স্পোর্টস ডেস্ক
০৬ আগস্ট ২০২৬, ০৫:৪৮ পিএম
সারাদিন কারখানায় ভারী কনটেইনার টানার পর শরীর যখন ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ত, তখন রাতের আঁধারে মোজার ভেতর বল ঢুকিয়ে চলত একাকী অনুশীলন। চোখে ছিল বড় ভাইয়ের অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণের জেদ আর বুকে ছিল ক্রিকেটের প্রতি তীব্র ভালোবাসা। এই ভালোবাসা আর জেদই মালয়েশিয়ার এক সাধারণ প্রবাসী শ্রমিককে আজ বানিয়ে দিয়েছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার। তিনি নাজমুস সাকিব। জন্মভূমির সীমানা পেরিয়ে মালয়েশিয়ার জার্সি গায়ে জড়ানো এক অদম্য যোদ্ধার নাম।
সাকিবের ক্রিকেটের হাতেখড়িটা হয়েছিল বেশ নাটকীয়ভাবে। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় স্কুলে খেলোয়াড় খুঁজতে আসেন কোচ জুয়েল স্যার। লাজুক সাকিব সেদিন ভিড়ের মাঝে হাত তোলার সাহস পাননি। কিন্তু পাশে বসা এক সহপাঠীই জোর করে স্যারকে জানিয়ে দেন সাকিবের প্রতিভার কথা। বান্ধবীর সেই ছোট্ট একটি উদ্যোগেই সেদিন লেখা হয়েছিল সাকিবের ক্রিকেট জীবনের প্রথম অধ্যায়।
খুলনার জুয়েল স্যারের একাডেমিতে বিনা বেতনে অনুশীলন করে নিজেকে তৈরি করতে থাকেন তিনি। মায়ের কানের দুল বিক্রি করে কেনা ব্যাটে ভর করে একসময় সুযোগ পান খুলনা জেলা অনূর্ধ্ব-১৬ দলে, এমনকি নেতৃত্বও দেন দলকে। স্বপ্ন ছিল লাল-সবুজ জার্সি গায়ে জড়ানোর। কিন্তু হঠাৎ বাবার মৃত্যুতে এলোমেলো হয়ে যায় সবকিছু। পরিবারের হাল ধরতে বাধ্য হয়ে ব্যাট-প্যাড তুলে রেখে জীবিকার সন্ধানে পাড়ি জমাতে হয় মালয়েশিয়ায়।
সেই দুর্দিনে পরিবারের ছায়া হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন বড় ভাই (চাচাতো ভাই) আজিজ শেখ। আজিজেরও একসময় স্বপ্ন ছিল জাতীয় দলের হয়ে খেলার, যা অভাবের তাড়নায় পূরণ হয়নি। ভাইয়ের সেই ভাঙা স্বপ্ন জোড়া লাগানোর প্রতিজ্ঞাই মালয়েশিয়ায় সাকিবের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
মালয়েশিয়ার প্রবাস জীবনটা মোটেও সহজ ছিল না। একটি বেডশিট কারখানায় প্রতিদিন ৪০-৫০ কেজির চারটা কনটেইনার ওঠানো-নামানোর অমানুষিক পরিশ্রম করতে হতো তাঁকে। তবুও রাতে ঘরে ফিরে চলত শ্যাডো প্র্যাকটিস, যাতে বল আর ব্যাটের সংযোগটা নষ্ট না হয়। একদিন টেপ টেনিস খেলতে গিয়ে এক ক্লাব কর্মকর্তার নজরে পড়েন সাকিব। কোনো অনুশীলন ছাড়াই প্রথম ম্যাচে মাত্র ৫০ বলে সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে বসেন তিনি!
এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। টানা দুই বছর সেখানকার ইন্টার-স্টেট টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকদের তালিকায় নিজের নাম লেখান। এরপর মালয়েশিয়া ‘এ’ দলের হয়ে সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে খেলেন ৫০ বলে ১২২ রানের এক বিধ্বংসী ইনিংস। সেই দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পরই মালয়েশিয়া ক্রিকেট বোর্ড থেকে আসে জাতীয় দলে খেলার প্রস্তাব। ভাই আজিজের পরামর্শেই সেই সুযোগ লুফে নেন সাকিব।
ভাগ্যের কী অদ্ভুত খেলা, আজ সেই খুলনার ছেলেটি মালয়েশিয়ার জার্সি গায়ে ফিরেছেন নিজের দেশেই। বাংলাদেশ ইমার্জিং দলের বিপক্ষে খেলতে নেমেছেন প্রতিপক্ষ হিসেবে। নিজের জন্মভূমির বিপক্ষে মাঠে নামাটা যথেষ্ট আবেগের এবং কঠিন হলেও, সাকিবের লক্ষ্য এখন স্থির। কারখানার একজন সাধারণ শ্রমিক থেকে জাতীয় দলে উঠে আসার এই অবিশ্বাস্য যাত্রায় ভর করে তিনি এখন মালয়েশিয়ায় বসবাসরত হাজারো প্রবাসী বাঙালির গর্ব।