তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিবেদক
১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:০৮ এএম
গত কিছুদিন ধরে দেখা যাচ্ছে, কিছু দোকানদার কোনো পণ্য বা সেবা বিক্রি না করেই বাংলা কিউআর ব্যবহার করে নিয়মবহির্ভূতভাবে গ্রাহকের কাছ থেকে মার্চেন্ট পেমেন্ট নিচ্ছেন। মূলত গ্রাহকেরা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) এজেন্ট পয়েন্ট থেকে ক্যাশ আউট করতে এলেও, দোকানিরা তাদের বিভ্রান্ত করে এজেন্ট অ্যাকাউন্ট দিয়ে ক্যাশ আউট না করিয়ে বাংলা কিউআর দিয়ে মার্চেন্ট পেমেন্ট করাচ্ছেন। এখানে দোকানদারের লক্ষ্য একটিই- অবৈধভাবে ক্যাশ আউট করিয়ে অতিরিক্ত অর্থ আয়, যদিও নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী এ ধরনের লেনদেন সম্পূর্ণ অবৈধ।
সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী তথা এজেন্ট বা মার্চেন্ট অধিক লাভের আশায় সচেতনভাবে অবৈধ লেনদেনে জড়ালেও, বহু গ্রাহক নিজের অজান্তেই এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়ে ‘মানি লন্ডারিং’-এর ঝুঁকিতে পড়ছেন। এই ধরনের ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে বেশ বৃদ্ধি পেয়েছে, বিশেষ করে দেশজুড়ে এমএফএস এজেন্ট পয়েন্টগুলোয় বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বাংলা কিউআর কোড বসানোর পর থেকে।
গ্রাহককে বিভ্রান্ত করে বাংলা কিউআর দিয়ে ক্যাশ আউট করানো ঘটনার পাশাপাশি দেশে কিছু অসাধু চক্রও গড়ে উঠেছে, যারা বাংলা কিউআর ব্যবস্থার অপব্যবহার করে অবৈধ ক্যাশ আউটের ব্যবসা করছে।
যেভাবে ঘটছে অবৈধ ক্যাশ আউট
সম্প্রতি এমন ঘটনা নজরে এসেছে বেশ কিছু এমএফএস অ্যাকাউন্টে। এমন একটি ব্যক্তিগত এমএফএস অ্যাকাউন্ট মোসাম্মৎ লাল বানু নামক এক নারীর নামে। এই এমএফএস অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে মাত্র দুই দিনে (১৬-১৭ আগস্ট) ৭টি লেনদেনে চার প্রতিষ্ঠানের চার বাংলা কিউআর-এ প্রায় ৩৫ লাখ টাকা পেমেন্ট করা হয়েছে। বাংলা কিউআর বসানো এই প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থান তিন জেলায়-বরিশাল, ব্রাক্ষণবাড়িয়া এবং হবিগঞ্জ। আর পেমেন্টগুলো করা হয়েছে দুটি ব্যাংকের বসানো কিউআর-এ।

ওই অ্যাকাউন্টটির স্টেটমেন্ট পর্যালোচনা দেখা যায়-এই অ্যাকাউন্ট থেকে সাম্প্রতিক লেনদেনগুলোর আগে এত বড় অংকের লেনদেন বিশেষ করে পেমেন্ট লক্ষ্য করা যায়নি। এদিকে, পেমেন্টগুলো যেসব মার্চেন্টের বাংলা কিউআর-এর মাধ্যমে হয়েছে, সেই মার্চেন্টে এ ধরণের আরও বেশকিছু লেনদেন পরিলক্ষিত হয়েছে।
কিউআর কোড স্ক্যান করে কোনো পণ্য বা সেবার পেমেন্টে গ্রাহকের কোনো খরচ নেই, কিন্তু ওই এমএফএস এজেন্ট যেহেতু এই অর্থ ক্যাশ আউটের লক্ষ্যে গ্রহণ করেছেন, তাই গ্রাহকের কাছ থেকে তিনি ক্যাশ আউট খরচও কেটে রেখেছেন। এখানে সংশ্লিষ্ট মার্চেন্ট ৩টি অপরাধ করেছেন- এক, কোনো পণ্য বা সেবা বিক্রি না করেও পেমেন্ট গ্রহণ করা; দুই, পেমেন্টে চার্জ না থাকলেও গ্রাহকের কাছ থেকে ক্যাশ আউট চার্জ আদায় করা; এবং তিন, ক্যাশ আউটের উপর সরকার নির্ধারিত ১৫% ভ্যাট-ট্যাক্স ফাঁকি।
যে কারণে তৈরি হয়েছে এই সংকট
যাচাই বাছাই না করেই মার্চেন্ট কিউআর স্থাপন: অবৈধ ক্যাশ আউট ঠেকাতে একই দোকানে এজেন্ট এবং মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট দেওয়া থেকে এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলো এতদিন বিরত থাকলেও, বাংলা কিউআর চালু হওয়ার পর বিভিন্ন ব্যাংক যাচাই-বাছাই ছাড়াই এজেন্ট পয়েন্টগুলোতে বাংলা কিউআর স্থাপন করেছে, যা অপব্যবহারের সুযোগ নিচ্ছে কিছু অসাধু চক্র ও ব্যবসায়ী।
