স্পোর্টস ডেস্ক
০২ আগস্ট ২০২৬, ১২:২৫ পিএম
রিয়াল মাদ্রিদের বর্তমান স্কোয়াডের অন্যতম বড় তারকা ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। লস ব্লাঙ্কোসদের সংকটকালীন সময়ে ব্যক্তিগত প্রতিভার ঝলক দেখিয়ে সাফল্য পেতে বেশ অবদান রেখেছেন ব্রাজিলিয়ান এই তারকা, জিতিয়েছেন চ্যাম্পিয়ন্স লিগসহ আরও অনেক শিরোপা। স্প্যানিশ ক্লাবটিও এই তরুণ ফুটবলারকে সমীহ করে। তাই তো লম্বা সময়ের জন্যই রেখে দিতে চায় দলে। ভিনিও ক্লাবটির প্রতি বেশ অনুগত। তবে দুই পক্ষের চাওয়ার পরও নতুন চুক্তি করতে পারছেন না। এই চুক্তির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ভিনিসিয়ুসের ইমেজ রাইটস।
ইমেজ রাইটস কি?
বর্তমান বিশ্বে একজন পেশাদার ফুটবলার মানে এই নয় যে তিনি তাঁর দলের হয়ে মাঠে খেলে, ড্রিবলিং-ট্যাকল করে, গোল দিয়ে দলের হয়ে অবদান রাখবেন, বিনিময়ে অর্থ উপার্জন করবেন। বরং এখন তাদের দুইটি ভিন্ন সত্তা হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ১. অ্যাথলেট (খেলাোয়াড়): যখন তারা দৌড়ায়, ট্যাকেল করে, পাস দেয় এবং গোল করে, তখন এর সুফল পাওয়া যায়। ২. ব্র্যান্ড: তাদের মুখ, নাম, কণ্ঠস্বর, স্বাক্ষর, হেয়ারস্টাইল এবং ব্যক্তিগত অবয়ব বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করা।
ইমেজ রাইটস বা ছবি ব্যবহারের অধিকার হলো সহজ ভাষায় একজন ফুটবলারের ব্র্যান্ড সত্তাটিকে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করার আইনি অধিকার।
একটি ক্লাব যখন কোনো ফুটবলারকে কেনে, তখন তারা শুধু ৯০ মিনিট মাঠে দৌড়ানোর জন্য টাকা দেয় না। তারা টিকিট বিক্রি করতে, বিলবোর্ডে সেই ফুটবলারের ছবি ব্যবহার করতে, ফিফা/ইএ স্পোর্টস বা অন্য ভিডিও গেমে ফুটবলারের অবয়ব ব্যবহার করতে এবং ক্লাবের অফিশিয়াল স্পন্সরদের (যেমন জার্সিতে থাকা এয়ারলাইনসের লোগো) প্রচারণা চালাতে খেলোয়াড়ের বাণিজ্যিক সত্তাকে ব্যবহার করতে চায়।
ইমেজ রাইটস যেভাবে কাজ করে
বর্তমান বিশ্বে একজন তারকা ফুটবলার তাঁর মোট উপার্জিত অর্থের বেশিরভাগই আয় করেন নিজের বাণিজ্যিক সত্তাকে ব্যবহার করে। নিজের ইমেজ রাইটস দিয়ে তিনি ব্যক্তিগত পর্যায়ে বিশ্বব্যাপি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সঙ্গে চুক্তি করে থাকেন এবং এর বিনিময়ে কাড়ি কাড়ি অর্থ উপার্জন করে থাকেন। তবে বিভিন্ন দেশে একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগতভাবে উপার্জিত অর্থের ওপর অনেক সময় উচ্চ কর আরোপ করার আইন আছে।
এ কারণে একজন হাই-প্রোফাইল ফুটবলার সরাসরি ব্যক্তি হিসেবে নিজের ব্র্যান্ডের মালিক না হয়ে সাধারণত একটি ইমেজ রাইটস কোম্পানি তৈরি করেন (যা প্রায়ই সুবিধাজনক কর ব্যবস্থার দেশগুলোতে করা হয়)। তাই যখন কোনো ক্লাব একজন তারকা ফুটবলারকে দলেও নেওয়ার জন্য চুক্তি করে, তখন তারা দুটি আলাদা চুক্তি নিয়ে আলোচনা করে।
১. এমপ্লয়মেন্ট কন্ট্রাক্ট (চাকরির চুক্তি): এই চুক্তিতে ক্লাবটি সেই দলের হয়ে ফুটবলারকে মাঠে খেলা, অনুশীলনের জন্য একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ বেতন হিসেবে প্রদান করে।
