২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৪ পিএম
*তীব্র গরমের পর হঠাৎ বৃষ্টি, বাড়ছে আবহাওয়ার বৈপরীত্য
*শরতের বৃষ্টির সঙ্গে কোথাও কোথাও তাপপ্রবাহ
*দিনে গরম, রাতে ঠান্ডা—বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি
*তাপমাত্রার ওঠানামায় সর্দি-কাশি ও জ্বরের প্রকোপ
*গরম ও আর্দ্রতায় অস্বস্তি বাড়ছে মানুষের
*অ্যালার্জি ও শ্বাসতন্ত্রের সমস্যায় ভোগান্তি বাড়ার শঙ্কা
*জলবায়ু পরিবর্তনে বাড়ছে চরম আবহাওয়ার প্রবণতা
ষড়ঋতুর এই দেশে শরতের মাঝামাঝি সময় চলছে। কিন্তু প্রকৃতিতে নেই এই ঋতুর চিরচেনা স্বস্তি। কখনো তীব্র রোদ ও ভ্যাপসা গরম, আবার হঠাৎ কালো মেঘে ছেয়ে যায় আকাশ, নামে বৃষ্টি। কখনো কখনো দিনের বেলায় গরমে হাঁসফাঁস অবস্থা, আবার সন্ধ্যা বা রাতে বৃষ্টির পর তাপমাত্রা কিছুটা কমে গেলে ঠান্ডা অনুভূত হচ্ছে। ফলে ঋতুর স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না মানুষ।
সেপ্টেম্বরের শুরু থেকেই দেশের আবহাওয়ায় এমন বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদফতরের, দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে চলতি সেপ্টেম্বর স্বাভাবিকের তুলনায় উষ্ণ থাকার কথা বলা হয়েছিল। মাসটিতে দুই থেকে তিনটি মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহের সম্ভাবনার কথাও জানানো হয়। একই সঙ্গে বৃষ্টিপাত সামগ্রিকভাবে স্বাভাবিকের চেয়ে কম থাকার পূর্বাভাস থাকলেও বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ তৈরি হলে হঠাৎ ভারী বৃষ্টি ও স্থানীয় বন্যার আশঙ্কার কথাও বলা হয়েছিল। এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গরম ও বৃষ্টির এমন বিপরীত চিত্র দেখা গেছে। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে পূর্ব ও উপকূলীয় অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় ভারী বৃষ্টি হলেও পশ্চিম ও মধ্যাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় মৃদু তাপপ্রবাহ বিরাজ করছিল।
একই সময়ে কোথাও ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি তাপমাত্রা, আবার কোথাও কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে বৃষ্টি হয়েছে। ২৩ সেপ্টেম্বরও দেশের বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টি ও বজ্রবৃষ্টির সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদফতর। একই সময়ে রংপুর, দিনাজপুর ও সৈয়দপুর অঞ্চলের ওপর দিয়ে মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার তথ্যও দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ শরতের এই সময়ে দেশের এক অংশে বৃষ্টি, অন্য অংশে গরম দুই ধরনের আবহাওয়া একই সঙ্গে সক্রিয় থাকছে।
কেন এমন হচ্ছে?
