জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
২২ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০৩:০৯ পিএম
সম্প্রসারণ করা হচ্ছে অপটিক্যাল ফাইবার ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক। ফাইভ-জির উপযোগী করা হচ্ছে এই নেটওয়ার্ক। এজন্য ‘ফাইভ-জির উপযোগীকরণে বিটিসিএলের অপটিক্যাল ফাইবার ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক উন্নয়ন’ শীর্ষক একটি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৫৯ কোটি ১০ লাখ টাকা, যার পুরোটাই সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়ন করা হবে।
মঙ্গলবার (২২ ফেব্রুয়ারি) প্রধানমন্ত্রী এবং একনেক চেয়ারপারসন শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে একনেকের বৈঠকে প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়। এটি ছাড়াও একনেকের বৈঠকে অনুমোদন দেওয়া হয় আরও নয়টি প্রকল্প।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল)। উচ্চগতির এ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা গেলে রাষ্ট্রায়ত্ত এ কোম্পানির কাছ থেকে অপটিক্যাল ফাইবার ব্যবহারের জন্য সেবা নেবে মোবাইল ফোন অপারেটর এবং ইন্টারনেট সার্ভিস প্রভাইডার (আইএসপি) কোম্পানিগুলো।
এই প্রকল্পের মাধ্যমে উপজেলা পর্যায়ে ইন্টারনেটের গতি অন্তত ১০০ জিবিপিএসে নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। কেননা, প্রকল্পের মাধ্যমে সরকার তিন হাজার কিলোমিটারের বেশি অপটিক্যাল ফাইবার স্থাপন করবে। উপজেলার পাশাপাশি জেলা পর্যায়েও ইন্টারনেটের গতি ৩০০ জিবিপিএসে (গিগাবাইট পার সেকেন্ড) উন্নীত করার আশাবাদী বিটিসিএল। ইউনিয়ন পর্যায়েও অপটিক্যাল ফাইবার লাইনের উন্নয়ন এবং সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির সক্ষমতা বাড়ানো হবে।
প্রকল্প অনুমোদনের পর সাংবাদিকদের সামনে ব্রিফিংয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়ে বলেছেন- ফাইজ জি সেবা চালু করুন পাশাপাশি ফোর জি সেবা শক্তিশালী করুন।
বাস্তবায়নকারী কোম্পানি বিটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. রফিকুল মতিন এর আগে গণমাধ্যমকে জানান, দেশে বর্তমানে ৩৪ হাজার ১০০ কিলোমিটার ভূগর্ভস্থ্য অপটিক্যাল ফাইবার লাইন টানা আছে। এরমধ্যে প্রকল্পটির মাধ্যমে মাত্র তিন হাজার কিলোমিটার লুপ লাইন টেনে বিকল্প অপটিক্যাল ফাইবার স্থাপন করা হবে। এতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে উচ্চগতির ইন্টারেনেট সংযোগের ব্যবস্থা করা যাবে।
রফিকুল মতিন আরও জানিয়েছেন, বর্তমানে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে যে অপটিক্যাল ফাইবার রয়েছে তা দিয়ে মাত্র ৩০ থেকে ৪০ জিবিপিএস গতির ইন্টারনেট দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু ফাইভ-জির জন্য ইন্টারনেটের গতি অন্তত ১০০ থেকে ২০০ জিবিপিএস হতে হয়। এ গতির ইন্টারনেট দিয়ে নতুন প্রজন্মের নেটওয়ার্কের সুবিধা প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষ পাবেন না। তাই ফাইভ-জি চালুর সুফল ভোগের সুযোগ সৃষ্টি করতে অপটিক্যাল ফাইবার সঞ্চালন লাইন ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির শক্তি বাড়িয়ে সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
বিটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনে করেন, প্রস্তাবিত প্রকল্পের মাধ্যমে ‘রিং প্রযুক্তির’মাধ্যমে বিকল্প একটি লাইন টেনে বিকল্প ব্যবস্থা করা হবে। এতে একটি ফাইবারের কোনও সমস্যা হলে আরেকটি দিয়ে যেন ব্যাকআপ দেওয়া যায়।
পরিকল্পনা কমিশনের তথ্যে জানা গেছে, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ থেকে প্রস্তাব পাওয়ার পর গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হয় পিইসি (প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি) সভা। ওই সভায় দেওয়া সুপারিশগুলো প্রতিপালন করায় প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে উপস্থাপন করা হয়।
