২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৪৯ পিএম
বৃক্ষরোপণকে শুধু গাছ লাগানোর কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রতিটি গাছের জন্য ডিজিটাল পরিচয়, তথ্য সংরক্ষণ ও দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণের আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে আই হ্যাভ এ প্লান ফাউন্ডেশন। এ লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানটি তৈরি করছে প্রযুক্তিনির্ভর প্ল্যাটফর্ম ‘মাই ট্রি অ্যাপ’।
উদ্যোক্তাদের দাবি, মাই ট্রি অ্যাপের মাধ্যমে একটি গাছ রোপণের সময় তার প্রজাতি, রোপণের তারিখ, রোপণকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের তথ্য, অবস্থান, ছবি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ করা যাবে। প্রতিটি গাছের জন্য কিউআর কোড ভিত্তিক একটি ডিজিটাল ট্রি আইডি তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে।
পরবর্তীতে গাছটির পরিচর্যা, বৃদ্ধি, অবস্থান এবং বেঁচে থাকার অবস্থাসহ বিভিন্ন তথ্য যুক্ত করার সুযোগ থাকবে। এর ফলে একটি গাছ শুধু রোপণের সংখ্যা হিসেবে নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ট্রি রেকর্ড হিসেবে সংরক্ষিত হতে পারে।
তৈরি হতে পারে ন্যাশনাল ট্রি ডাটাবেইজ: মাই ট্রি এর অন্যতম দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় রোপণ করা গাছের তথ্য নিয়ে একটি সমন্বিত ন্যাশনাল ট্রি ডাটাবেজের ভিত্তি তৈরি করা।
উদ্যোক্তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন, এনজিও এবং সাধারণ নাগরিকদের মাধ্যমে রোপণ করা গাছের তথ্য একটি কাঠামোবদ্ধ ডিজিটাল ব্যবস্থায় সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। এতে কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় কতটি গাছ লাগানো হয়েছে, কোন প্রজাতির গাছ রোপণ করা হয়েছে, কারা বা কোন প্রতিষ্ঠান রোপণ করেছে এবং গাছগুলোর বর্তমান অবস্থা কী—এসব তথ্য ভবিষ্যতে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে।
২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে প্রযুক্তির সম্ভাবনা: বাংলাদেশ সরকার পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের জাতীয় কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এ ধরনের বৃহৎ কর্মসূচিতে শুধু গাছ লাগানোর সংখ্যা গণনা নয়, বরং রোপিত গাছের অবস্থান, তথ্য সংরক্ষণ, পর্যবেক্ষণ ও টিকে থাকার হার নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মনিটরিংয়ে জিআইএস, রিমোট সেনসিং, ন্যাশনাল ট্রি ডাটাবেইজ এবং ড্রোন টেকনোলজি ব্যবহারের বিষয়টি রয়েছে। একই সঙ্গে জিআইএস ও রিমোট সেনসিং সমন্বিত ওয়েব ম্যাপ বেজড ড্যাশবোর্ড ও অ্যাপ তৈরিতে সক্ষম প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশীদারিত্বের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে মাই ট্রি অ্যাপ-এর ধারণাকে ট্রি রেজিস্ট্রেশন, ভ্যারিফিকেশন, ম্যাপিং, মনিটরিং, রিপোর্টিংয়ের সমন্বিত একটি ডিজিটাল কাঠামো হিসেবে তুলে ধরছেন উদ্যোক্তারা।
এআই, জিআইএস ও স্যাটেলাইট প্রযুক্তির ব্যবহার মাই ট্রি অ্যাপে আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে এআই বেজড ট্রি ভ্যারিফিকেশন, কিউআর বেজড ডিজিটাল ট্রি আইডি, জিপিএস ও জিআইএস ম্যাপিং, স্যাটেলাইট ও এনডিভিআই মনিটরিং, ড্রোন বেজড মনিটরিং এবং ট্রি সার্ভাইবাল ট্রাকিং।
এ ছাড়া ডিজিটাল ট্রি সার্টিফিকেট, কার্বন ডাটা ও কার্বন ক্রেডিট সাপোর্ট, ড্যাশবোর্ড ও ডাটা অ্যানালাইটিস, লিডারবোর্ড ও জ্যামিফিকেশন এবং সিটিজেন পার্টিসিপ্যাশনের মতো ফিচার যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
উদ্যোক্তাদের মতে, এসব প্রযুক্তির সমন্বয়ের মাধ্যমে একটি গাছ রোপণের পর সেটিকে দীর্ঘমেয়াদে পর্যবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা সম্ভব হতে পারে।
‘একটি গাছ, একটি ডিজিটাল আইডেন্টিটি’
মাই ট্রির মূল ধারণা হলো—‘একটি গাছ, একটি ডিজিটাল আইডেন্টিটি: প্রতিটি রোপণ, একটি যাচাইযোগ্য ডিজিটাল রেকর্ড।’
অর্থাৎ শুধু কতটি গাছ লাগানো হয়েছে, সেই হিসাবের পরিবর্তে কোথায় কোন প্রজাতির গাছ লাগানো হয়েছে, কে বা কোন প্রতিষ্ঠান গাছটি লাগিয়েছে, কখন লাগানো হয়েছে, গাছটি বর্তমানে টিকে আছে কি না এবং সময়ের সঙ্গে এর কী পরিবর্তন হচ্ছে—এসব তথ্য একটি সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থায় সংরক্ষণের লক্ষ্য রয়েছে।
জাতীয় পর্যায়ে এমন একটি প্ল্যাটফর্ম কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বৃক্ষরোপণ কার্যক্রমে তথ্যের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে রোপিত গাছের সার্ভাইবাল মনিটরিং, অঞ্চল ও প্রজাতিভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ এবং ভবিষ্যৎ বৃক্ষরোপণ পরিকল্পনায় ডেটা ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
শিক্ষার্থী, নাগরিক, প্রতিষ্ঠান, এনজিও ও সামাজিক সংগঠনকে বৃক্ষরোপণ এবং পরবর্তী পর্যবেক্ষণ কার্যক্রমে যুক্ত করারও সুযোগ রয়েছে।
উদ্যোক্তাদের লক্ষ্য, বৃক্ষরোপণকে এককালীন কর্মসূচি হিসেবে না দেখে একটি দীর্ঘমেয়াদি ডিজিটাল ট্রি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম-এর আওতায় নিয়ে আসা। যেখানে প্রতিটি গাছের থাকবে আলাদা পরিচয়, প্রতিটি রোপণের থাকবে ডিজিটাল রেকর্ড এবং ভবিষ্যতে তৈরি হতে পারে বাংলাদেশের বৃক্ষসম্পদের একটি সমন্বিত ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডার।
এসএইচ/এমআই