আব্দুল হাকিম
১৪ মে ২০২৬, ১০:১৪ পিএম
রাজশাহী কলেজের মার্কেটিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী জেডআই ফেরদৌস ইবতিদা দুর্বল মোবাইল নেটওয়ার্কের কারণে হরহামেশাই ভোগান্তিতে পড়েন। কখনো জরুরি ফাইল পাঠাতে গিয়ে বারবার সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়, কখনো ভিডিও কনটেন্ট দেখতে গিয়ে বাফারিংয়ে আটকে থাকতে হয়। বিশেষ করে শহরের বাইরে গেলে ইন্টারনেটের গতি আরও কমে যায়। ইবতিদা বলেন, বর্তমানে প্রায় সব ধরনের কাজেই ইন্টারনেট প্রয়োজন হয়। কিন্তু এখনো অনেক এলাকায় স্থিতিশীল নেটওয়ার্ক না থাকায় সাধারণ ব্যবহারকারীরা সমস্যায় পড়ছেন।
এই শিক্ষার্থী বলেন, আমরা এখন প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে আছি। কিন্তু দেশের অনেক জায়গায় এখনো নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট সেবা পাওয়া যায় না। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের জন্য এটা বড় সমস্যা। বর্তমানে পড়াশোনা থেকে শুরু করে চাকরির আবেদন, সবকিছুতেই ইন্টারনেটের প্রয়োজন হয়। কিন্তু এখনো অনেক এলাকায় স্থিতিশীল নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না। বিশেষ করে শহরের বাইরে গেলে সমস্যাটা আরও বেশি বোঝা যায়।
শুধু ইবতিদা নয়; তার মতো এমন অভিজ্ঞতা দেশের হাজারো শিক্ষার্থী, ভ্রমণকারী ও সাধারণ মোবাইল ব্যবহারকারীর। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে রাষ্ট্রায়ত্ত মোবাইল অপারেটর টেলিটক বাংলাদেশ লিমিটেড দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, মহাসড়ক ও দুর্গম পর্যটন এলাকায় ফোরজি নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে তিনটি পৃথক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব করেছে। প্রকল্পগুলোর মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৪০০ কোটি টাকা।
প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলোর লক্ষ্য হলো নির্দিষ্ট এলাকাগুলোতে মোবাইল ভয়েস ও ডাটা সেবার মান উন্নয়ন এবং নেটওয়ার্ক কাভারেজ বৃদ্ধি করা। তবে এই উদ্যোগ এখন পরিকল্পনা কমিশনের কঠোর পর্যালোচনার মুখে পড়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, যখন সারাদেশে ফাইভজি নেটওয়ার্ক বাস্তবায়নের একটি বড় প্রকল্প চলমান রয়েছে, তখন আলাদা করে ফোরজি সম্প্রসারণ কতটা যৌক্তিক, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
আরও পড়ুন: কমছে মোবাইল সেবায় সারচার্জ ও সিম কর
পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, ২০২১ সাল থেকে সারাদেশে ফাইভজি নেটওয়ার্ক চালুর জন্য প্রায় ২ হাজার ২৩৮ কোটি টাকার একটি বড় প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন। এই প্রকল্পের লক্ষ্য হলো দেশের টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোকে আধুনিকায়ন করে উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করা। এমন অবস্থায় আলাদা আলাদা ছোট প্রকল্পের মাধ্যমে ফোরজি সম্প্রসারণকে অনেক কর্মকর্তা সমন্বয়হীন উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন।
পরিকল্পনা কমিশনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, একাধিক খণ্ডিত প্রকল্প গ্রহণ করলে সেটি সামগ্রিক পরিকল্পনার সঙ্গে অসামঞ্জস্য তৈরি করতে পারে। তার মতে, সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের নীতিমালায় স্পষ্টভাবে বলা আছে, একই উদ্দেশ্য ও একই প্রকৃতির কাজের জন্য একাধিক ছোট প্রকল্প না নিয়ে একটি সমন্বিত প্রকল্প গ্রহণ করা উচিত।