প্রকল্প প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, জাতিসংঘ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন ও বিশ্বব্যাপী তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির যে বিপ্লব ও উন্নয়ন সংঘটিত হয়েছে, সেই উন্নয়নের ধারায় সামিল হতে ডিজিটাল প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত দেশে রূপান্তরে নিজেদের জন্য জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির বিকল্প নেই। বাংলাদেশকে আর্থ-সামাজিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব বাস্তবায়ন করতে হবে।
বিশ্বব্যাংকের একটি সমীক্ষা থেকে জানা গেছে, তথ্য প্রবাহে প্রতিযোগিতার কারণে ব্রডব্যান্ড যোগাযোগ মাধ্যম আইসিটিভিত্তিক আর্থ-সামাজিক প্রবৃদ্ধিতে একটি প্রধান অনুঘটকের ভুমিকা পালন করে। শ্রমভিত্তিক অর্থনীতি থেকে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তরকে উৎসাহিত করতে বাংলাদেশ এরই মধ্যে অনেক উৎসাহমূলক প্যাকেজ যেমন নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন, ডিজাইন, উদ্যোক্তা একাডেমি ইনোভেশন, ডিজাইন অ্যান্ড এন্ট্রাপ্রিনিউরশিপ একাডেমি (আইডিইএ), হাইটেক পার্ক, সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক, বিজনেস ইনকিউবেটর এবং ফ্রিল্যান্সারদের আইডি দেওয়ার মতো বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। তবে, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে ব্রডব্যান্ড যোগাযোগ মাধ্যমের কানেকটিভিটি, নির্ভরযোগ্যতা, ব্যান্ডউইথ এবং ল্যাটেন্সি প্রভৃতি বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে।
বিটিসিএল বাংলাদেশের পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হওয়ায় দেশের মোট তথ্যের প্রায় ২৭ শতাংশ বহন করে থাকে। দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির উপর বিটিসিএলের বর্তমান অপটিকাল ফাইবার কেবল (ওমফসি) নেটওয়ার্কের উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে। সে কারণে এই নেটওয়ার্কের যেকোনো দুর্বলতার কারণে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে আশার কথা দেশের ৬৪টি জেলা, ৪৭২টি উপজেলা এবং ১ হাজার ২১৬টি ইউনিয়ন বর্তমানে বিটিসিএলের নেটওয়ার্কের আওতায় রয়েছে। ভৌগলিক সীমাবদ্ধতার কারণে এখনো কিছু জেলা রয়েছে যেগুলো নির্ভরযোগ্য উচ্চ গতির অপটিক্যাল লিঙ্কের পরিবর্তে স্বল্প নির্ভরযোগ্য রেডিও লিঙ্কের আওতায় রয়েছে। এছাড়াও কয়েকটি জেলায় এখনো কোনো ধরনের রিডান্ডেন্ট অপটিক্যাল সংযোগ নেই যে কারণে সেসব জেলায় নির্ভরযোগ্য নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। কোনো কোনো স্থানে বিটিসিএল নেটওয়ার্কের রিডান্ডেন্সি নির্ভর করে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি বাংলাদেশ, পিজিসিবির অপটিক্যাল ফাইবার কেবল (ওমফসি) লাইনের উপর। সামগ্রিকভাবে, বর্তমানে বিটিসিএলের যে বিদ্যমান রিং নেটওয়ার্কটি রয়েছে, তা সম্প্রতি প্রতিষ্ঠিত জাতীয় ফোর টায়ার ডাটা সেন্টারের জন্য যে উচ্চগতির ও নির্ভরযোগ্য নেটওয়ার্ক প্রয়োজন, তার সমপর্যায়ে নেই। সুতরাং একটি শক্তিশালী অপটিক্যাল ফাইবার ট্রান্সমিশন রিং-টাইপ নেটওয়ার্কেও গুরুত্ব অনস্বীকার্য।
প্রকল্পের মূল কার্যক্রম হচ্ছে, যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামাদি, মোটরযান, ব্যাকআপ রিং নেটওয়ার্কে রূপান্তরের জন্য দেশব্যাপী ১৪৬টি আন্ডারগ্রাউন্ড ওমফসি লিংক এবং ৮টি সাবমেরিন, আন্ডার রিভার ওমফসি লায়িং লিংক স্থাপন, ৩ হাজার ১৪৪ কিলোমিটার আন্ডারগ্রাউন্ড ওএঅসি লিং এবং ৩৯ কিলোমিটার সাবমেরিন ওমফসি স্থাপন করা হবে।
পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের কর্মকর্তারা মনে করছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের সর্বত্র নিরবচ্ছিন্ন সর্বাধুনিক টেলিযোগাযোগ ও আধুনিক ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সুবিধা পৌঁছে দেওয়া এবং ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণের জন্য বিটিসিএলের অপটিক্যাল ফাইবার ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক উন্নতকরণ এবং সম্প্রসারণ সম্ভব হবে।
ডব্লিউএইচ/এমআর