আবহাওয়ার এই অস্বাভাবিকতার পেছনে একাধিক প্রাকৃতিক ও বৈশ্বিক কারণ কাজ করছে। মৌসুমি বায়ুর অবস্থান, বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ বা লঘুচাপ, বাতাসে জলীয়বাষ্প, মেঘের গতিপথ এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার পরিবর্তন সব মিলিয়ে স্বল্প সময়ের মধ্যে আবহাওয়ার চরিত্র বদলে যেতে পারে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব। পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বাড়ার ফলে বায়ুমণ্ডল ও সমুদ্রের তাপীয় ভারসাম্য বদলে যাচ্ছে।
এতে চরম গরমের পাশাপাশি ভারী বৃষ্টি ও অন্যান্য চরম আবহাওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপপ্রবাহের মাত্রা, স্থায়িত্ব ও তীব্রতা বাড়ছে এবং অতিরিক্ত তাপ মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এবারের পরিস্থিতিতে এল নিনোর প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, চলতি এল নিনো আগামী কয়েক মাসে খুব শক্তিশালী হতে পারে এবং ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি। এল নিনো নিজে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্টি হয় না; এটি একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ঘটনা। তবে উষ্ণ হয়ে ওঠা পৃথিবীতে এর প্রভাব তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক ধরনকে আরও অস্বাভাবিক করে তুলতে পারে।
আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদ ঢাকা মেইলকে বলেন, এবার এল-নিনো থাকায় আমাদের অঞ্চলে স্বাভাবিকের চেয়ে গড় বৃষ্টিপাত কম হয়েছে। তবে অল্প সমেয় বৃষ্টিপাত হওয়ার প্রবণতা দেখা গিয়েছি। এছাড়া আমাদের মৌসুমি ধরণেও পরিবর্তন এসেছে। আগে জুন মাসে যেভাবে বৃষ্টি হতো, ইদানিং বর্ষার শুরুতে সেই তুলনায় বৃষ্টিপাত হয়েছে। গত কয়েক বছরেও এমন প্রবণতা দেখা গেছে। আগে বর্ষার শুরুতে টানা তিন থেকে চার দিন বৃষ্টি হতো, কিন্তু এখন আর সে রকম হয় না। আবার দেখা যায়, বর্ষাকালের শেষের দিকে বৃষ্টিপাত তুলনামূলক বেশি হয়। যেহেতু এ বছর একটি এল নিনোর প্রভাব দেখা যাচ্ছে।
হঠাৎ হঠাৎ অতিবৃষ্টি এর কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, এবার এল নিনোর প্রভাব, সাগরে একাধিক লঘুচাপ, মৌসুমি বায়ুর সক্রিয়তা এবং বর্ষার চরিত্র পরিবর্তনের কারণে অল্প সময়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছে। গত কয়েক বছর ধরেই বর্ষার শুরুতে বৃষ্টি কম হলেও পরে বেশি হচ্ছে। বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, সেপ্টেম্বর-অক্টোবর পর্যন্তও বৃষ্টি হচ্ছে। অর্থাৎ গত কয়েক বছর ধরেই বর্ষা তার আচরণ পরিবর্তন করছে।
বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ কী?
বাংলাদেশের মতো উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ুর দেশে তাপমাত্রা সামান্য বাড়লেও মানুষের অস্বস্তি অনেক বেড়ে যায়। কারণ উচ্চ তাপমাত্রার সঙ্গে বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকলে ঘাম শরীর থেকে সহজে শুকাতে পারে না। ফলে শরীর নিজেকে ঠান্ডা করার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি হয় এবং গরমের অনুভূতি আরও তীব্র হয়। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদফতরের সেপ্টেম্বরের পূর্বাভাসেও এ ধরনের উচ্চ আর্দ্রতার কারণে গরমের অস্বস্তি বাড়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।
