সালমান ইসলাম
২২ জুন ২০২৬, ০৬:৪১ পিএম
সবুজ গালিচায় বুটজোড়া যখন শেষবারের মতো কোনো জাদুকরী স্পর্শ এঁকে দেয়, তখন দিগন্তজোড়া এক দীর্ঘশ্বাস আর অনন্ত তৃপ্তি এসে ভর করে ফুটবলপ্রেমীদের মনে। বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে কত কিংবদন্তির আবির্ভাব ঘটেছে, কতজন ট্রফির শোকেস সাজিয়ে অমর হয়েছেন। কিন্তু লিওনেল মেসি? তিনি তো শুধু ট্রফি জেতেননি, তিনি ফুটবল নামক খেলাটার পূর্ণতা দিয়েছেন। ২০২৬ সালের এই মোহময়ী মুহূর্তে এসে নির্দ্বিধায় বলা যায়, ফুটবল জাদুকর লা পুলগার এই জীবনে আর নতুন করে কোনো চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই। অবসান ঘটেছে এক মহাকাব্যিক বৃত্তের।
কিন্তু এই পূর্ণতার পেছনে লুকিয়ে আছে দীর্ঘ দুই দশকের এক অবিশ্বাস্য উত্থান-পতনের গল্প। ২০০৬ সালের এক জার্মানির গ্রীষ্ম থেকে শুরু করে ২০২৬-এর আজকের দিন পর্যন্ত, মেসির ক্যারিয়ার যেন এক জীবন্ত রূপকথা।
২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপ। দীর্ঘ চুল, গায়ে ১৯ নম্বর জার্সি, চোখে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন। বেঞ্চ থেকে উঠে এসে সার্বিয়া ও মন্টিনিগ্রোর বিপক্ষে যখন সর্বকনিষ্ঠ আর্জেন্টাইন হিসেবে গোল করলেন, বিশ্ববাসী সেদিনই বুঝে গিয়েছিল, এক নতুন সূর্য উদিত হচ্ছে। বার্সেলোনার ‘লা মাসিয়া’ থেকে উঠে আসা এই বিস্ময়বালক পেপ গার্দিওলার ছোঁয়ায় হয়ে উঠলেন অপ্রতিরোধ্য। ২০০৯ সালে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে হারিয়ে যখন চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতলেন, তখন প্রথম ব্যালন ডি’অর জয়ের মাধ্যমে শুরু হলো ‘মেসি যুগ’।
২০১০ থেকে ২০১৫ এই সময়টায় মেসি ফুটবলকে অন্য গ্রহে নিয়ে যান। ২০১২ সালে এক ক্যালেন্ডার ইয়ারে অবিশ্বাস্য ৯১ গোল করে ভেঙে দেন গার্ড মুলারের রেকর্ড। চার চারটে ব্যালন ডি’অর তখন তার শোকেসে। বার্সেলোনার হয়ে লা লিগা, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, ক্লাব বিশ্বকাপ। কী জেতেননি তিনি? জাভি-ইনিয়েস্তার সঙ্গে মিলে তিকি-তাকা ফুটবলের যে কবিতা তিনি বুনেছিলেন, তা ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা সোনালী অধ্যায়।
এরপর ২০১৪ থেকে ২০১৬ মুদ্রার উল্টো পিঠ দেখতেও সময় লাগেনি। ক্লাবের হয়ে যিনি ঈশ্বর, দেশের জার্সিতে তিনিই যেন ট্র্যাজেডির নায়ক।
মারাকানার ২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনালে জার্মানির কাছে অতিরিক্ত সময়ের গোল হজম। গোল্ডেন বল হাতে ট্রফির পাশ দিয়ে মেসির হেঁটে যাওয়ার সেই ছবিটা এখনো ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম ট্রাজিক দৃশ্য। ২০১৫ ও ২০১৬ কোপা আমেরিকা পর পর দুই বছর চিলির কাছে টাইব্রেকারে ফাইনাল হার। ২০১৬ সালের সেই ফাইনালে পেনাল্টি মিস করার পর কান্নায় ভেঙে পড়া মেসি অভিমানে আন্তর্জাতিক ফুটবলকেই বিদায় বলে দিলেন।
২০১৬ সালে অবসরের ঘোষণায় ভাঙা গলার মেসি, 'আমার জন্য জাতীয় দল শেষ। আমি অনেক চেষ্টা করেছি। চারটা ফাইনাল খেললাম, কিন্তু ভাগ্য সহায় ছিল না।'
