Dhaka Mail Logo

স্পোর্টস / ফুটবল

ব্যালন ডি’অরের রাতে বিশেষ কিছুর অপেক্ষায় কেইন

স্পোর্টস ডেস্ক

২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৫৪ পিএম

ঘরের মাঠ লন্ডনে আর মাত্র কয়েক দিনের অপেক্ষা। আগামী সোমবার বসছে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে সম্মানজনক মঞ্চ ‘ব্যালন ডি’অর’-এর বর্ণিল আসর। আর সেই জমকালো রাতে একটি "বিশেষ মুহূর্তের" প্রত্যাশায় দিন গুনছেন বায়ার্ন মিউনিখ তারকা হ্যারি কেইন। ইংল্যান্ড জাতীয় দলের এই অধিনায়কের হাতেই যে এবার উঠতে যাচ্ছে বিশ্বসেরার রাজমুকুট, বাজিকরদের বাজি অন্তত সেদিকেই!

৩৩ বছর বয়সী এই গোলমেশিন গত মৌসুমে ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে জাল কাঁপিয়েছেন অবিশ্বাস্য ৭৩ বার। বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে যা এক মৌসুমে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। কেইনের ওপরে আছেন কেবল লিওনেল মেসি, ২০১০-১১ মৌসুমে যিনি করেছিলেন ৮২ গোল!

গত বুধবার আর্সেনালের বিপক্ষে মাঠে নেমে কেইন আবারও বুঝিয়ে দিয়েছেন, ২০২৩ সালে জার্মানি পাড়ি দেওয়ার পর তিনি কতটা পরিপূর্ণ ফুটবলারে রূপ নিয়েছেন।

প্রতিপক্ষের রক্ষণ চুরমার করতে কখনও তাকে দেখা গেছে একদম নিজেদের গোলপোস্ট থেকে বল বানিয়ে নিয়ে ওপরে উঠতে। প্রথমার্ধে দূরপাল্লার এক নিয়ন্ত্রিত পাসে আলফনসো ডেভিসকে দিয়ে করিয়েছেন সমতাসূচক গোল। আর দ্বিতীয়ার্ধে নিজের আদায় করা পেনাল্টি থেকে নিখুঁত শটে বায়ার্নকে এগিয়ে দেন নিজেই। যদিও শেষ মুহূর্তে তারই জাতীয় দল সতীর্থ ডিক্লান রাইসের গোলে পয়েন্ট ভাগাভাগি করে মাঠ ছাড়ে গানাররা।

সব হিসাব-নিকাশ আর বাজি ধরে রাখা প্রতিষ্ঠানের দর কষাকষিতে কেইন এগিয়ে থাকলেও, সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম জমজমাট এই লড়াইয়ের শেষ হাসি কে হাসবেন, তা বলা কঠিন।

ক্যারিয়ারের প্রথম ব্যালন ডি’অর ট্রফিতে চুমু আঁকার স্বপ্ন দেখা কেইনকে দিতে হচ্ছে কঠিন পরীক্ষা। লড়াইয়ে তার শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আছেন স্পেনকে বিশ্বকাপ জেতানো দ্বৈত শক্তি লামিনে ইয়ামাল ও রদ্রি, ফরাসি পোস্টার বয় কিলিয়ান এমবাপ্পে এবং বায়ার্নে তার সতীর্থ মাইকেল ওলিস।

ইয়ামাল বা এমবাপ্পেরা যখন এই ট্রফির জন্য নিজেদের যোগ্যতার কথা গণমাধ্যমে সরবে জানান দিচ্ছেন, কেইন তখন বরাবরের মতোই শান্ত ও বিনয়ী। বুধবারের মহাকাব্যিক পারফরম্যান্সের পর একের পর এক প্রশ্নে কেইন হাসিমুখে বলেন, "আমি এগুলো নিয়ে না ভাবার চেষ্টা করি, যদিও এড়িয়ে যাওয়াটা বেশ কঠিন!" পুরস্কারের গুঞ্জন নিয়ে ইংলিশ স্ট্রাইকার আরও যোগ করেন, "বাতাসে নানারকম গুঞ্জন ভাসছে, তাই যতটা সম্ভব দূরে থাকার চেষ্টা করছি। তবে সোমবারের রাতটা আমি পুরোপুরি উপভোগ করতে চাই। এটা নিঃসন্দেহে আমার জীবনের অনেক বড় এক উপলক্ষ।"

ব্যালন ডি’অর জয়ের পেছনে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে তিনটি প্রধান শর্ত- ব্যক্তিগত নৈপুণ্য ও চারিত্রিক দৃঢ়তা, দলগত সাফল্য ও শিরোপা অর্জন এবং মাঠের খেলোয়াড়সুলভ আচরণ বা ফেয়ারপ্লে।

ইতিহাস বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে যারা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ কিংবা বিশ্বকাপ জিতেছেন, বা গোলের এমন পাহাড় গড়েছেন যাকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই, তারাই শেষ পর্যন্ত উঁচিয়ে ধরেছেন স্বর্ণালী এই ট্রফি। পরিসংখ্যানের সেই জায়গায় হ্যারি কেইন অনন্য ও ধরাছোঁয়ার বাইরে।