ওই কর্মকর্তা বলেন, ২০২২ সালের নির্দেশিকায় উন্নয়ন প্রকল্পের কাঠামোকে আরও সুশৃঙ্খল করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যাতে ব্যয়, সময় এবং বাস্তবায়ন ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা থাকে। কিন্তু টেলিটকের বর্তমান প্রস্তাবগুলো সেই কাঠামোর সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
পরিকল্পনা বিভাগের ইসনেক, নেক ও সমন্বয় শাখার কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন, কিছু প্রকল্প ইচ্ছাকৃতভাবে ছোট আকারে ভাগ করা হয়েছে, যাতে অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ হয় এবং বৃহৎ পরিসরের যাচাই-বাছাই এড়ানো যায়। ৫০ কোটি টাকার নিচের প্রকল্পের ক্ষেত্রে সাধারণত পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা বাধ্যতামূলক নয়, ফলে তুলনামূলকভাবে দ্রুত অনুমোদনের সুযোগ তৈরি হয়। প্রতিটি প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৪৫৬ কোটি থেকে ৪৭৭ কোটি টাকার মধ্যে। মোট অর্থায়নের প্রায় ৬০ শতাংশ আসবে সরকারি ঋণ থেকে, বাকি অংশ ইকুইটি বা নিজস্ব বিনিয়োগ হিসেবে ধরা হয়েছে।
তারা বলছেন, প্রকল্পগুলোর আর্থিক বিশ্লেষণে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি রয়েছে। আগের সরকারি বিনিয়োগের তুলনায় সম্ভাব্য আয়ের হিসাব, সেবা সম্প্রসারণের বাস্তব চাহিদা এবং বিনিয়োগ ফেরতের সময়সীমা সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য নেই। ফলে প্রকল্পগুলোর অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এছাড়া প্রকল্প নথিতে কিছু যন্ত্রপাতির দাম তুলনামূলকভাবে বেশি দেখানো হয়েছে। একই ধরনের প্রকল্পে আন্তর্জাতিক বাজারে যে খরচ দেখা যায়, তার তুলনায় এখানে কিছু ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক ব্যয় উল্লেখ করা হয়েছে বলে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে ধরা পড়েছে।
আরও পড়ুন: মটোরোলার এই প্রিমিয়াম স্মার্টফোনে ছাড় পাবেন ২২ হাজার
টেলিকম বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সময়ে যখন দেশ ফাইভজি যুগে প্রবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন আলাদা করে ফোরজি অবকাঠামোতে বড় বিনিয়োগ করা দীর্ঘমেয়াদে পুনরাবৃত্ত ব্যয়ের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কারণ ফাইভজি নেটওয়ার্ক সাধারণত ফোরজি অবকাঠামোর ওপর ভিত্তি করে উন্নত হয়, ফলে সঠিক পরিকল্পনা না থাকলে দ্বৈত বিনিয়োগের সম্ভাবনা থাকে।
অন্যদিকে টেলিটক কর্মকর্তারা এই সমালোচনার জবাবে বলছেন, ফোরজি এখনো দেশের অনেক অঞ্চলে পর্যাপ্তভাবে পৌঁছায়নি। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, মহাসড়ক এবং দুর্গম এলাকায় নেটওয়ার্ক কাভারেজ দুর্বল। তাই ফাইভজি পুরোপুরি বাস্তবায়নের আগেই ফোরজি শক্তিশালী করা জরুরি।
টেলিটকের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন বিভাগের মহাব্যবস্থাপক ডি. এম. নুরুল হুদা বলেন, তিনটি প্রকল্পের লক্ষ্য আলাদা হলেও উদ্দেশ্য একটাই, সেবা সম্প্রসারণ। তার মতে, মহাসড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং পর্যটন এলাকা তিনটি আলাদা ধরনের ব্যবহারকারীর চাহিদা তৈরি করে, তাই প্রযুক্তিগত দিক থেকেও ভিন্ন নকশা প্রয়োজন।
তিনি আরও জানান, যদিও প্রকল্পগুলো বর্তমানে ফোরজি সেবাকেন্দ্রিক, তবে পুরো অবকাঠামো এমনভাবে তৈরি করা হচ্ছে যাতে ভবিষ্যতে সহজেই ফাইভজি আপগ্রেড করা যায়। এতে আলাদা করে বড় বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে না।
আরও পড়ুন: গুগল আনলো নতুন এআই ল্যাপটপ ‘গুগলবুক’