শুধু অস্বস্তিই নয়, দীর্ঘ সময় গরমের মধ্যে থাকলে শরীরে পানিশূন্যতা, অতিরিক্ত ঘাম, দুর্বলতা, মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাব ও হিট এক্সহস্টশনের মতো সমস্যা হতে পারে। পরিস্থিতি গুরুতর হলে হিটস্ট্রোকও হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, অতিরিক্ত তাপ হৃদ্যন্ত্র, কিডনি ও শ্বাসতন্ত্রের ওপর চাপ বাড়াতে পারে এবং আগে থেকে থাকা হৃদ্রোগ, ডায়াবেটিস ও শ্বাসতন্ত্রের রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
গরম-বৃষ্টির পালাবদলে বাড়ছে সর্দি-জ্বর
আবহাওয়ার এই দ্রুত পরিবর্তনের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব পড়ছে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। একদিকে দিনের তীব্র গরম, অন্যদিকে হঠাৎ বৃষ্টি ও রাতের তুলনামূলক ঠান্ডা পরিবেশ শরীরকে বারবার ভিন্ন তাপমাত্রার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হচ্ছে। ফলে অনেকের মধ্যে সর্দি, কাশি, জ্বর, গলা ব্যথা, মাথাব্যথা ও শরীর খারাপের মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তবে আবহাওয়া সরাসরি সব ধরনের জ্বর বা সর্দির কারণ এমনটি বলা ঠিক নয়। এসব অসুস্থতার পেছনে ভাইরাসসহ বিভিন্ন জীবাণু, সংক্রমণ এবং ব্যক্তির শারীরিক অবস্থাও ভূমিকা রাখে। কিন্তু তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, বৃষ্টিপাত ও মানুষের ঘরের ভেতর-বাইরের চলাচলের ধরন বদলে গেলে কিছু সংক্রমণ ও স্বাস্থ্যঝুঁকির পরিবেশ তৈরি হতে পারে।
বাড়ছে অ্যালার্জি ও শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা
গরম ও আর্দ্র আবহাওয়া অনেকের অ্যালার্জির সমস্যাও বাড়িয়ে দিতে পারে। ঘরের ভেতর অতিরিক্ত আর্দ্রতা থাকলে ছত্রাক বা অন্যান্য অ্যালার্জেনের বিস্তার বাড়তে পারে। বাইরে বৃষ্টি ও গরমের পালাবদলের সঙ্গে বাতাসের গুণমান, ধুলা ও বিভিন্ন জৈব কণার উপস্থিতিতেও পরিবর্তন আসতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তন ও বায়ুদূষণের সম্মিলিত প্রভাবে পরাগরেণু ও বাতাসে থাকা জৈব কণার কারণে অ্যালার্জি ও শ্বাসতন্ত্রের সমস্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। উচ্চ তাপমাত্রা ও বায়ুমণ্ডলীয় পরিবর্তন পরাগরেণুর উৎপাদন ও উপস্থিতির সময়কালও প্রভাবিত করতে পারে, যা অ্যালার্জির উপসর্গ বাড়াতে পারে। ফলে যাদের আগে থেকেই অ্যাজমা, অ্যালার্জি, সাইনোসাইটিস বা অন্য কোনো শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা রয়েছে, আবহাওয়ার এমন ওঠানামায় তাদের সমস্যা বেড়ে যেতে পারে। নাক বন্ধ হওয়া, হাঁচি, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ চুলকানো, কাশি কিংবা শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
মশাবাহিত রোগের ঝুঁকিও বাড়তে পারে
বৃষ্টি ও গরমের আরেকটি বড় প্রভাব মশার বংশবিস্তারের সঙ্গে সম্পর্কিত। হঠাৎ বৃষ্টির পর বিভিন্ন জায়গায় পানি জমে থাকলে এডিসসহ বিভিন্ন প্রজাতির মশার প্রজননস্থল তৈরি হচ্ছে। আবার বৃষ্টির পর আর্দ্র ও উষ্ণ পরিবেশ মশার জীবনচক্রের জন্য অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। ফলে বৃষ্টি থামার পর বাসাবাড়ির ছাদ, বারান্দা, নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত পাত্র, ড্রাম, টব, ডাবের খোসা বা অন্যান্য পাত্রে জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার না করলে মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে পানি নিষ্কাশনের সমস্যা থাকলে এ ঝুঁকি আরও বাড়ে। শুধু ডেঙ্গু নয়, জলাবদ্ধতা ও অপরিষ্কার পরিবেশের কারণে অন্যান্য পানিবাহিত ও সংক্রামক রোগের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। বৃষ্টির পর ময়লা পানি ও বর্জ্য মিশে গেলে নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