২. ইমেজ রাইটস কন্ট্রাক্ট (বাণিজ্যিক সত্তা ব্যবহারের চুক্তি): এই চুক্তিতে ক্লাবটি বিভিন্ন বাণিজ্যিক কাজে সেই ফুটবলারের মুখ, নাম, কণ্ঠস্বর, স্বাক্ষর, হেয়ারস্টাইল এবং ব্যক্তিগত অবয়ব ব্যবহারের আইনি অধিকার নেয়। আর ঠিক এখানেই ক্লাব এবং ফুটবলারদের মাঝে এক ধরনের দ্বন্দ্ব তৈরি হয়।
ক্লাবের স্পন্সর বনাম খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত স্পন্সর
একজন তারকা ফুটবলারের নিজস্ব ব্যক্তিগত স্পন্সর থাকে, আবার ক্লাবেরও অফিশিয়াল স্পন্সর থাকে। যেমন- ক্লাবের স্পন্সর হিসেবে থাকতে পারে অ্যাডিডাস (জার্সি প্রস্তুতকারক), এমিরেটস (জার্সি স্পন্সর), ইএ স্পোর্টসের মত ব্র্যান্ডগুলো। আবার একজন ফুটবলার সেই ক্লাবে খেললেও ব্যক্তি পর্যায়ে নাইকি (ব্যক্তিগত বুট চুক্তি), পেপসি, রেড বুলের মত কোম্পানিগুলোর সঙ্গে চুক্তিতে যেতে পারেন।
এসব কারণে আইনি মামলা এড়াতে ক্লাবগুলো সাধারণত একটি কঠোর নিয়ম মেনে চলে। ক্লাব কোনো ফুটবলারের ছবি ব্যবহার করতে পারবে কেবলমাত্র যদি সে ক্লাবের কিট পরা অবস্থায় তার ৩ জন বা তার বেশি সতীর্থের সাথে থাকে। এটি মূলত দলগত এনডোর্সমেন্ট হিসেবে তুলে ধরে, ব্যক্তিগত প্রমোশন হিসেবে নয়। কিন্তু অনেক সময় সেই ক্লাবের স্পন্সর কোম্পানি যদি শুধু একজন ফুটবলারকেই চায় (যেমন নাইকি শুধু আর্লিং হালান্ডকে নিয়ে বিজ্ঞাপন করতে চায়), তবে নাইকিকে সরাসরি হালান্ডের ব্যক্তিগত ইমেজ রাইটস কোম্পানিকে টাকা দিতে হবে।
পুরো বিষয়টি বাস্তবে কীভাবে কাজ করে তা বোঝার জন্য উদাহরণ দেখা যাক।
কিলিয়ান এমবাপ্পে বনাম রিয়াল মাদ্রিদ
ঐতিহাসিকভাবে, রিয়াল মাদ্রিদের একটি বিখ্যাত "গ্যালাকটিকো" নিয়ম ছিল। ক্লাবটি তার ফুটবলারদের ইমেজ রাইটসের ৫০% নেবে, আর ৫০% আপনি রাখবেন। রিয়াল মাদ্রিদ যখন ডেভিড বেকহাম বা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে সাইন করিয়েছিল, তখন ক্লাব তাদের চেহারা ব্যবহার করে শত শত মিলিয়ন ডলার আয় করেছিল।
তবে কিলিয়ান এমবাপে যখন রিয়াল মাদ্রিদে আসার আলোচনা করছিলেন, তখন তিনি এই ৫০/৫০ ভাগাভাগি প্রত্যাখ্যান করেন, কারণ তার ব্যক্তিগত ব্র্যান্ড অনেক বড় এবং তিনি একটি বিশেষ পরিস্থিতির মাধ্যমে রিয়ালে যোগ দেন। শেষ পর্যন্ত জানা যায়, এমবাপে তার ইমেজ রাইটসের ৮০% নিজের কাছে রাখতে সক্ষম হন, যার ফলে মাদ্রিদ ছোট একটি অংশ পায়।
ঠিক এখানেই রিয়ালের সঙ্গে ভিনিসিয়ুসের দ্বন্দ্বের শুরু। ব্রাজিলিয়ান তারকার সঙ্গে স্প্যানিশ ক্লাবটির চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে ২০২৭ সালের জুনে। তাই তরুণ উইঙ্গারের সঙ্গে নতুন চুক্তি করতে লম্বা সময় ধরেই আলোচনা করছে রিয়াল। প্রথমে জানা গিয়েছিল, এমবাপের মত ভিনিও উচ্চ বেতন চান। তবে এখন বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ভিনি বেতনের ব্যাপারে ছাড় দিতে চাইলেও মূলত নিজের ইমেজ রাইটস নিয়ে এমবাপের মত চুক্তি করতে চান। অর্থাৎ তার ইমেজ রাইটসের ৮০% নিজের কাছে রাখতে চান। এর মাধ্যমে ব্রাজিলিয়ান তারকার বাণিজ্যিক সত্তা ব্যবহারের মাধ্যমে যত আয় হবে তাঁর মূল অংশই পাবেন ভিনি, ছোট একটি অংশ পাবে ক্লাব।
সংকট কোথায়?
