images

আবহাওয়া

এল নিনোর প্রভাবে এবার বর্ষায় বৃষ্টিপাত কমার শঙ্কা

মো. মেহেদী হাসান হাসিব

০৬ মে ২০২৬, ১১:১০ পিএম

বর্ষাকাল মানেই বৃষ্টির মৌসুম—এমন ধারণা থাকলেও এবার ভিন্ন চিত্র দেখা যেতে পারে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বর্ষায় ঝড়-বৃষ্টি ও বজ্রঝড় থাকলেও সামগ্রিকভাবে দেশে স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাত হতে পারে। প্রশান্ত মহাসাগরের অস্বাভাবিক উষ্ণতার কারণে এ বছর বাংলাদেশে তুলনামূলক শুষ্ক মৌসুমি বৃষ্টি এবং একাধিক তাপপ্রবাহ দেখা দিতে পারে। 

আবহাওয়া অধিদপ্তরের মে থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, সারাদেশে স্বাভাবিকের তুলনায় বৃষ্টিপাত কিছুটা কম থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

পূর্বাভাসে আরও বলা হয়, বঙ্গোপসাগরে ৩ থেকে ৪টি লঘুচাপ সৃষ্টি হতে পারে। এর মধ্যে ১ থেকে ২টি নিম্নচাপ বা ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে। জুন মাসের প্রথমার্ধে সারা দেশে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু বিস্তার লাভ করতে পারে। এ সময়ে বিক্ষিপ্তভাবে শিলাবৃষ্টি ও বজ্রসহ ৮ থেকে ১০ দিন হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি হতে পারে। এর মধ্যে ২ থেকে ৩ দিন তীব্র কালবৈশাখী ঝড়সহ বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।

এ সময়ে দিন ও রাতের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি থাকতে পারে। এছাড়া ৫ থেকে ৭টি মৃদু তাপপ্রবাহ, ৩৬ থেকে ৩৭ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস; মাঝারি তাপপ্রবাহ, ৩৮ থেকে ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস; এবং ১ থেকে ২টি তীব্র তাপপ্রবাহ, ৪০ থেকে ৪১ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বয়ে যেতে পারে।

rain

সুপার এল নিনো কেবল বৃষ্টি কমায় না, এটি তাপমাত্রাও বৃদ্ধি করে। 

বিভিন্ন বিভাগে সম্ভাব্য বৃষ্টিপাত

ঢাকা: মে মাসে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত ২৬১ মিলিমিটার; পূর্বাভাস ২৫০ থেকে ২৭০ মিলিমিটার। জুনে স্বাভাবিক ৩৩৫ মিলিমিটার; পূর্বাভাস ৩৪০ থেকে ৩৬০ মিলিমিটার। জুলাইয়ে স্বাভাবিক ৩৭১ মিলিমিটার; পূর্বাভাস ৩৬০ থেকে ৩৮০ মিলিমিটার।

ময়মনসিংহ: মে মাসে স্বাভাবিক ৩৫০ মিলিমিটার; পূর্বাভাস ৩৪০ থেকে ৩৬০ মিলিমিটার। জুনে স্বাভাবিক ৪৪৭ মিলিমিটার; পূর্বাভাস ৪৪০ থেকে ৪৬০ মিলিমিটার। জুলাইয়ে স্বাভাবিক ৪৩৭ মিলিমিটার; পূর্বাভাস ৪২০ থেকে ৪৫০ মিলিমিটার।

চট্টগ্রাম: মে মাসে স্বাভাবিক ৩৪১ মিলিমিটার; পূর্বাভাস ৩৩০ থেকে ৩৫০ মিলিমিটার। জুনে স্বাভাবিক ৬১৩ মিলিমিটার; পূর্বাভাস ৬০০ থেকে ৬৩০ মিলিমিটার। জুলাইয়ে স্বাভাবিক ৬৯৪ মিলিমিটার; পূর্বাভাস ৬৮০ থেকে ৭০০ মিলিমিটার।

সিলেট: মে মাসে স্বাভাবিক ৫২৯ মিলিমিটার; পূর্বাভাস ৫২০ থেকে ৫৪০ মিলিমিটার। জুনে স্বাভাবিক ৬১৯ মিলিমিটার; পূর্বাভাস ৬২০ থেকে ৬৪০ মিলিমিটার। জুলাইয়ে স্বাভাবিক ৫৩৬ মিলিমিটার; পূর্বাভাস ৫৩০ থেকে ৫৫০ মিলিমিটার।

রাজশাহী: মে মাসে স্বাভাবিক ১৮৫ মিলিমিটার; পূর্বাভাস ১৭০ থেকে ১৯০ মিলিমিটার। জুনে স্বাভাবিক ২৮১ মিলিমিটার; পূর্বাভাস ২৭০ থেকে ৩০০ মিলিমিটার। জুলাইয়ে স্বাভাবিক ৩১১ মিলিমিটার; পূর্বাভাস ৩০০ থেকে ৩৩০ মিলিমিটার।