ইন্টারচেঞ্জ রিইম্বার্সমেন্ট ফি বা আইআরএফ উঠিয়ে নেয়া ঘোষণা: ইন্টারচেঞ্জ রিইম্বার্সমেন্ট ফি (আইআরএফ) হলো এক ধরণের আন্তঃব্যাংক চার্জ বা সার্ভিস ফি, যা নগদ অর্থকে ডিজিটাল অর্থে রূপান্তরের খরচ। আইআরএফ মূলত বাংলা কিউআর অ্যাকোয়ারার এবং পেমেন্ট ইস্যুয়ার প্রতিষ্ঠানের মাঝে ভাগ হয়ে থাকে। অ্যাকোয়ারার বলতে বোঝায় মার্চেন্ট পয়েন্টে যে প্রতিষ্ঠান বাংলা কিউআর বসিয়েছে, আর ইস্যুয়ার হচ্ছে যে প্রতিষ্ঠানের অ্যাপ থেকে বাংলা কিউআর-এ পেমেন্ট হচ্ছে। এতদিন আইআরএফ বলবৎ থাকলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক সম্প্রতি এক নির্দেশনায় আগামী অক্টোবর ১ তারিখে আইআরএফ শূন্য করার ঘোষণা দিয়েছে। তাই আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে কোনো চার্জ না থাকায় মার্চেন্টরা বাংলা কিউআরের মাধ্যমে ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণে আগ্রহী হয়ে উঠবেন, কিন্তু বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ফি না থাকার এই সুবিধাটি অপব্যবহার করতে পারে অসাধু চক্রগুলো। কেননা, আইআরএফ থাকা অবস্থাতেই বাংলা কিউআর-এর অপব্যবহার লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

এমএফএস এজেন্ট থেকে ক্যাশ আউটে যেহেতু চার্জ আছে, তাই অসাধু চক্রগুলো আইআরএফ উঠে গেলে বাংলা কিউআর ব্যবস্থার অপব্যবহার করে আরও বেশি অবৈধ ক্যাশ আউট করতে পারে। ফলে, একদিকে যেমন ক্যাশলেস লেনদেনের ভুয়া রেকর্ড তৈরি হবে, অন্যদিকে সেবা দিয়েও চার্জ না পাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাংলা কিউআর অ্যাকোয়ারার এবং ইস্যুয়ার প্রতিষ্ঠানসহ সামগ্রিক ডিজিটাল লেনদেনের ইকোসিস্টেম।
তৈরি হতে পারে আইনি সংকট
এখন দেখা যাক এই ধরনের লেনদেনে কি ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে- প্রথমত, কোনো পণ্য বা সেবা না কিনেই বাংলা কিউআর কোড ব্যবহার করে পেমেন্ট দেওয়ায় আইন অনুযায়ী এটি ‘মানি লন্ডারিং বা অর্থ পাচার’ হিসেবে পরিগণিত হবে। যার দায় পড়তে পারে- বাংলা কিউআর কোড বসানো কোম্পানি (অ্যাকোয়ারার), এজেন্ট বা মার্চেন্ট এবং গ্রাহক – তিন পক্ষের উপরেই।
দ্বিতীয়ত, অবৈধ লেনদেনে জড়িয়ে পড়ায় সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীর এজেন্ট ও মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট স্থগিত বা বাতিল হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
তৃতীয়ত, এই মার্চেন্ট বা এজেন্ট জড়িয়ে পড়তে পারেন জুয়া, হুন্ডি, অনলাইন প্রতারণা-জালিয়াতি করা অসাধু চক্রের সঙ্গে, যা তাদের জন্য তৈরি করবে আরও কঠোর আইনি জটিলতা।
আরও পড়ুন: বাংলা কিউআর ব্যবহারে গ্রাহকের খরচ কি বাড়তে পারে?
বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক গত ১০ আগস্ট দেয়া এক নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কোনো মার্চেন্টের অস্বাভাবিক সংখ্যক বা অস্বাভাবিক ধরনের লেনদেন পরিলক্ষিত হলে সংশ্লিষ্ট একুয়ারিং প্রতিষ্ঠানকে যথাযথভাবে তা পর্যবেক্ষণ, যাচাই ও পর্যালোচনা করতে হবে এবং কৃত্রিমভাবে লেনদেন বিভাজন, ক্যাশ আউট বা অন্য কোনো ধরনের অপব্যবহার প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আর এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিশোধ ও নিষ্পত্তি ব্যবস্থা আইন, ২০২৪ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
এর আগে, এই বছরের ০১ এপ্রিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পেমেন্ট সার্ভিসেস ডিপার্টমেন্ট (পিএসডি) এক নির্দেশনায় জানায়- বাংলা কিউআর মার্চেন্ট পয়েন্টে পেমেন্ট ব্যতীত কোনরূপ ক্যাশ আউট কার্যক্রম পরিলক্ষিত হলে সংশ্লিষ্ট মার্চেন্টের বাংলা কিউআর বাতিল করতে হবে।
মার্চেন্ট অ্যাকাউন্টের অপব্যবহার করে অবৈধ লেনদেন এবং আইনি সংকট যাতে তৈরি না হয়, সে জন্য এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলো গত ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে একই দোকানে এজেন্ট এবং মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট দেয়া থেকে বিরত ছিলো। কিন্তু, বাংলা কিউআর ব্যবস্থা চালুর পর ‘এমএফএস এজেন্ট’-এর ব্যবসায়িক মডেল বিবেচনায় না নিয়েই কিছু প্রতিষ্ঠান বাছবিচার না করেই বহু এজেন্ট পয়েন্টে বাংলা কিউআর স্থাপন করেছে। এটি দেশের ক্যাশলেস লেনদেন ব্যবস্থার উন্নয়ন না ঘটিয়ে বরং বিভিন্ন অবৈধ লেনদেন বাড়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।
এজেড