স্পোর্টস ডেস্ক
০২ আগস্ট ২০২৬, ১০:২৪ পিএম
২০১০ সাল। চারদিকে কেবল মৃত্যুর হাহাকার আর ধ্বংসস্তূপ। হাইতির সেই প্রলয়ংকরী ভূমিকম্পে প্রাণ হারিয়েছিল লাখো মানুষ। সেই মৃত্যুপুরীর বুক থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে ফেরা এক ছোট্ট শিশুর গল্পটা আজ হার মানিয়েছে রূপকথাকেও। যে শিশুটির ঠিকানা হয়েছিল এতিমখানায়, আজ সে কাঁপাচ্ছে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম পরাশক্তি আর্জেন্টিনার মাঠ। বলছিলাম স্টিফেন ওস্কার রামোস ওরফে ‘কিকি’ রামোসের কথা, যিনি হাইতির অনাথ আশ্রম থেকে উঠে এসে গায়ে জড়িয়েছেন ম্যারাডোনা-মেসিদের দেশের জার্সি, গড়ছেন নতুন এক ইতিহাস।
২০০৯ সালে হাইতির রাজধানী পোর্ট অব প্রিন্সে জন্ম কিকির। জন্মের কয়েক মাসের মাথায় তাকে রেখে আসা হয় অনাথ আশ্রমে। এরপরই আঘাত হানে সেই ভয়াবহ ভূমিকম্প। তবে ভাগ্য যার সহায়, তাকে কে মারে! ধ্বংসযজ্ঞের মাঝেই বেঁচে যাওয়া ৯ মাস বয়সী কিকিকে দত্তক নেয় এক হৃদয়বান আর্জেন্টাইন দম্পতি। নতুন বাবা-মায়ের হাত ধরে তার ঠিকানা হয় বুয়েনস আইরেসে। সেখানেই নতুন জীবনের পাশাপাশি ফুটবলের প্রেমে পড়েন তিনি। নিজের অসামান্য প্রতিভার জানান দিয়ে সুযোগ করে নেন আর্জেন্টিনার স্বনামধন্য ক্লাব ভেলেজ সার্সফিল্ডের যুব একাডেমিতে।
চলতি ২০২৬ মৌসুমে ক্লাব ফুটবলে কিকির জাদুকরী পারফরম্যান্স নজর এড়ায়নি আর্জেন্টিনা অনূর্ধ্ব-১৭ দলের কোচ ডিয়েগো প্লাসেন্তের। ফলস্বরূপ ডাক পান বয়সভিত্তিক জাতীয় দলে। সম্প্রতি ইকুয়েডরের বিপক্ষে এক প্রীতি ম্যাচে আকাশি-সাদা জার্সিতে তার স্বপ্নের অভিষেক হয়। আর প্রথম ম্যাচেই বাজিমাত! তার পা থেকে আসা দুর্দান্ত এক গোলেই দল পায় ২-১ ব্যবধানের দারুণ এক জয়।
এই অভিষেকের মধ্য দিয়ে এক অনন্য ইতিহাসও গড়েছেন তরুণ এই উইঙ্গার। আর্জেন্টিনার শত বছরের ফুটবল ইতিহাসে যুব পর্যায়ে তিনিই প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ ফুটবলার। আর বয়সভিত্তিক ও জাতীয় দল মিলিয়ে তৃতীয়। তার আগে সবশেষ ১৯৮২ সালে আর্জেন্টিনার মূল দলের হয়ে খেলেছিলেন কৃষ্ণাঙ্গ গোলরক্ষক হেক্টর বালি। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় পর কিকির হাত ধরে আবারও কোনো কৃষ্ণাঙ্গ ফুটবলার আলবিসেলেস্তেদের প্রতিনিধিত্ব করলেন।
জাতীয় দলে ডাক পাওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্যের শিকার হতে হয়েছিল তাকে। তবে কিকি এসব নেতিবাচক কথায় কান দেননি। নিখুঁত আর্জেন্টাইন উচ্চারণে স্প্যানিশ ভাষায় তিনি কড়া জবাব দিয়েছেন সমালোচকদের। কিকি পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, আর্জেন্টিনায় এসে কখনোই তিনি কোনো বৈষম্যের শিকার হননি। যারা দেশটিকে বর্ণবাদী বলে, তাদের কথার কোনো ভিত্তি নেই। নিজেকে তিনি শতভাগ আর্জেন্টাইনই মনে করেন।
আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ফিফা অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপের প্রাথমিক দলেও জায়গা করে নিয়েছেন কিকি। হাইতির ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে আসা এই তরুণই এখন আগামীর বিশ্বমঞ্চে আর্জেন্টিনার অন্যতম বড় ভরসা হয়ে উঠছেন।