স্পোর্টস ডেস্ক
১৯ জুলাই ২০২৬, ১২:৩১ এএম
আগামীকাল নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ইতিহাসের এক অদ্ভুত বৈপরীত্য আর রোমাঞ্চকর প্রতিশোধের গল্প নিয়ে মুখোমুখি হচ্ছেস্পেন ও আর্জেন্টিনা। আজ থেকে ঠিক ৫০০ বছর আগে, ১৫১৬ সালে স্প্যানিশ সাম্রাজ্যে পা রেখে বুটের নিচে পিষ্ট করতে শুরুকরেছিল লাতিন আমেরিকার এক জনপদ আর্জেন্টিনাকে।
দীর্ঘ তিন শতাব্দী ধরে মাদ্রিদের রাজকীয় ইশারায় শোষিত হয়েছে এই অঞ্চলের সম্পদ, সংস্কৃতি আর স্বাধীনতা। ১৮১৬ সালে রক্তক্ষয়ীসংগ্রামের মাধ্যমে নীল-সাদা আকাশে স্বাধীনতার সূর্য উদিত হলেও, ইতিহাসের সেই ক্ষত আজও রয়ে গেছে অবচেতনায়।
পাঁচ শতাব্দী পর, সেই ঐতিহাসিক শোষক আর শোষিতের গল্প যেন নতুন রূপ নিয়ে ফিরছে ফুটবলের সবুজ গালিচায়। বিশ্বকাপের এইমেগা ফাইনালে কেবল একটি ট্রফি নয়, মাঠের লড়াইয়ে জড়িয়ে আছে পাঁচশো বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য আর মর্যাদার এক মহাকাব্যিকসংঘাত।
আর্জেন্টিনাকে বলা হয় লাতিন আমেরিকার বুকে এক টুকরো ইউরোপ। তাদের স্থাপত্যশৈলী থেকে শুরু করে মুখের ভাষা সবখানেইস্প্যানিশ সাম্রাজ্যের গভীর ছাপ স্পষ্ট। তবে ঔপনিবেশিক সেই চাদর ভেদ করে আর্জেন্টাইনরা তাদের নিজস্ব আত্মপরিচয় খুঁজে পেয়েছেফুটবলের মাঠে।
বিশ্বকাপের ফাইনাল মঞ্চে দুই দলের খেলোয়াড়রাই একে অপরের সাথে কথা বলবেন একই ভাষায় স্প্যানিশ। তবে মাঠের ফুটবল দর্শনেথাকবে যোজন যোজন ব্যবধান। স্প্যানিশদের মূল অস্ত্র হলো নিখুঁত পাসের বুনন, যা বিশ্বফুটবলে 'টিকিটাকা' নামে পরিচিত; একরাজকীয় ও সুশৃঙ্খল ফুটবল শৈলী।
অন্যদিকে আর্জেন্টিনার ফুটবল হলো রাজপথের ধুলোবালি থেকে উঠে আসা এক অদম্য শক্তি, যাকে বলা হয় 'লা নুয়েস্ট্রা' যেখানেজ্যামিতিক কৌশলের চেয়ে আবেগ, আগ্রাসন আর শৈল্পিক ড্রিবলিংই প্রধান অস্ত্র।
এই ফাইনালের সবচেয়ে বড় নাটকীয়তার নাম লিওনেল মেসি। ফুটবলের এই জাদুকরকে কিন্তু ফুটবলার হিসেবে গড়ে তুলেছে স্পেনেরমাটি আর বার্সেলোনার বিখ্যাত 'লা মাসিয়া' একাডেমি। স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশন একসময় মেসিকে তাদের জাতীয় দলে খেলারপ্রস্তাবও দিয়েছিল।
কিন্তু শিকড়কে ভোলেননি মেসি; স্পেনের লোভনীয় প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে বেছে নিয়েছিলেন মাতৃভূমির নীল-সাদা জার্সি। এবার নিজেরশেষ বিশ্বকাপে সেই স্পেনের মুখোমুখি মেসি। তবে এবার তার পথ আগলে দাঁড়াতে প্রস্তুত স্পেনের নতুন প্রজন্মের দুই ক্ষিপ্রগতির উইঙ্গারলামিন ইয়ামাল এবং নিকো উইলিয়ামস, যারা মেসির বিদায়ী স্বপ্নকে চূর্ণ করে স্প্যানিশ ফুটবলের আধুনিকতার পতাকা ওড়াতে চান।
১৯ জুলাই মেটলাইফ স্টেডিয়ামে রেফারি যখন শেষ বাঁশি বাজাবেন, তখন কেবল একটি ফুটবল ম্যাচের মীমাংসা হবে না; লেখা হবেইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়।স্পেনের জয় যদি হয় তাদের ফুটবলীয় আধুনিকতা ও জ্যামিতিক শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ, তবে আর্জেন্টিনার জয়হবে পাঁচশ বছরের ঔপনিবেশিক ইতিহাসের ওপর এক মধুর ফুটবলীয় প্রতিশোধ। পুরনো শাসক নাকি স্বাধীনচেতা লাতিন রক্ত; মর্যাদারএই চূড়ান্ত মহাযুদ্ধে শেষ হাসি কে হাসবে, তার উত্তর দেবে মেটলাইফ স্টেডিয়াম।