নিজস্ব প্রতিবেদক
১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:০৩ এএম
কয়েক দিন ধরেই তীব্র গরমে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে জনজীবন। ঘরের ভেতর ফ্যান ঘুরলেও মিলছে না স্বস্তি। বাইরে বের হলে রোদের তাপে শরীর পুড়ে যাওয়ার উপক্রম। গরমে শুধু শরীর নয়, খিটখিটে হয়ে উঠছে মেজাজও। ঘর থেকে সড়ক, বাস থেকে কর্মস্থল-প্রায় সবখানেই এখন স্বস্তির বদলে অস্বস্তি আর হাঁসফাঁস অবস্থা।
আবহাওয়া অধিদফতরের সর্বশেষ পূর্বাভাসে ঢাকায় বৃষ্টির আভাস দেওয়া হয়েছিল। গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার পূর্বাভাসে তাপমাত্রা কমারও কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু তাপমাত্রায় তেমন পরিবর্তন আসেনি। বৃষ্টিরও দেখা নেই। ফলে গরমের তীব্রতায় স্বস্তি ফেরেনি জনজীবনে।
ঘরের ভেতর ফ্যান ঘুরলেও বাতাসে স্বস্তি নেই। বরং কোথাও কোথাও মনে হচ্ছে, ফ্যান থেকে বের হচ্ছে গরম হাওয়া। বিছানায় যে পাশে ফ্যানের বাতাস সরাসরি পড়ছে, সেদিকটায় কিছুটা আরাম লাগলেও অন্য পাশ মুহূর্তেই ঘামে ভিজে যাচ্ছে।
বাইরে বের হলে ভোগান্তি আরও বাড়ছে। পিচঢালা সড়কে হাঁটতে গিয়ে মনে হচ্ছে, চারপাশ থেকে আগুনের আঁচ আসছে। রোদে কয়েক মিনিট দাঁড়ালেই ঘামে ভিজে যাচ্ছে পোশাক। সপ্তাহের চতুর্থ কর্মদিবসের সকালেও ছাতা মাথায় দিয়ে পুরোপুরি স্বস্তি মিলছে না।
শুধু ঘর কিংবা সড়ক নয়, গরমের ভোগান্তি বাড়ছে গণপরিবহনেও। একটু স্বস্তি পেতে যাত্রীরা বাসের জানালার পাশে বসার চেষ্টা করছেন। রাজধানীতে চলাচল করা বাসগুলোর ভেতরে ফ্যান থাকলেও সেই বাতাসও গরম।
জানালার পাশে বসা যাত্রী কিছুটা বাতাস পেলেও ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষদের পোহাতে হচ্ছে অবর্ণনীয় কষ্ট। স্বস্তি পেতে অনেকে ফ্যানের নিচে দাঁড়াচ্ছেন। এ নিয়ে কোনো কোনো বাসে যাত্রীদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি ও ঝগড়ার ঘটনাও ঘটছে।
সকালে বাড্ডা এলাকায় রাইদা বাসে দাঁড়িয়ে থাকা দুই যাত্রীর মধ্যে তর্কাতর্কির ঘটনা দেখা যায়। আগে বাসে ওঠা এক যাত্রী সিট না পেয়ে ফ্যানের নিচে দাঁড়িয়ে ছিলেন। পরে লিংক রোডে বাসটি থামলে কয়েকজন যাত্রী ওঠেন। বাসের ভেতরে কিছু জায়গা ফাঁকা থাকলেও ফ্যানের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা ওই যাত্রী জায়গা না ছাড়ায় নতুন ওঠা কয়েকজন ভেতরে যেতে পারছিলেন না। এ নিয়ে এক যাত্রীর সঙ্গে ওই ব্যক্তির কিছুক্ষণ তর্কাতর্কি হয়। পরে অন্য যাত্রীদের মধ্যস্থতায় তাদের ঝগড়া থেমে যায়।
বাসটিতে ফ্যান চললেও মনে হচ্ছিল গরম বাতাসই বেরোচ্ছে। গরমের কারণে রাস্তায় বের হওয়া অনেককেই বারবার মুখে পানি দিতে দেখা গেছে।
বাসটির যাত্রী বেসরকারি চাকরিজীবী সোহেল বলেন, ‘গরমের কারণে রাতে ঘুমাতে অনেক কষ্ট হয়েছে। ফ্যানের বাতাস যেদিকে পড়ছে, সেদিকে কিছুটা আরাম লাগলেও অন্য পাশে শরীর ঘামে ভিজে যায়। ফলে বারবার পাশ বদলাতে হয়। গরম থেকে রক্ষা পেতে ঘরের ভেতরে বালতিতে পানি ভর্তি করে রেখেও কোনো কাজ হয়নি।’
একই বাসের যাত্রী রনজু মিয়া বলেন, ‘গরমে বাইরে বের হলেই মনে হচ্ছে শরীর পুড়ে যাচ্ছে। রাস্তায় যেমন কষ্ট, বাসের ভেতরেও একই অবস্থা। সকালেই যদি এই অবস্থা হয়, তাহলে দুপুরে কী অবস্থা হবে, আল্লাহই ভালো জানেন।’
মেজাজ হারাচ্ছেন মানুষ
