স্পোর্টস ডেস্ক
১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৩৩ পিএম
মাইক্রোফোনের আড়ালে চাপা গুঞ্জনটা ক্রিকেট পাড়ায় বেশ কিছুদিন ধরেই ভাসছিল, অবশেষে তা বাস্তবতার রূপ নিতে যাচ্ছে! ২০২৭ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপকে সামনে রেখে বাংলাদেশ জাতীয় দলের কোচিং প্যানেলে এক বড় ধরনের অবকাঠামোগত পরিবর্তন আনছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। বিদেশি চশমায় ক্রিকেট দেখার দিন বদলে ফেলে বিসিবি এবার বড় বাজিটা ধরছে ঘরের মাটিতে বেড়ে ওঠা ক্রিকেট মস্তিস্কগুলোর ওপর।
প্রধান কোচ হিসেবে ফিল সিমন্স আর স্পিন বিভাগে মুশতাক আহমেদের অভিজ্ঞতা বহাল থাকলেও, ড্রেসিংরুমের সিংহভাগ দায়িত্ব এখন লাল-সবুজের কোচদের কাঁধে। মোহাম্মদ সালাউদ্দিন, মোহাম্মদ আশরাফুল, তালহা জুবায়ের কিংবা আশিকুর রহমানদের মতো পরিচিত মুখগুলোকে একসঙ্গে এক সুতোয় গাঁথা হয়েছে। তবে এই ‘দেশি ঘরানা’র পেছনে কতটা সুদূরপ্রসারী ক্রিকেটীয় পরিকল্পনা আছে, আর কতটাই বা সম্পর্কের সমীকরণ; তা নিয়েই এখন ক্রিকেট বোর্ডের অন্দরমহলে বড় প্রশ্ন।
দেশি কোচদের জাতীয় দলে কাজের সুযোগ করে দেওয়া নিশ্চিতভাবেই একটি প্রশংসনীয় ও ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে জাতীয় দলের ড্রেসিংরুম কেবল অভিজ্ঞতা অর্জনের কোনো পরীক্ষাগার হতে পারে না। অতীতের পরিসংখ্যান খুব একটা আশাব্যঞ্জক বার্তা দেয় না; লম্বা মেয়াদে দেশি কোচদের অধীনে বড় কোনো আন্তর্জাতিক সাফল্যের গ্রাফ তৈরি করা আজও সম্ভব হয়নি।

বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাটিং বিভাগে মোহাম্মদ সালাউদ্দিনের কাজ করার মেয়াদে দলের পারফরম্যান্সের নিম্নমুখী গ্রাফ সেই প্রশ্নকে নতুন করে উসকে দেয়। আশরাফুলের যোগদানের আগে ব্যাটিংয়ের যে অচলাবস্থা ছিল, তার পুরো দায় এককভাবে কোনো কোচের ওপর না চাপালেও, পারফরম্যান্সের মূল্যায়ন এড়ানোর সুযোগ নেই।
অন্যদিকে বাংলাদেশ ক্রিকেটে যে কয়টি বিভাগে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে, তার মূলে ছিলেন আন্তর্জাতিক মানের বিদেশিদের হাত ধরে। পেস বোলিং বিভাগের বৈপ্লবিক পরিবর্তনের পেছনে রাসেল ডমিঙ্গো, অটিস গিবসন, অ্যালান ডোনাল্ড কিংবা শন টেইটের অবদান অনস্বীকার্য।
ঠিক একইভাবে, ব্যাটিংয়ে নিল ম্যাকেঞ্জির মেয়াদে দল একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামো ও ধারাবাহিকতা খুঁজে পেয়েছিল। বিশ্বমানের একজন ব্যাটিং বিশেষজ্ঞের দীর্ঘদিনের অভাবই যে এখন জাতীয় দলের ব্যাটিং বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এমতাবস্থায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ের পরীক্ষিত কৌশলবিদদের বাদ দিয়ে কেবল 'দেশি রূপরেখা' তৈরি কতটা যৌক্তিক, তা ভাবার সময় এসেছে।

সবচেয়ে বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছে বর্তমান কোচিং ও ব্যবস্থাপনা প্যানেলের ভেতরের পারস্পরিক সুসম্পর্ক। তালহা জুবায়ের, আশিকুর রহমান, মোহাম্মদ আশরাফুল এবং বর্তমান দলীয় ম্যানেজার নাফিস ইকবাল; তারা সবাই অনূর্ধ্ব-১৯ পর্যায় থেকে একসঙ্গে ক্রিকেট খেলে উঠে এসেছেন। একই প্রজন্মের সাবেক ক্রিকেটারদের প্রশাসনিক ও কৌশলগত দায়িত্বে আসা স্বাভাবিক হলেও, সুনির্দিষ্ট ও পরিমাপযোগ্য মানদণ্ড ছাড়া এমন নিয়োগ আবেগ কিংবা মেধা কোনটি দ্বারা চালিত, সে প্রশ্ন থেকেই যায়। যোগ্যতা নাকি পরিচিতির অগ্রাধিকার, এই ভারসাম্যের হিসেব মেলাতেই হবে বোর্ডকে।
২০২৭ বিশ্বকাপের বাকি আর অল্প কিছুদিন। এই স্বল্প সময়ে জাতীয় দলকে কোনো পরীক্ষামূলক ট্র্যাকে দাঁড় করানো কতটা নিরাপদ হবে, সেটিই এখন বড় ভাবনার বিষয়। শেষ পর্যন্ত বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু দেশি বনাম বিদেশি কোচ নয়; বর্তমান পেক্ষাপটে জাতীয় দলের জন্য সবচেয়ে কার্যকরী সমন্বয় কোনটি। বিশ্বমানের কাউকে বাইরে রেখে শুধু আবেগের বশে তৈরি করা এই অবকাঠামো বিসিবিকে বিশ্বকাপের মঞ্চে সাফল্য এনে দেবে, নাকি বড় কোনো মাসুল গুণতে হবে, তার উত্তর মিলবে ২০২৭-এর মাঠের পারফরম্যান্সেই।