টটেনহ্যামে থাকার সময় শিরোপাখরা নিয়ে কতই না কটু কথা শুনতে হয়েছে কেইনকে। তবে বায়ার্নে যোগ দিয়েই গত বছর ঘরে তুলেছেন লিগ ও কাপের জোড়া ট্রফি। বায়ার্নের জার্সিতে ট্রফির সংখ্যাটাও এখন পাঁচে ঠেকেছে। যদিও জার্মানির ফুটবলে বায়ার্নের একচ্ছত্র আধিপত্যের কারণে এই ট্রফিগুলোর ওজন বিশ্লেষকদের কাছে খানিকটা হালকা মনে হতে পারে।

অন্যদিকে, ইউরোপীয় শ্রেষ্ঠত্বের মঞ্চে কেইনের বায়ার্ন পৌঁছেছিল চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সেমিফাইনালে, যেখানে তারা শেষ পর্যন্ত চ্যাম্পিয়ন হওয়া প্যারিস সেইন্ট-জার্মেইয়ের (পিএসজি) কাছে রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ে বিদায় নেয়। আর জাতীয় দলের হয়ে কেইনের অধিনায়কত্বেই বিশ্বকাপে তৃতীয় স্থান অর্জন করে ইংল্যান্ড, যেখানে তিনি নিজে করেছেন ৬টি গোল এবং একটি অ্যাসিস্ট।

আর্সেনালের বিপক্ষে জালের দেখা পেয়ে টানা ১০টি চ্যাম্পিয়নস লিগ ম্যাচে গোল করার দারুণ এক কীর্তি গড়েছেন কেইন। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর টানা ১১ ম্যাচে গোলের ঐতিহাসিক রেকর্ড ভাঙা থেকে এখন মাত্র এক ধাপ দূরে দাঁড়িয়ে তিনি।

সিআরসেভেনের রেকর্ডের ছোঁয়া পেয়ে কেইন বলেন, "যেকোনো আলোচনায় যখন রোনালদোর পাশে আপনার নাম উঠবে, বুঝে নেবেন আপনি বিশেষ কিছু করছেন, বিশেষ করে ইউরোপের এই মঞ্চে।"

এদিকে শিষ্যের এমন অনন্য সাধারণ পারফরম্যান্সে মুগ্ধ বায়ার্ন কোচ ভিনসেন্ট কোম্পানি। কেইনের দলীয় মনোভাবের প্রশংসা করে তিনি বলেন, "হ্যারি শেষ পর্যন্ত এখানে নিজের প্রথম ট্রফিগুলো জিততে পেরেছে, এটাই তাকে গত কয়েক বছরে সবচেয়ে বেশি আনন্দ দিয়েছে। এখন সে যদি ব্যালন ডি’অর দিয়ে তার এই অসাধারণ মৌসুমটিকে মুকুট পরাতে পারে, তবে দলের প্রতি তার যে নিবেদন, তাতে এটি তার শতভাগ প্রাপ্য।"

আর্সেনালের হয়ে ম্যাচের শেষ মুহূর্তে সমতা ফেরানো ডিক্লান রাইস প্রতিপক্ষ হলেও জাতীয় দলের অধিনায়কের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। রাইস বলেন, "ব্যালন ডি’অরের স্পষ্ট ও একক দাবিদার হ্যারি। তার পরিসংখ্যানই সব বলে দেয়। অসাধারণ একটা বছর কাটিয়েছে সে।"

রাইস আরও যোগ করেন, "একজন স্ট্রাইকার হয়ে নিজের বক্স থেকে অমন পাস দেওয়া, আর তারপর নিজের আদায় করা পেনাল্টিতে ওরকম ঠাণ্ডা মাথার ফিনিশিং... ও সত্যিই অবিশ্বাস্য এক খেলোয়াড়।" আর্সেনালের বিপক্ষে কেইনের এই ফুটবল প্রদর্শনী দেখার পর সাবেক ইংলিশ মিডফিল্ডার স্টিভেন জেরার্ড এবং জুড বেলিংহ্যাম একসুরে কেইনকে "ইংল্যান্ডের ফুটবল ইতিহাসের সম্ভবত সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়" হিসেবে আখ্যা দেন।

উল্লেখ্য, ২০০১ সালে মাইকেল ওয়েন ছিলেন শেষ ইংলিশ ফুটবলার যিনি ব্যালন ডি’অর জিতেছিলেন। আর বায়ার্ন মিউনিখের সর্বশেষ খেলোয়াড় হিসেবে ১৯৮১ সালে এই সোনালী ট্রফিটি উঁচিয়ে ধরেছিলেন কার্ল-হেইনৎস রুমেনিগে। সবমিলিয়ে রোমাঞ্চ আর প্রত্যাশার পারদ তুঙ্গে রেখে কেইন বলেন, "সোমবারের রাতটা বিশেষ কিছু হতেই পারে, তবে আমাদের এখন অপেক্ষা করতে হবে।"

সামনের চ্যালেঞ্জ মনে করিয়ে দিয়ে তিনি আরও বলেন, "সামনে রোববার আরও একটি বড় ম্যাচ আছে, তাই মনকে শান্ত রাখার চেষ্টা করছি। তবে আমি জানি এটি কত বড় এক মঞ্চ। আমি নিশ্চিতভাবেই এর মুখিয়ে আছি। আশা করি, রাতটি বিশেষ কিছুই হতে যাচ্ছে।"