images

স্পোর্টস / ফুটবল

প্রিয় দলের টানে রাতজাগা বাংলাদেশি সমর্থকেরা

১৬ জুন ২০২৬, ০৩:৪৬ পিএম

ঘড়ির কাঁটায় রাত সাড়ে তিনটা। চারপাশ যখন নিস্তব্ধ, তখনো এ শহরের হাজারো চোখে ঘুমের লেশমাত্র নেই। নিঝুম শহরের সিংহভাগ মানুষ যখন গভীর ঘুমে মগ্ন, তখনও কোনো বাসার ড্রয়িংরুমের টেলিভিশন, গলির মোড়ের চায়ের দোকান কিংবা বেডরুমে শুয়ে থাকা কারও হাতের মুঠোয় মোবাইলের পর্দায় জ্বলজ্বল করছে তীব্র উত্তেজনা। কারণ আর মাত্র কয়েক মিনিট, এরপরই বিশ্বমঞ্চে নামবে প্রিয় দল- হোক তা ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা কিংবা পর্তুগাল। কিন্তু ম্যাচ শেষের আনন্দের পরই শুরু হয় আরেকটি লড়াই- অপূর্ণ ঘুম নিয়ে নতুন দিনের দায়িত্ব পালন। প্রিয় দলের খেলা দেখতে হলে লড়তে হয় ঘুমের সঙ্গেও। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের ভিন্ন টাইমজোন দেশের ফুটবলপ্রেমীদের সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে এমনই এক ‘ঘুমহীন’ মধুর বাস্তবতা।

২০১৮ কিংবা ২০২২ সালের বিশ্বকাপে বাংলাদেশের দর্শকরা তুলনামূলকভাবে বেশি সুবিধাজনক সময়ে অনেক ম্যাচ দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু উত্তর আমেরিকার মাটিতে আয়োজিত ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সময়সূচি বাংলাদেশের সমর্থকদের জন্য নিয়ে এসেছে ভিন্ন এক চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ সময় ভোর ৪টা কিংবা ৫টায় অন্যদিকে মাঝরাতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে কয়েকটি হাই-ভোল্টেজ ম্যাচ। উত্তর আমেরিকা ও বাংলাদেশের প্রায় ১০–১১ ঘণ্টার সময়ের পার্থক্যের কারণে বিশ্বকাপের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ দেখতে দর্শকদের কাটাতে হচ্ছে নির্ঘুম রাত।

বিশেষ করে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, স্পেন, ফ্রান্সের মতো জনপ্রিয় দলগুলোর ম্যাচের সময় অনেক সমর্থকের জন্য হয়ে উঠেছে দুশ্চিন্তার কারণ। চার বছর অপেক্ষার পর আসা বিশ্বকাপ মিস করতে চান না তারা, আবার রাত জেগে খেলা দেখার প্রভাব পড়ছে পরদিনের স্বাভাবিক জীবনে।

a67bd49f-96a6-4917-9bdc-1bf4a657da65

বাংলাদেশের মানুষের কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয় দলগুলোর একটি ব্রাজিলের ম্যাচও রয়েছে ঘুম ভাঙার কঠিন সময়ে। গ্রুপ পর্বে মরক্কোর বিপক্ষে তাদের প্রথম ম্যাচ বাংলাদেশ সময় ভোর ৪টায় অনুষ্ঠিত হয়েছে। আবার স্কটল্যান্ডের বিপক্ষেও মাঠে নামবে একই সময়ে। আর্জেন্টিনার অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ম্যাচও শুরু হবে ভোর ৪টায়। অন্যদিকে পর্তুগালের ম্যাচগুলো তুলনামূলক সুবিধাজনক সময়ে, রাত ১১টায় হলেও অন্যান্য শক্তিশালী দলের একাধিক ম্যাচ রাত ১টা, ৪টা কিংবা ভোরের দিকে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

সকালে অফিসগামী চাকরিজীবীর জন্য রাত ৪টার ম্যাচ মানে চোখে ঘুম নিয়েই কর্মস্থলে যাওয়া। দোকানদারের জন্য ম্যাচ শেষ করেই দিনের ব্যবসার প্রস্তুতি নেওয়া। রিকশাচালকের ক্ষেত্রে কয়েক ঘণ্টার কম ঘুম মানে সারাদিনের শারীরিক পরিশ্রম আরও কঠিন হয়ে ওঠা। আর শিক্ষার্থীদের অনেকেই ক্লাসে গিয়ে লড়ছেন মনোযোগের সংকটের সঙ্গে।

ffccbd85-552b-4e4b-93d6-7f5e5682ffcd

রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী আশিক রহমান বলেন, ‘ব্রাজিলের খেলা চার বছর পর আসে। তাই না দেখে থাকা যায় না। কিন্তু ভোরে খেলা দেখে অফিসে গিয়ে কাজ করাটাও খুব কঠিন।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু বকর বলেন, ‘বিশ্বকাপ একটা উৎসবের মতো। বন্ধুদের সঙ্গে রাত জেগে খেলা দেখি। কিন্তু পরদিন সকালবেলার ক্লাসে মনোযোগ ধরে রাখা সত্যিই চ্যালেঞ্জিং হয়ে যায়।’

তবে ঘুমহীন এসব রাতের ক্লান্তির মাঝেও কমেনি ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা। অনেকেই আগে থেকেই দিনের কাজের পরিকল্পনা বদলাচ্ছেন। কেউ বিকেলে কিছুটা ঘুমিয়ে নিচ্ছেন, কেউ রাত জাগার সঙ্গী করছেন চা বা কফিকে। ফুটবল বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বকাপের আসল সৌন্দর্য শুধু মাঠের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি কোটি মানুষের আবেগ ও জীবনযাপনের অংশ। তাই ঘুমের সঙ্গে আপস করেও প্রিয় দলের জার্সি গায়ে সমর্থকেরা বসে থাকেন টেলিভিশনের সামনে।

মাঠে ৯০ মিনিট লড়াই করেন ফুটবল তারকারা। আর হাজার মাইল দূরে বাংলাদেশের সমর্থকেরা লড়াই করেন ঘুমের সঙ্গে। ক্লান্ত চোখ, ঝিম ধরা সকাল- সবকিছুর পরও প্রিয় দলের একটিমাত্র গোলের উল্লাসেই যেন ভুলে যান রাতভর জেগে থাকার সব কষ্ট।