নিজের সময়’ তৈরি করে দেওয়া, তার কাজের মূল্য দেওয়া। এগুলোই হতে পারে তার জন্য সারা বছরের উপহার। নিজের কাজ নিজে করা, রান্নায় সাহায্য করার মতো ছোটোখাটো কাজই মায়ের মানসিক প্রশান্তির কারণ হতে পারে।
মায়ের ভালোবাসা দৃশ্যমান হলেও সন্তানের প্রতি তার শ্রম অনেকটাই অদৃশ্য। এই মা দিবসে হয়তো তার জন্য সবচেয়ে বড় উপহার হতে পারে- তার এই অদৃশ্য শ্রমকে স্বীকৃতি দেওয়া, প্রতিদিনের জীবনে তাকে একটু স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা করা। কারণ, একজন মা শুধু একটি পরিবারের ভিত্তিই নন; তিনি সেই শক্তি, যার ওপর পুরো সংসার দাঁড়িয়ে থাকে।
এনএম