কৃষিতেও বিরূপ প্রভাব
আবহাওয়ার এই অনিয়মের প্রভাব শুধু মানুষের শরীরেই সীমাবদ্ধ নয়। কৃষিতেও এর প্রভাব পড়ছে। অতিরিক্ত গরমে মাটির আর্দ্রতা দ্রুত কমে যেতে পারে, আবার হঠাৎ ভারী বৃষ্টিতে জমিতে পানি জমে ফসলের শিকড় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্যে রোগবালাইয়ের প্রকোপও বাড়তে পারে। কৃষকদের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে আবহাওয়ার পূর্বানুমানযোগ্যতা কমে যাওয়া। কোন সময়ে বৃষ্টি হবে, কতটা বৃষ্টি হবে বা বৃষ্টির পর আবার কতটা গরম পড়বে—এসব অনিশ্চয়তার কারণে বীজ বপন, চারা রোপণ, সেচ, সার প্রয়োগ ও কীটনাশক ব্যবহারের সময় নির্ধারণে সমস্যা হতে পারে।
নগরজীবনে বাড়ছে ভোগান্তি
ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে গরম ও বৃষ্টির পালাবদল মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়িয়ে দেয়। তীব্র গরমে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ে, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ও বৈদ্যুতিক পাখির ব্যবহার বাড়ায় পরিবারের ব্যয়ও বাড়ে। আবার হঠাৎ বৃষ্টিতে রাস্তায় পানি জমে যানজট তৈরি হয়। কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী, রিকশাচালক, নির্মাণশ্রমিক ও অন্যান্য খোলা জায়গায় কাজ করা মানুষ সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েন। বৃষ্টির পর জলাবদ্ধ রাস্তায় যানবাহনের গতি কমে যায়, অফিস-আদালত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াতে সময় বেড়ে যায়। অনেক এলাকায় পানি জমে থাকলে পথচারীদের চলাচলও কঠিন হয়ে পড়ে। তীব্র গরমের মধ্যে আবার বৃষ্টি না থাকলে ধুলাবালি ও বায়ুদূষণের সমস্যা বাড়তে পারে।
বাইরে কাজ করা মানুষের ঝুঁকি বেশি
রিকশাচালক, নির্মাণশ্রমিক, কৃষিশ্রমিক, পরিবহনশ্রমিক, হকারসহ খোলা আকাশের নিচে কাজ করা মানুষের ওপর তাপ ও আর্দ্রতার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে। দীর্ঘ সময় রোদে কাজ করলে শরীরে পানিশূন্যতা ও তাপজনিত অসুস্থতার ঝুঁকি বাড়ে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও আউটডোর ও নরমাল ওয়ার্কাসকে অতিরিক্ত তাপের ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর মধ্যে রেখেছে। অন্যদিকে বৃষ্টির সময় ভিজে দীর্ঘক্ষণ ভেজা কাপড়ে থাকা, বৃষ্টির পানি ও কাদার সংস্পর্শে আসা এবং এরপর আবার গরমে কাজ করার ফলে শারীরিক অস্বস্তি আরও বাড়তে পারে। পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও নিরাপদ পানি না পেলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে।
শিশু ও বয়স্কদের বাড়তি সতর্কতা দরকার
শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী এবং আগে থেকেই হৃদ্রোগ, ডায়াবেটিস, কিডনি বা শ্বাসতন্ত্রের রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা অতিরিক্ত গরমের ঝুঁকিতে বেশি থাকেন। একইভাবে অ্যাজমা ও অ্যালার্জির রোগীদের আবহাওয়ার পরিবর্তনে উপসর্গ বাড়তে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন সময়ে পর্যাপ্ত পানি পান, অতিরিক্ত গরমে অপ্রয়োজনে বাইরে না থাকা, বৃষ্টির পানি এড়িয়ে চলা, ভেজা কাপড় দ্রুত পরিবর্তন করা এবং ঘর পরিষ্কার ও বাতাস চলাচলের উপযোগী রাখা জরুরি। শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
এটা কি নতুন স্বাভাবিক?
