স্পোর্টস ডেস্ক
১৮ জুন ২০২৬, ০১:৩২ এএম
বিশ্বকাপের মঞ্চে কিছু রাত শুধু ফুটবলের নয়, ইতিহাসেরও। হিউস্টনের আলো ঝলমলে রাতে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো যখন নিজের ক্যারিয়ারে আরেকটি অনন্য অধ্যায় যোগ করলেন, তখনই ডিআর কঙ্গো জানিয়ে দিল তারা কেবল দর্শক হয়ে আসেনি। পর্তুগালের নিয়ন্ত্রণে শুরু হওয়া ম্যাচটি প্রথমার্ধের শেষ মুহূর্তে নাটকীয় মোড় নেয়, আর তাতেই নতুন রোমাঞ্চ পায় গ্রুপ ‘কে’র লড়াই। শেষ পর্যন্ত অঘটনে গল্প লেখা ২০২৬ বিশ্বকাপে- ৯০ মিনিটের লড়াই শেষে আরেকটি ড্র ম্যাচের অঘটনের গল্প লেখাল আফ্রিকার দেশটি।
মানচিত্রে স্পেন আর পর্তুগালের অবস্থান একেবারে পাশাপাশি। প্রতিবেশী দুই দেশ যে বিশ্বকাপের শুরুতে একেবারে একইরকমভাবে ধাক্কা খাবে, সেটা বোধহয় কল্পনাই করতে পারেনি কেউ। কয়েকদিন আগে পুঁচকে কেপ ভার্দের কাছে আটকে গিয়েছিল ইউরোপসেরা স্পেন। এবার ডিআর কঙ্গোর বিরুদ্ধে এগিয়ে থেকেও ১-১ সমতা নিয়ে পয়েন্ট খোয়াতে হয় পর্তুগালের।
এদিন বিশ্বকাপে ষষ্ঠবারের মতো মাঠে নেমে রোনালদো স্পর্শ করেন নতুন উচ্চতা। ৪১ বছর বয়সে তিনি শুধু লিওনেল মেসির সঙ্গে বিশ্বকাপে ছয় আসরে খেলার রেকর্ডে ভাগ বসাননি, ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি বয়সী আউটফিল্ড ফুটবলার হিসেবেও নাম লেখান।
তবে ম্যাচের শুরুর আলোটা ছিল জোয়াও নেভেসের ওপর। ষষ্ঠ মিনিটেই পেদ্রো নেতোর নিখুঁত ক্রস থেকে দারুণ হেডে পর্তুগালকে এগিয়ে দেন তরুণ মিডফিল্ডার। বল চলে যায় গোলের দূর কোণে, গোলরক্ষকের কিছুই করার ছিল না।
এই গোলের মাধ্যমে পর্তুগিজ ফুটবলেও একটি নতুন অধ্যায় যোগ করেন নেভেস। বিশ্বকাপের মঞ্চে দেশের হয়ে সবচেয়ে কম বয়সী সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার হিসেবে শুরু করার পর তিনি হয়ে যান পর্তুগালের তৃতীয় সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতা। তার আগে আছেন কেবল ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ও গনসালো রামোস।
গোলের পর ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের দখলে নেয় পর্তুগাল। প্রথমার্ধের বড় একটি সময় তারা প্রায় ৮০ শতাংশ বল নিজেদের কাছে রাখে। তবে আধিপত্য থাকলেও গোলমুখে খুব বেশি কার্যকর হতে পারেনি রবের্তো মার্তিনেজের দল। বেশ কয়েকটি সম্ভাবনাময় আক্রমণ তৈরি হলেও শেষ স্পর্শের অভাবে ব্যবধান বাড়ানো হয়নি।
রোনালদোও সুযোগ পেয়েছিলেন। জোয়াও কানসেলোর নিচু ক্রসে তিনি গোলের সামনে ছুটে গেলেও বল তার নাগালের একটু বাইরে চলে যায়। অন্যদিকে নুনো মেন্দেস, ব্রুনো ফার্নান্দেস ও বের্নার্দো সিলভার সমন্বয়ে কয়েকবার কঙ্গোর রক্ষণে চাপ তৈরি হলেও দ্বিতীয় গোল আসেনি।
ধীরে ধীরে সাহসী হয়ে ওঠে ডিআর কঙ্গো। শুরুতে নিজেদের অর্ধে সীমাবদ্ধ থাকলেও সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আক্রমণে ওঠার চেষ্টা বাড়ায় তারা। এদো কায়েম্বের দূরপাল্লার শট ছিল তাদের প্রথম উল্লেখযোগ্য হুমকি, যা দলের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়।
প্রথমার্ধের শেষদিকে ম্যাচের গতি বদলাতে শুরু করে। কঙ্গোর খেলোয়াড়রা আরও উঁচুতে উঠে প্রেসিং করতে থাকে, আর পর্তুগালের আক্রমণও কিছুটা ছন্দ হারায়। সেই পরিবর্তনের পুরস্কার আসে যোগ করা সময়ে।
একটি ছোট কর্নার থেকে তৈরি হওয়া আক্রমণে পর্তুগালের রক্ষণে দেখা দেয় সমন্বয়ের ঘাটতি। সেই সুযোগ লুফে নেন ইয়োয়ান উইসা। বক্সের ভেতর ফাঁকা জায়গা পেয়ে দুর্দান্ত এক হেডে বল জড়িয়ে দেন জালে। গোলরক্ষকের নাগালের বাইরে চলে যাওয়া সেই শট ডিআর কঙ্গোকে সমতায় ফেরায়।
গোলটির গুরুত্ব ছিল আরও বেশি। ৫২ বছর পর বিশ্বকাপে ডিআর কঙ্গোর প্রথম গোল এটি। আর তাতে লেখা হয় ইতিহাস। দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে দলকে নতুন উদ্দীপনা এনে দেয় উইসার এই হেড।
বিরতিতে যাওয়ার সময় স্কোরলাইন ১-১। বলের দখল ও পরিসংখ্যান পর্তুগালের পক্ষে থাকলেও ডিআর কঙ্গো দেখিয়েছে লড়াইয়ের মানসিকতা। রোনালদোর রেকর্ডগড়া রাতে তাই দ্বিতীয়ার্ধের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে আরও উন্মুক্ত, আরও উত্তেজনাপূর্ণ এক লড়াই।
ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধেও পর্তুগাল আগের মতোই আক্রমণে তীব্র ছিল। হেড কোচ রবার্তো মার্তিনেজ কনসিসেওকে নামিয়ে গোল করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু বাইসাইকেল কিকে গোলটি অফসাইডের কারণে বাতিল হয়। ৬৫ মিনিটের পর রোনলদো আরও বেশি আগ্রাসী হয়ে গোলের জন্য চেষ্টা চালালেও, তাঁর পা থেকে কোনো শটই লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়নি।। অপরদিকে কঙ্গোও রক্ষণভাগে শক্ত অবস্থান নিয়ে কয়েকবার আক্রমণ চালিয়েছিল, তবে গোল করতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত ১-১ সমতায় মাঠ ছাড়তে হয় দুই দলকে।তাতে কঙ্গো তাদের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে পয়েন্ট অর্জন করল।