Dhaka Mail Logo

স্পোর্টস / ফুটবল

তাসের ঘরের মত ভেঙে পড়ছে ম্যানসিটির রূপকথার রাজত্ব!

স্পোর্টস ডেস্ক

২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:১৮ পিএম

২০০৮ সালে মধ্যপ্রাচ্যের ধনকুবেরদের আগমন ফুটবল বিশ্বের পুরো মানচিত্র বদলে দিয়েছিল। ম্যানচেস্টার শহরের এক কোণে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিশাল ছায়ায় ঢাকা পড়ে থাকা সাধারণ এক মধ্যম সারির দল ‘ম্যানচেস্টার সিটি’ রাতারাতি রূপ নেয় বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় শক্তিতে। কিন্তু মাঠের সেই সোনালী ইতিহাস ও ট্রফির পাহাড়ের নেপথ্যে ছিল এক অন্ধকার আইনি লড়াই। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ১১৪টি আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের বেশিরভাগেই প্রিমিয়ার লিগের বিচারে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার খবর সামনে আসতেই প্রশ্ন উঠছে- তবে কি সিটির এই অবিশ্বাস্য রাজত্ব ছিল আইনের ফাঁক গলে তৈরি হওয়া এক বিশাল তাসের ঘর?

সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভাইস-প্রেসিডেন্ট ও উপ-প্রধানমন্ত্রী শেখ মনসুর বিন জায়েদ আল-নাহিয়ান ১৮ বছর আগে আবু ধাবি ইউনাইটেড গ্রুপের মাধ্যমে ম্যানচেস্টার সিটির মালিকানা গ্রহণ করেন। তাঁর আসার আগে ক্লাবের ১২৮ বছরের দীর্ঘ ইতিহাসে প্রধান ট্রফি ছিল মোটে ৯টি, যার মধ্যে শীর্ষ লিগ শিরোপা ছিল মাত্র ২টি। এমনকি ১৯৯০-এর দশকের শেষের দিকে দলটি নেমে গিয়েছিল ইংলিশ ফুটবলের তৃতীয় সারিতে।

কিন্তু আবু ধাবির বিলিয়ন বিলিয়ন পাউন্ডের বিনিয়োগ পূর্ব ম্যানচেস্টারের ছবিটাই বদলে দেয়। পরবর্তী দেড় দশকে ক্লাবটি জেতে ৮টি প্রিমিয়ার লিগ, ৪টি এফএ কাপ, ৭টি লিগ কাপ এবং ২০২৩ সালে তাদের অধরা প্রথম চ্যাম্পিয়নস লিগ। রবিনহোকে দিয়ে শুরু হওয়া নক্ষত্রদের সমাগম পূর্ণতা পায় ইয়ায়া তোরে, ডেভিড সিলভা ও সার্জিও এগুয়েরোর আগমনে। ২০১১-১২ মৌসুমের শেষ দিনে ৯৪তম মিনিটে এগুয়েরোর সেই ঐতিহাসিক গোল ৪৪ বছর পর দলকে প্রথম লিগ শিরোপা এনে দেয়, যা পরের ১৩ মৌসুমে ৮টি লিগ জয়ের এক অপ্রতিরোধ্য অধ্যায়ের সূচনা করেছিল।

রবের্তো মানচিনি ও মানুয়েল পেলেগ্রিনির পর ২০১৬ সালে কোচ হিসেবে যোগ দেন পেপ গার্দিওলা। তাঁর এক দশকের জাদুকরী ছোঁয়ায় ইংলিশ ফুটবলের ইতিহাসে সবচেয়ে আধিপত্যশীল সময় কাটায় সিটি। ২০১৭-১৮ থেকে ২০২৩-২৪ মৌসুমের মধ্যে ৭টি লিগের ৬টিতেই চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সাথে টানা ৪ বার লিগ জয়ের অনন্য নজির গড়ে তারা। 

অবশেষে ২০২৩ সালে চ্যাম্পিয়নস লিগ, প্রিমিয়ার লিগ ও এফএ কাপ জিতে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ঐতিহাসিক ‘ট্রেবল’ জয়ের রেকর্ডে ভাগ বসায় তারা। ক্লাবে বিশ্বজয়ী আয়ের তোড়ে ২০২২ সালে ডেলয়েট মানি লিগের শীর্ষে উঠে আসা সিটি সম্প্রতি এক ট্রান্সফার উইন্ডোতেই খেলোয়াড় কিনতে রেকর্ড ৪৬০ মিলিয়ন পাউন্ড (৬০৯ মিলিয়ন ডলার) খরচ করে।