কিন্তু নিয়তি তো তার জন্য অন্য কিছু লিখে রেখেছিল। আলবিসেলেস্তের এই তারকার জীবনটা যেনো ফিনিক্স পাখির মতো প্রত্যাবর্তন হলো ২০২১ থেকে ২০২২ সালে। কোটি ভক্তের ভালোবাসায় অভিমান ভেঙে ফিরে এলেন। ভাঙাগড়ার মধ্য দিয়ে তৈরি হলো লিওনেল স্কালোনির 'লা স্কালোনেতা'।
এরপরের গল্পটা হয়তো আর্জেন্টিনা ভক্তদের জন্য চোখ ফেলতে দেইনি লিও। ২০২১ কোপা আমেরিকা, মারাকানায় চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলকে হারিয়ে ঘুচল ২৮ বছরের আন্তর্জাতিক ট্রফির খরা। মেসির আন্তর্জাতিক ট্রফি না পাওয়ার আক্ষেপ ঘুচল। এরপরে যে শূন্যতা মেসির মহাতারকার অমরত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন, সেই শেষ পলকটাও নিজের করে পূর্নতা দিয়েছেন তিনি। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফি ছুয়ে। এটি কোনো টুর্নামেন্ট ছিল না, এটি ছিল মেসির অমরত্বের কাব্য। সৌদি আরবের কাছে প্রথম ম্যাচে হেরে যাওয়ার পর যেভাবে দলকে টেনে তুললেন, তা অবিশ্বাস্য। ফাইনালে এমবাপের ফ্রান্সের সঙ্গে সর্বকালের সেরা লড়াইয়ের পর যখন সোনালী ট্রফিটা উঁচিয়ে ধরলেন, ফুটবল তখন যেন তার যোগ্য ঈশ্বরকে খুঁজে পেল।
শেষ অধ্যায় মেসি যেনো উপভোগের মঞ্চ করে রেখেছেন। বার্সেলোনার সঙ্গে আর্থিক জটিলতায় চোখের জলে পিএসজিতে পাড়ি জমানো, আর সেখান থেকে মার্কিন মুলুকের ইন্টার মিয়ামিতে চলে যাওয়া। ক্যারিয়ারের গোধূলিলগ্নে এসে মেসি ফুটবলকে উপভোগ করতে চেয়েছেন। মিয়ামিকে ট্রফি জেতানো, আমেরিকার মাটিতে ফুটবল উন্মাদনা তৈরি করা। সবকিছুতেই ছিল এক পরম তৃপ্তির ছোঁয়া। ২০২৪ সালেও আর্জেন্টিনার হয়ে জিতেছেন আরেকটি কোপা আমেরিকা।
মেক্সিকো, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে ষষ্ট বিশ্বকাপ খেলছেন এই তারকা। আর এই তারকা মাঠে নামলে ছুয়ে ফেলেন নানা রেকর্ডের ভাগ। তবে আর্জেন্টাইন অধিনায়ক যেনো নিজেকে আর পরিমাপের পাল্লায় মাপতে দেখতে চান না। তার আগের কথার সেই ছাপ যেনো এখনও তার মুখে সুর তুলে। ২০২৬ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে খেলতে নেমে হ্যাট্রিক করে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা জার্মান তারকা মিরোস্লাভ ক্লোসার সঙ্গে নিজেকে নিয়ে গেছে।
তবে এসব নিয়ে তিনি যে মোটেও ভাবেন না তা ফুটে উঠেছে ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে। মেসি বলেন, ‘আমি আসলে ঈশ্বরের কাছে আর নতুন করে কিছু চাই না। তিনি আমাকে প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি দিয়েছেন। এখন আমি ক্যারিয়ারের বাকি সময়টা স্রেফ উপভোগ করে যেতে চাই। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়দের তালিকায় আমার নাম উচ্চারিত হয়, একজন ফুটবলার হিসেবে এর চেয়ে তৃপ্তির আর কিছু হতে পারে না।’
২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে, যখন ক্যারিয়ারের একেবারে শেষপ্রান্তে এসে তিনি পেছন ফিরে তাকান, তখন আর কোনো অপূর্ণতা নেই, কোনো হাহাকার নেই। ফুটবল তাকে সবকিছু দিয়েছে, আর তিনিও ফুটবলকে দুহাত উজাড় করে দিয়ে ঋণী করে গেছেন।