আবহাওয়ার এমন পরিবর্তনকে একক কোনো কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। মৌসুমি বায়ু ও বঙ্গোপসাগরের স্বাভাবিক আবহাওয়াগত প্রক্রিয়ার পাশাপাশি বৈশ্বিক উষ্ণায়ন দীর্ঘমেয়াদে তাপমাত্রা ও চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। আবার এল নিনোর মতো প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ঘটনা নির্দিষ্ট সময়ে তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের ধরনে বাড়তি পরিবর্তন আনতে পারে। চলতি এল নিনো আগামী কয়েক মাসে শক্তিশালী হওয়ার পূর্বাভাসও রয়েছে। তাই শরতে গরম পড়া বা বৃষ্টি হওয়া নিজে অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়। অস্বাভাবিকতা হচ্ছে আবহাওয়ার চরমতা, দ্রুত পরিবর্তন এবং একই সময়ে দেশের একেক অঞ্চলে একেক ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হওয়া। বিজ্ঞানীদের কাছে এ ধরনের ঘটনাকে জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ওঠানামার বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে দেখতে হয়।
বাংলাদেশে এই পরিবর্তনের প্রভাব সামনের দিনগুলোতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। চলতি সেপ্টেম্বরের আবহাওয়া ইতোমধ্যেই দেখিয়ে দিচ্ছে—শুধু বর্ষা বা শরৎ কিংবা শীতের প্রচলিত ধারণা দিয়ে এখনকার আবহাওয়াকে পুরোপুরি বোঝা কঠিন হয়ে পড়ছে। কখনো তীব্র গরম, কখনো ঝুম বৃষ্টি, আবার কিছুক্ষণ পরই ভ্যাপসা আবহাওয়া—এই পালাবদলের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য, কৃষি, নগর ব্যবস্থাপনা ও দুর্যোগ প্রস্তুতিকেও নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে।
আবহাওয়াবিদ ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক জানান, রোদ ও বৃষ্টি এক সঙ্গে হলে গরমটা বেশি অনুভূত হবে। কারণ আমরা সবাই জানি বৃষ্টির পর রোদ উঠলে গরম বেশি লাগে।
গরম বেশি লাগার কারণ ব্যাখা করে তিনি বলেন, বর্ষায় মেঘ খুব কাছে চলে আসার কারণে বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেশি থাকে। ফলে বৃষ্টির পর রোদ ওঠলে শরীর থেকে যে ঘাম বের হয়, তা আবার বাতাস শুষে নিতে পারে না। কারণ বাতাস আগে থেকেই ভেজা থাকে। ফলে শরীরের অভ্যন্তরের তাপমাত্রা ত্বকের ওপরে জমে থাকা ঘামের কারণে বেরোতে পারে না। তাই ভ্যাপসা গরম অনুভূত হয়। এই সময় আবহাওয়া তপ্ত হয়ে ওঠবে না।
গবেষণা কি বলছে
ওয়াশিংটনের আবহাওয়া ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বিশ্ব্যব্যাপী বায়ুমন্ডলে উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাবে। এতে এসব অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দেবে। শুধু গরিব মানুষ নন, ধনীরাও এর শিকার হবেন। খাবার পানির সংকট সবাইকে বিপর্যস্ত করবে। জলবায়ু উদ্বাস্তু হয়ে মানুষ এলাকা ছাড়তে বাধ্য হবে। দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ারই লাখ লাখ মানুষ পরিবেশগত উদ্বাস্তুতে পরিণত হবে। তবে উন্নত পরিবেশ, দূষণরোধ প্রযুক্তির দ্রুত ব্যবহারের মাধ্যমে সম্ভাব্য দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি লাঘব হতে পারে বলে আশ্বস্তও করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
শুধু গরিব মানুষ নন, ধনীরাও এর শিকার হচ্ছেন৷ খাবার পানির সংকট সবাইকে বিপর্যস্ত করছে৷ লবণ পানির কারণে এই এলাকায় প্রতি তিনজনে একজন উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন৷ জলবায়ু উদ্বাস্তু হয়ে মানুষ এলাকা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন৷ ওয়াশিংটনের আবহাওয়া ইনস্টিটিউটের সহযোগিতায় ৬০ জনের একটি আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধি দল এবং ৮টি এশীয় দেশের সরকার এই জরিপ কার্যক্রম চালায়।
ওই জরিপে বলা হয়েছে, উপকূলের ব্যাপক এলাকা সাগরের স্ফীত পানিতে নিমজ্জিত হবে এবং ভূমিধসের সৃষ্টি হবে। মিষ্টি পানির প্রবাহে লবণাক্ত পানি প্রবেশ করবে। উপকূলীয় ব্যাপক এলাকায় মৎস্য উৎপাদন হ্রাস পাবে এবং ঝড়ে ক্ষয়ক্ষতির প্রকোপও বৃদ্ধি পাবে। দক্ষিণাঞ্চলীয় ৮টি দেশ বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম এবং ফিলিপাইনে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশ বসবাস করে। বিশ্বব্যাপী বায়ুমণ্ডলের উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে সৃষ্ট গ্রিন হাউস প্রতিক্রিয়ায় মারাত্মক ক্ষতির শিকার হবে এসব দেশ।
বাংলাদেশ উন্নয়ন পরিষদ পরিচালিত ‘বাংলাদেশে গ্রিন হাউসের প্রভাব এবং আবহাওয়ার পরিবর্তন’ শীর্ষক গবেষণা গ্রন্থে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের আবহাওয়া ক্রমশ উত্তপ্ত হচ্ছে। গত শতাব্দীর শেষ দিকের তুলনায় গড় তাপমাত্রা বর্তমানে ০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। এখন আবহাওয়া ঠাণ্ডা হওয়ার কোনো প্রবণতা নেই বলে গবেষণা গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে। এভাবে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেতে থাকলে ২০৩১ সাল নাগাদ বর্তমানের তুলনায় দেশের তাপমাত্রা ১ থেকে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং ২০৫০ সাল নাগাদ ১.৫ থেকে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যার মূলে রয়েছে ‘গ্রিন হাউস এফেক্ট’।
আরও পড়ুন: হঠাৎ গরম, হঠাৎ বৃষ্টি কারণ কী?
