স্পোর্টস ডেস্ক
১৯ জুন ২০২৬, ১০:০০ পিএম
একসময় ব্রাজিল মানেই ছিল ফুটবলের শিল্প। হলুদ জার্সি, বল পায়ে নাচ, অপ্রত্যাশিত ড্রিবল, হাসিমুখে আক্রমণ ‘জোগা বনিতো’ (Joga Bonito) ছিল শুধু একটি খেলার ধরন নয়, এটি ছিল একটি সাংস্কৃতিক পরিচয়। পেলে, গ্যারিঞ্চা, জিকো, রোমারিও, রোনালদো, রোনালদিনহোদের ব্রাজিল বিশ্বকে শিখিয়েছিল ফুটবল কেবল জেতার জন্য নয়, সুন্দরভাবে জেতারও একটি শিল্প।
কিন্তু ২০০২ সালে শেষ বিশ্বকাপ জয়ের পর পেরিয়ে গেছে ২৪ বছর। এই সময়ে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল আর বিশ্বকাপের ট্রফিছুঁতে পারেনি। ২০০৬, ২০১০, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২ এবং ২০২৬ প্রতিটি বিশ্বকাপেই ব্রাজিলকে শিরোপার অন্যতম দাবিদার ধরা হলেওশেষ পর্যন্ত স্বপ্ন ভেঙেছে বিভিন্ন পর্যায়ে।
২০০৬ বিশ্বকাপে রোনালদো, রোনালদিনহো, কাকা ও আদ্রিয়ানোর মতো তারকায় ভরা দলটি কোয়ার্টার ফাইনালের আগেই ফ্রান্সেরকাছে হেরে বিদায় নেয়। ২০১০ সালে নেদারল্যান্ডসের কাছে কোয়ার্টার ফাইনালে হার, ২০১৪ সালে ঘরের মাঠে জার্মানির বিপক্ষেঐতিহাসিক ৭-১ গোলের লজ্জা, ২০১৮ ও ২০২২ সালে যথাক্রমে বেলজিয়াম ও ক্রোয়েশিয়ার কাছে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় সবমিলিয়ে গত দুই দশক ব্রাজিলের জন্য হয়ে উঠেছে অপূর্ণতার গল্প।
তবে প্রশ্ন হলো ব্রাজিলের সেই ‘সাম্বা ফুটবল’ কোথায় হারিয়ে গেল? এর পেছনে রয়েছে কয়েকটি বড় কারণ।
প্রথমত, আধুনিক ফুটবলের কৌশলগত পরিবর্তন। ১৯৭০ বা ১৯৮২ সালের ব্রাজিলের মতো মুক্তভাবে আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলাআজ অনেক কঠিন। আধুনিক ফুটবল এখন উচ্চগতির প্রেসিং, শক্তিশালী ডিফেন্সিভ সংগঠন ও কৌশলগত শৃঙ্খলার ওপরনির্ভরশীল। ফলে ব্যক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি দলীয় কাঠামো এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
দ্বিতীয়ত, ব্রাজিলের খেলোয়াড় তৈরির সংস্কৃতির পরিবর্তন। একসময় ব্রাজিলের রাস্তাঘাট, সমুদ্র সৈকত এবং ফাভেলাগুলো ছিল প্রতিভাতৈরির কারখানা। শিশুরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ‘পেলাদা’ নামে পরিচিত অনানুষ্ঠানিক ফুটবল খেলত, যা তাদের সৃজনশীলতা ও ড্রিবলিংদক্ষতা গড়ে তুলত। কিন্তু নগরায়ন, নিরাপত্তা সমস্যা এবং সংগঠিত একাডেমি ফুটবলের প্রসারের ফলে সেই রাস্তার ফুটবল সংস্কৃতিঅনেক কমে গেছে।
তৃতীয়ত, ইউরোপীয় ফুটবলের প্রভাব। বর্তমানে ব্রাজিলের সেরা প্রতিভারা খুব অল্প বয়সেই ইউরোপে চলে যায়। ১৭-১৮ বছর বয়সেইতারা ক্লাবের কৌশলগত কাঠামো, ফিটনেস এবং শৃঙ্খলাভিত্তিক ফুটবলের মধ্যে বেড়ে ওঠে। এতে তারা আরও পরিপূর্ণ খেলোয়াড় হলেওঅনেক বিশ্লেষকের মতে ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের স্বতঃস্ফূর্ত সৃজনশীলতার কিছু অংশ হারিয়ে যাচ্ছে।
পরিসংখ্যানও পরিবর্তনের গল্প বলে। ১৯৫৮ থেকে ২০০২ পর্যন্ত ৪৪ বছরে ব্রাজিল জিতেছিল পাঁচটি বিশ্বকাপ। কিন্তু ২০০২ সালের পরটানা ছয়টি বিশ্বকাপ অপেক্ষা করেও আর শিরোপা জিততে পারেনি। একই সময়ে ইউরোপীয় দেশগুলো ২০০৬ থেকে ২০২২ পর্যন্ত টানাপাঁচটি বিশ্বকাপ জিতেছে ইতালি, স্পেন, জার্মানি, ফ্রান্স ও আর্জেন্টিনা ।
তবে ব্রাজিলের পতনের গল্প পুরোপুরি সঠিক নয়। গত দুই দশকে তারা ২০০৭ ও ২০১৯ সালের কোপা আমেরিকা জিতেছে, ২০২১ সালেরানার্সআপ হয়েছে এবং ২০২২ বিশ্বকাপে অনেক পরিসংখ্যানেই অন্যতম সেরা আক্রমণাত্মক দল ছিল। নেইমার, ভিনিসিউস জুনিয়র, রদ্রিগো, রাফিনহার মতো প্রতিভারও অভাব নেই।
তাই আসল প্রশ্ন ব্রাজিল খারাপ কি না, সেটি নয়। প্রশ্ন হলো যে দেশ ফুটবলকে শিল্পে পরিণত করেছিল, তারা কি আবার সেইশিল্পীসত্তাকে ফিরে পাবে? ট্রফি হয়তো একদিন আসবে, কিন্তু ফুটবল বিশ্ব এখনও অপেক্ষা করে সেই পুরোনো দৃশ্যের জন্য বল পায়েনাচবে ব্রাজিল, আর ফিরে আসবে হারিয়ে যাওয়া ‘জোগা বনিতো’র সাম্বার সুর।