তবে এই বিশ্বজয়ী যাত্রার পেছনে দানা বাঁধছিল বিতর্ক। ২০১৮ সালে জার্মান সাময়িকী ডের স্পিগেল সিটির ফাইন্যান্সিয়াল ফেয়ার প্লে নিয়ম ভঙ্গের গোপন নথিপত্র ফাঁস করে দিলে তোলপাড় শুরু হয়। ২০২০ সালে ইউয়েফা সিটিকে দুই বছরের ইউরোপীয় নিষেধাজ্ঞায় ফেললেও পরে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আদালতে তা বাতিল হয়।

পরবর্তীতে প্রিমিয়ার লিগ ২০০৯ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যবর্তী সময়ের জন্য ১১৪টি গুরুতর নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগ এনে দীর্ঘ তদন্ত শুরু করে। প্রিমিয়ার লিগের এই মারাত্মক অভিযোগগুলোর মধ্যে ছিল- আবুধাবিভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের স্পন্সরশিপ চুক্তির অর্থ কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে দেখানো, গোপন পেমেন্টের মাধ্যমে খেলোয়াড় ও কোচদের প্রকৃত বেতন আড়াল করা এবং প্রিমিয়ার লিগের তদন্তকাজে কোনো ধরনের সহযোগিতা না করা। সম্প্রতি প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা গেছে, এসব অভিযোগের প্রায় সবকটিতেই ক্লাবটিকে চূড়ান্তভাবে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।

সিটির বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের রায় প্রকাশ্যে আসতেই ক্লাবটির জেতা সমস্ত অর্জনের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ২০০৮ সালে শেখ মনসুরের আবু ধাবি ইউনাইটেড গ্রুপ ক্লাবটি অধিগ্রহণের পর থেকে সিটি ৮টি প্রিমিয়ার লিগ, ১টি চ্যাম্পিয়নস লিগ, ৪টি এফএ কাপ এবং ৭টি লিগ কাপ সহ মোট ২০টি বড় ট্রফি জিতেছে। প্রিমিয়ার লিগের চলতি মৌসুমে প্রথম পাঁচ ম্যাচের সবকটিতে জিতে পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে থাকলেও, মাঠের বাইরের এই রায়ে তাদের অতীতের সমস্ত অর্জন ও ট্রফি বাতিলের চরম ঝুঁকিতে পড়েছে।

তবে ক্লাবের এই কঠিন পরিস্থিতিতে দলটির সাবেক মিডফিল্ডার রদ্রি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে কোনো সিদ্ধান্তই তাদের কষ্টার্জিত সাফল্যকে ম্লান করতে পারবে না। রদ্রি বলেন, "আমরা যা করেছি, তা কেউ আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারবে না। এটি অর্থ দিয়ে কেনা হয়নি, বরং প্রতিদিনের প্রচেষ্টা, অংশীদারিত্ব এবং কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াইয়ের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে। আমরা একাধিক সফল বছর কাটিয়েছি, আর ওয়েম্বলিতে জেতা প্রতিটি ট্রফিই আমাদের যোগ্যতার প্রমাণ। ইংলিশ ফুটবলের সেরা সময়ে অংশ হতে পেরে আমি গর্বিত।"

এর আগে আর্থিক ও লাভজনকতার নিয়ম লঙ্ঘনের দায়ে ২০২৩-২৪ মৌসুমে এভারটনের মোট ৮ পয়েন্ট এবং ২০২৪ সালের মার্চে নটিংহ্যাম ফরেস্টের ৪ পয়েন্ট কেটে নেওয়া হয়েছিল। নিউক্যাসেল ইউনাইটেডও সামান্য ব্যবধানে শাস্তির হাত থেকে বেঁচে যায়। তবে সিটির বিরুদ্ধে এক দশকেরও বেশি সময়জুড়ে বিস্তৃত মারাত্মক অভিযোগের মাত্রা আগের সব উদাহরণকে ছাড়িয়ে গেছে। 

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সিটির শাস্তির ক্ষেত্রে মৃদু ট্রান্সফার ব্যান থেকে শুরু করে প্রিমিয়ার লিগ থেকে বহিষ্কারের মতো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে প্যানেলের হাতে। তবে সিটি যদি এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে, তবে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় এই আইনি লড়াইটি নতুন এক দীর্ঘমেয়াদী অধ্যায়ে প্রবেশ করবে।

এদিকে পুরো ঘটনার ওপর কড়া নজর রাখছে যুক্তরাজ্য সরকার। সংস্কৃতি, মিডিয়া ও ক্রীড়া সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সভাপতি ক্যারোলিন ডাইনএজ এক বিবৃতিতে জানান, এই খবর ফুটবল অঙ্গনে গভীর প্রভাব ফেলেছে। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া ও মোটা অংকের অর্থ ব্যয়ের বিষয়টি ফুটবলের আর্থিক স্বচ্ছতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে উল্লেখ করে তিনি সঠিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে দ্রুত সময়ের মধ্যে পুরো আইনি ধাপ শেষ করার আহ্বান জানান।