রংপুর: মে মাসে স্বাভাবিক ২৬৮ মিলিমিটার; পূর্বাভাস ২৬০ থেকে ২৮০ মিলিমিটার। জুনে স্বাভাবিক ৪১৮ মিলিমিটার; পূর্বাভাস ৪১০ থেকে ৪৩০ মিলিমিটার। জুলাইয়ে স্বাভাবিক ৪০৯ মিলিমিটার; পূর্বাভাস ৪০০ থেকে ৪২০ মিলিমিটার।

খুলনা: মে মাসে স্বাভাবিক ১৭৬ মিলিমিটার; পূর্বাভাস ১৬০ থেকে ১৮০ মিলিমিটার। জুনে স্বাভাবিক ২৯৬ মিলিমিটার; পূর্বাভাস ২৭০ থেকে ৩০০ মিলিমিটার। জুলাইয়ে স্বাভাবিক ৩৬২ মিলিমিটার; পূর্বাভাস ৩৫০ থেকে ৩৭০ মিলিমিটার।

বরিশাল: মে মাসে স্বাভাবিক ২৩৫ মিলিমিটার; পূর্বাভাস ২২০ থেকে ২৫০ মিলিমিটার। জুনে স্বাভাবিক ৪৬৫ মিলিমিটার; পূর্বাভাস ৪৫০ থেকে ৪৭০ মিলিমিটার। জুলাইয়ে স্বাভাবিক ৫৩৫ মিলিমিটার; পূর্বাভাস ৫২০ থেকে ৫৫০ মিলিমিটার।

এবার বর্ষায় সামগ্রিকভাবে বৃষ্টিপাত কম হওয়ার কারণ জানতে চাইলে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, এল নিনোর প্রভাবে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

এল নিনো হলো প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যাঞ্চল ও পূর্ব উপকূলীয় এলাকার সমুদ্রপৃষ্ঠের পানির অস্বাভাবিক উষ্ণতা বৃদ্ধি, যা বিশ্বব্যাপী আবহাওয়ার ধরণ বদলে দেয়। এটি একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু প্যাটার্ন, যা প্রতি ২ থেকে ৭ বছর পরপর দেখা যায় এবং ১২ থেকে ১৮ মাস পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। এর প্রভাবে সাধারণত দক্ষিণ আমেরিকা ও আশপাশের অঞ্চলে বেশি বৃষ্টিপাত ও বন্যা হয়, অন্যদিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ভারত ও অস্ট্রেলিয়ায় খরা পরিস্থিতি তৈরি হয়।

rain
২০২৪ সালের মার্চে ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের কারণে পটুয়াখালীতে চাষের জমিতে ফাটল দেখা দেয়।

বর্ষায় বৃষ্টিপাত কম হওয়ার কারণ জানতে চাইলে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদ জানান, জুন থেকে ধীরে ধীরে আবহাওয়া এল নিনোর দিকে যাবে। স্বাভাবিকভাবে এল নিনো সক্রিয় হতে কিছুটা সময় লাগে। ফলে এটি সক্রিয় হলে আমাদের অঞ্চলে বৃষ্টিপাত কমে যায়।

তিনি আরও বলেন, আমাদের মৌসুমি ধরণেও পরিবর্তন এসেছে। আগে জুন মাসে যেভাবে বৃষ্টি হতো, ইদানীং বর্ষার শুরুতে সে তুলনায় বৃষ্টিপাত কম হচ্ছে। গত কয়েক বছরেও এমন প্রবণতা দেখা গেছে। আগে বর্ষার শুরুতে টানা তিন থেকে চার দিন বৃষ্টি হতো, এখন তা আর হয় না। বরং বর্ষাকালের শেষের দিকে বৃষ্টিপাত তুলনামূলক বেশি হয়।

তিনি বলেন, এ বছর এল নিনোর প্রভাব থাকার ইঙ্গিত রয়েছে। পাশাপাশি বৃষ্টিপাতের পরিমাণ নির্ণয়ে ব্যবহৃত বিভিন্ন মডেলেও দেখা যাচ্ছে, বর্ষার শুরুতে জুন ও জুলাই মাসে বৃষ্টিপাত কম হতে পারে।

এই আবহাওয়াবিদ আরও বলেন, মৌসুমের শেষের দিকে কিছুটা বৃষ্টি বাড়লেও এল নিনোর কারণে তা কতটা বাড়বে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। তবে সামগ্রিকভাবে এবারের বর্ষায় বৃষ্টিপাত কম হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

এমএইচএইচ/এআর