তীব্র গরমের প্রভাব পড়ছে মানুষের মেজাজেও। বাসে ওঠানামার সময় ধাক্কাধাক্কি, একটু জায়গা নিয়ে সমস্যা কিংবা যানজটে দীর্ঘ সময় আটকে থাকা নিয়েই বিরক্ত হয়ে পড়ছেন অনেকে।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) সকাল আটটার দিকে শাহজাদপুর ও নতুনবাজার এলাকায় অনেক গাড়িকে যানজটে আটকে থাকতে দেখা গেছে। উপায় না পেয়ে অনেকে গাড়ি থেকে নেমে গন্তব্যের উদ্দেশে হেঁটেই রওনা হন। তাদের অনেকের মাথায় ছিল ছাতা। শরীর থেকে টপটপ করে ঝরছিল ঘাম। কেউ বারবার কপালের ঘাম মুছছেন। আবার অনেক নারীকে সঙ্গে ছোট ফ্যান আনতে দেখা গেছে। সবার মুখেই ছিল ক্লান্তি ও বিরক্তির ছাপ।
নতুনবাজার ট্রাফিক সিগন্যালে একজন মোটরসাইকেল আরোহীকে হেলমেট খুলে মুখে পানি দিতে দেখা যায়। কয়েকবার মুখে পানি ছিটিয়ে আবার হেলমেট পরছিলেন তিনি। সিগন্যালে অপেক্ষার সময়টুকুও যেন তার কাছে গরম থেকে সাময়িক স্বস্তি পাওয়ার চেষ্টা।
ভোগান্তির অন্ত নেই খেটে খাওয়া মানুষের
যাদের দিনের বড় অংশই বাইরে কাটাতে হয়, তাদের দুর্ভোগ আরও বেশি। রিকশাচালক, শ্রমিক, হকার, নির্মাণশ্রমিক কিংবা পথচারীদের রোদ ও গরমের মধ্যেই কাজ করতে হচ্ছে।
কেউ মাথায় ভেজা কাপড় দিচ্ছেন, কেউ বারবার পানি পান করছেন। কিন্তু কাজের প্রয়োজনে দীর্ঘ সময় বাইরে থাকতে হওয়ায় অনেকেরই বিশ্রামের সুযোগ কম।
রাজধানীর বাঁশতলা এলাকায় যাত্রীর জন্য অপেক্ষা করছিলেন রিকশাচালক আশরাফুল। সকালেই তার পিঠের জামা ঘামে ভিজে শরীরের সঙ্গে লেগে ছিল।
ঢাকা মেইলকে তিনি বলেন, ‘গরমের মধ্যে রিকশা চালানো খুব কষ্টের। রোদে কিছুক্ষণ চালালেই শরীর ঘামে ভিজে যায়। যাত্রী নিয়ে আসার পর দাঁড়ালে গরমটা আরও বেশি লাগে। একটু পরপর পানি খেতে হয়। কিন্তু গরম বলে তো আর রিকশা চালানো বন্ধ রাখা যায় না-সংসার তো চালাতে হবে।’
কী বলছে আবহাওয়া অধিদফতর
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা ৬টা থেকে পরবর্তী ১২০ ঘণ্টার জন্য যে পূর্বাভাস আবহাওয়া অফিস দিয়েছে তাকে ঢাকাসহ দেশের কয়েকটি অঞ্চলে বৃষ্টির সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে সেখানে দেশের তিন বিভাগে ভারী বর্ষণে পূর্বাভাস দেওয়ার পাশাপাশি ২৫ জেলার ওপর দিয়ে মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে সংস্থাটি।
আবহাওয়াবিদ এ কে এম নাজমুল হক জানান, মৌসুমি বায়ুর অক্ষের বর্ধিতাংশ রাজস্থান, উত্তর প্রদেশ, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের মধ্যাঞ্চল হয়ে আসাম পর্যন্ত বিস্তৃত। মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের ওপর কম সক্রিয় এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে মাঝারি অবস্থায় রয়েছে।
আবহাওয়ার বার্তায় আরও জানানো হয়, মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা ৬টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় রংপুর, ময়মনসিংহ, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় এবং রাজশাহী, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের দু-এক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্গে রংপুর, সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী বর্ষণ হতে পারে।
তাপপ্রবাহ নিয়ে আবহাওয়ার বার্তায় বলা হয়েছে, ময়মনসিংহ (৪ জেলা) ও সিলেট (৪ জেলা) বিভাগসহ ঢাকা, টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, রাজশাহী, সিরাজগঞ্জ, রংপুর, নীলফামারী, চাঁদপুর, ফেনী, যশোর, চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া, সাতক্ষীরা, খুলনা, বরিশাল ও পটুয়াখালী জেলাগুলোর ওপর দিয়ে মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে এবং তা কিছু কিছু জায়গা থেকে প্রশমিত হতে পারে। সারাদেশে দিন এবং রাতের তাপমাত্রা সামান্য কমতে পারে।
এমআর