২০২২ সালে ভিনিসিউস রিয়াল মাদ্রিদের সাথে যে চুক্তি করেছিলেন, সেখানে তিনি ক্লাবের প্রথাগত ৫০/৫০ ইমেজ রাইটস ভাগাভাগির শর্তে রাজি হয়েছিলেন। অর্থাৎ, তার বাণিজ্যিক সত্তার যে কোনো এনডোর্সমেন্ট বা বিজ্ঞাপন থেকে যা আয় হয়, তার অর্ধেক সরাসরি রিয়াল মাদ্রিদের পকেটে যায়। এদিকে গত কয়েক বছরে বিশ্ব ফুটবলে ভিনিসিউসের ব্র্যান্ড ভ্যালু আকাশচুম্বী হয়েছে। ফলে আয়ও বেড়েছে।
কিন্তু তার আয়ের ৫০% রিয়াল মাদ্রিদ যে কেটে নেয়। সেই টাকা দিয়েই মূলত ভিনিসিউসকে দেয়া ক্লাবের পুরো বেতন উঠে আসে!
২. নতুন চুক্তি আটকে যাওয়ার মূল দুটি কারণ
নতুন দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির আলোচনায় ভিনিসিউসের এজেন্টের সাথে ক্লাবের মূলত দুটি বড় জায়গায় মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। রিয়াল যখন এমবাপেকে সাইন করায়, তখন তারা নিজেদের ৫০/৫০ নিয়ম ভেঙে ফরাসি ফুটবলারকে তার ইমেজ রাইটসের ৮০% নিজের কাছে রাখার সুযোগ দেয়।
ভিনিসিউসের ক্যাম্পের যুক্তি খুব স্পষ্ট। ভিনিসিউস রিয়াল মাদ্রিদকে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতিয়েছেন এবং বিশ্বসেরা তারকাদের একজন। এমবাপে যদি নিজের আয়ের ৮০% রাখতে পারেন, তবে ভিনিসিউস কেন তার আয়ের ৫০% ক্লাবকে দিয়ে দেবেন?
তবে স্প্যানিশ ক্লাবটিরও তাদের নিজেদের যুক্তি আছে। এমবাপে রিয়ালে যোগ দিয়েছেন এক বিশেষ পরিস্থিতিতে। পিএসজি থেকে ফরাসি তারকাকে কিনতে হলে ২০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি খরচ করতে হতো রিয়ালকে। কিন্তু ফ্রান্সের ক্লাবটির সঙ্গে এমবাপে নতুন চুক্তি করতে রাজি হননি, বরং তিনি ফ্রি ট্রান্সফারে রিয়ালে যোগ দেন। তাই এমবাপের মত তারকা ফুটবলারকে বিক্রি করে পিএসজি যেমন এক পয়সাও পায়নি, রিয়ালকেও খরচ করতে হয়নি।
এমন পরিস্থিতির কারণে রিয়ালের বড় অঙ্কের টাকা বেঁচে যায়। এসব কারণেই রিয়াল ইমেজ রাইটসের ক্ষেত্রে এমবাপের প্রস্তাবে রাজি হয় বলে জানিয়েছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম। কিন্তু ভিনিসিয়ুস আগে থেকেই রিয়ালে খেলেন। তাই ব্রাজিলিয়ান তারকার সঙ্গে সম্মত নয় ক্লাব। এছাড়াও ক্লাবের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক কাঠামো রক্ষায় কড়া নিয়ম মেনে চলে রিয়াল। এর আগে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর সঙ্গে বিরোধের সময়ও নিজেদের নিয়ম মেনেছে ক্লাবটি, যে কারণে পর্তুগীজ মহাতারকাকে বিক্রিও করে দিয়েছিল তারা। এসব কারণেই ভিনির সঙ্গে স্প্যানিশ ক্লাবটির নতুন চুক্তি আটকে আছে। শেষ পর্যন্ত দুই পক্ষের এই দ্বন্দ্ব কোথায় গিয়ে শেষ হয় সেদিকেই চোখ ফুটবলপ্রেমীদের।