স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি চলমান অবস্থায় আছে। আমরা যদি দেখি প্রি ইন্ডাস্ট্রিয়াল সময়টাতে বিশেষ করে ১৯৫০ সালের পর যে তাপমাত্রাটা ছিল বৈশ্বিক তাপমাত্রা, সেটা যাতে না বৃদ্ধি পায় সেজন্য বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে দেশগুলো কমিটমেন্ট করেছিল। কমিটমেন্টে এটা ছিল যে ২০৩০ সাল পর্যন্ত তাপমাত্রা যেন না বাড়ে। কিন্তু ২০২৩ সালের মাথায় দেখা যাচ্ছে যে বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা ১ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেয়েছে। সে হিসেবে ২০৫০ সাল নাগাদ এই তাপমাত্রা বৃদ্ধি ২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করবে। আজ থেকে ৩০ বছর আগে ধারণা করা হয়েছিল বিশ্বের তাপমাত্রা যদি এক ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পায়, তবে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে অর্থাৎ বাংলাদেশের সমুদ্রপৃষ্টের উচ্চতা বাড়বে আধা মিটার। এতে করে বাংলাদেশের ১০ থেকে ১৫ ভাগ এলাকা বেশি প্লাবিত হবে। আবার লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাবে।
আহমদ কামরুজ্জামান আরও বলেন, আগামী ৫০ সাল নাগাদ জলবায়ু পস্থিতি আমাদের জন্য সুখকর নয়। যে হিসেবে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে এটা যদি চলতে থাকে, তবে বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্যের জন্য তা হুমকি তৈরি করবে। আমাদের উপকূলীয় অঞ্চল যেমন প্লাবিত হবে, সেই সমস্ত এলাকার মানুষজন যখন নগর অঞ্চলে মাইগ্রেট করবে তখন স্বল্প ভূমির ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়বে। নগরের পরিবেশ নষ্ট হবে। আমাদের উন্নয়ন ব্যাহত হবে। এছাড়া অদূর ভবিষ্যতে আমাদের দ্বীপ অঞ্চল যেগুলো আছে যেমন সেন্টমার্টিন, ভোলা, সন্দ্বীপ, হাতিয়া এগুলো চরম ক্ষতিগ্রস্ত বা বিলীন হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
জলবায়ুর এমন পরিবর্তনের জন্য বন উজাড়কেই প্রধান কারণ বলে গণ্য করা হয়। একটি দেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও পরিবেশকে সুন্দর-সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখতে দেশের মোট আয়তনের শতকরা ২৫ ভাগ বনভূমি থাকা অত্যাবশ্যক। সেখানে আমাদের দেশে বনভূমির পরিমাণ সরকারি হিসাব মতে শতকরা ৯ ভাগ। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে বনভূমির পরিমাণ ৬ ভাগের বেশি হবে না বলেই পর্যবেক্ষকদের ধারণা। দেশে বনভূমির এই অস্বাভাবিক হ্রাসের কারণে বাংলাদেশের জলবায়ু ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে।
এমএইচএইচ/টিএই/এআরএম