ভৌত অবকাঠামো বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কবির আহমেদ ঢাকা মেইলকে বলেন, প্রকল্পগুলোর যৌক্তিকতা এবং নীতিগত সামঞ্জস্য অবশ্যই যাচাই করা হবে। তবে তিনি স্বীকার করেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে টেলিটকের সেবা সম্প্রসারণ এখনো প্রয়োজনীয়। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে সবকিছু একসাথে বড় প্রকল্পের মাধ্যমে করা সম্ভব না-ও হতে পারে। তাই বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে ধাপে ধাপে উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া হয়।
প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে একটি মহাসড়কভিত্তিক নেটওয়ার্ক উন্নয়ন প্রকল্প। এতে ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-ময়মনসিংহ এবং ঢাকা-পটুয়াখালী রুটে মোট ৭০টি বেস স্টেশন স্থাপন করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে দীর্ঘ দূরত্বের যোগাযোগ পথগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন মোবাইল ও ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করা হবে।
দ্বিতীয় প্রকল্পটি স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ব্যবহার করে দুর্গম ও পর্যটন এলাকায় সেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েছে। এই প্রকল্পে সাতটি বিভাগে প্রায় ১০০টি বেস স্টেশন স্থাপন করা হবে, যেখানে ফাইবার অপটিক সংযোগ স্থাপন কঠিন। ফলে স্যাটেলাইট ব্যাকহল প্রযুক্তি ব্যবহার করে নেটওয়ার্ক পরিচালনা করা হবে।
তৃতীয় প্রকল্পটি শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতকে কেন্দ্র করে। বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ এলাকায় ৯৫টি বেস স্টেশন স্থাপনের মাধ্যমে উচ্চগতির ও স্থিতিশীল নেটওয়ার্ক সেবা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে পরিকল্পনা কমিশনের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, তিনটি প্রকল্পের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। একই ধরনের প্রযুক্তিগত লক্ষ্য থাকা সত্ত্বেও আলাদা আলাদা প্রকল্প গ্রহণ ভবিষ্যতে ব্যবস্থাপনায় জটিলতা তৈরি করতে পারে।
এছাড়া জাতীয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি নীতিমালার সঙ্গে প্রকল্পগুলোর সামঞ্জস্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের দীর্ঘমেয়াদি ডিজিটাল রূপান্তর কৌশলের সঙ্গে সমন্বয় না থাকলে এসব প্রকল্প কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে ব্যর্থ হতে পারে।
আরও পড়ুন: শক্তিশালী ক্যামেরায় নতুন ডিজাইনে সনির ফ্ল্যাগশিপ স্মার্টফোন বাজারে
টেলিটকের ফোরজি সম্প্রসারণ উদ্যোগ এখন কেবল একটি প্রযুক্তিগত প্রকল্প নয়, বরং এটি নীতিগত, অর্থনৈতিক এবং কৌশলগত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের ভবিষ্যৎ দিক।
প্রকল্পের বিষয়ে জানতে চাইলে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের পরিকল্পনা অনুবিভাগের যুগ্মসচিব মো. সফিউল আলম ঢাকা মেইলকে বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বিদ্যমান নেটওয়ার্কব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও নিরবচ্ছিন্ন করতেই এ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে ক্যাম্পাসজুড়ে উন্নত নেটওয়ার্ক সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে শিক্ষার্থীরা উপকৃত হবেন বলে আশা করা হচ্ছে। প্রকল্পটি নিয়ে পরিকল্পনা কমিশন কিছু পর্যবেক্ষণ দিয়েছে। সেসব বিষয় সমন্বয় ও সমাধানের কাজ চলছে। অনুমোদন পাওয়া গেলে পরবর্তী কার্যক্রম শুরু করা হবে।
সফিউল আলম বলেন, নেটওয়ার্ক অবকাঠামো অনেক ক্ষেত্রে পরবর্তী সময়ে আপগ্রেড বা রূপান্তর করা সম্ভব। এজন্য কিছু অতিরিক্ত প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম ও সমন্বয়ের প্রয়োজন হয়। ভবিষ্যতে চাহিদা অনুযায়ী এ অবকাঠামো ফাইভজি প্রযুক্তিতেও রূপান্তর করা যেতে পারে।
এএইচ/জেবি