স্পোর্টস ডেস্ক
১১ জুন ২০২৬, ০৬:০০ পিএম
ফুটবল বিশ্বকাপের বিশ্বজনীন আবেদন আর রোমাঞ্চের কোনো তুলনা হয় না। গত এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চলা এই মহোৎসবে এমন কিছু জাদুকরী মুহূর্ত তৈরি হয়েছে, যা ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে চিরদিনের জন্য দাগ কেটে গেছে। এর মধ্যে ফ্রি-কিক থেকে আসা গোলগুলোর সৌন্দর্য ও উত্তেজনা সম্পূর্ণ আলাদা। নিখুঁত বাঁক, অবিশ্বাস্য গতি আর রক্ষণভাগের মানবদেওয়ালকে ফাঁকি দিয়ে বল জালে জড়ানোর সেই দৃশ্যগুলো গ্যালারিতে এনে দেয় এক তীব্র উন্মাদনা।
ইতিহাসের পাতা ঘেঁটে বিশ্বকাপের মঞ্চে হওয়া এমন ১০টি সেরা ও অবিস্মরণীয় ফ্রি-কিক গোলের বিশ্লেষণ নিচে দেওয়া হলো, যেখানে গোলগুলোর নান্দনিকতার পাশাপাশি ম্যাচের প্রেক্ষাপটে সেগুলোর গুরুত্বও ফুটিয়ে তোলা হয়েছে:
রবার্তো কার্লোস বনাম চীন (২০০২)
ব্রাজিলের ২০০২ সালের পঞ্চম বিশ্বকাপ জয়ের মিশনের গ্রুপ পর্বে প্রতিপক্ষ ছিল চীন। ম্যাচের ১৫তম মিনিটে ফুটবলবিশ্ব প্রত্যক্ষ করে ‘ফিজিক্সের সূত্রকে বুড়ো আঙুল দেখানো’ লেফট-ব্যাক রবার্তো কার্লোসের সেই বিখ্যাত ট্রেডমার্ক ফ্রি-কিক। চীনের রক্ষণভাগের তৈরি দেয়ালকে পাশ কাটিয়ে অবিশ্বাস্য গতিতে ধেয়ে যাওয়া বলটি পোস্টের বাঁ দিক দিয়ে জালে জড়ায়। কার্লোসের এই গোলটিই সে ম্যাচে সেলেসাওদের ৪-০ ব্যবধানের বিশাল জয়ের পথ সুগম করেছিল যা তাদের নকআউটে যাওয়ার আত্মবিশ্বাস জোগায়।

রোনালদিনহো বনাম ইংল্যান্ড (২০০২)
২০০২ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল দুই পরাশক্তি ব্রাজিল ও ইংল্যান্ড। ইংল্যান্ড প্রথমে এগিয়ে গেলেও রিভালদোর গোলে সমতায় ফেরে ব্রাজিল। ম্যাচের ৫০তম মিনিটে আসে সেই ঐতিহাসিক মোড় পরিবর্তনকারী মুহূর্ত। প্রায় ৩৫ গজ দূর থেকে রোনালদিনহো এক লফটেড বা ভাসানো ফ্রি-কিক নেন। শটটি ক্রস মনে করে ইংলিশ গোলরক্ষক ডেভিড সিম্যান কিছুটা সামনে এগিয়ে এসেছিলেন, কিন্তু বলটি সবাইকে বোকা বানিয়ে বাঁক খেয়ে একেবারে টপ লেফট কর্নার দিয়ে জালে ঢুকে যায়। সিম্যান কেবল চেয়ে চেয়ে দেখলেন। এই জাদুকরী গোলেই ব্রাজিল ২-১ ব্যবধানে জিতে সেমিফাইনালে ওঠে।

ডিয়েগো ফরলান বনাম ঘানা (২০১০)
২০১০ বিশ্বকাপের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ম্যাচ ছিল উরুগুয়ে বনাম ঘানার কোয়ার্টার ফাইনাল। প্রথমার্ধের শেষে ঘানা এগিয়ে যাওয়ার পর ৫৫তম মিনিটে উরুগুয়ে মাঠের বাঁ দিকে একটি ফ্রি-কিক পায়। জাবুলানি বলের ওপর দারুণ নিয়ন্ত্রণ রাখা ডিয়েগো ফরলান ডান পায়ের বাঁকানো শটে ঘানার গোলরক্ষক রিচার্ড কিংস্টনকে পরাস্ত করে টপ রাইট কর্নারে বল পাঠান। ১-১ সমতায় ফেরার পর ম্যাচটি টাইব্রেকারে গড়ায় এবং উরুগুয়ে সেমিফাইনালের টিকিট কাটে। (অবশ্য লুইস সুয়ারেজের সেই লাল কার্ডের ঘটনার জন্য ম্যাচটি আলাদাভাবে স্মরণীয়!)

কেইসুকে হোন্ডা বনাম ডেনমার্ক (২০১০)
দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে ডেনমার্কের বিরুদ্ধে জাপানের কেইসুকে হোন্ডার ফ্রি-কিকটি ছিল দেখার মতো। ম্যাচের ১৭তম মিনিটে গোলপোস্ট থেকে প্রায় ৩৫ গজ দূরে ডান প্রান্তে ফ্রি-কিক পায় ব্লু সামুরাইরা। অ্যাঙ্গেল বা কোণটি এতটাই কঠিন ছিল যে সেখান থেকে সরাসরি গোল করা অসম্ভব মনে হচ্ছিল। কিন্তু হোন্ডা প্রচণ্ড শক্তি ও নিখুঁত নিশানায় বলটি ডেনিশ দেয়ালের ওপর দিয়ে পোস্টের বাঁ প্রান্ত দিয়ে জালে জড়ান। এই গোলটির ওপর ভর করে জাপান ৩-১ ব্যবধানে জিতে গ্রুপ রানার্স-আপ হয়ে নকআউটে পা রাখে।

লিওনেল মেসি বনাম নাইজেরিয়া (২০১৪)
২০১৪ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল আর্জেন্টিনা ও নাইজেরিয়া। ম্যাচের শুরুতেই ৪ মিনিটের মধ্যে খেলা ১-১ সমতায় চলে আসে। প্রথমার্ধের ঠিক শেষ মুহূর্তে যখন মনে হচ্ছিল ম্যাচটি ড্র অবস্থায় বিরতিতে যাবে, তখনই নিজের জাদু দেখান লিওনেল মেসি। বক্সের সামান্য বাইরে থেকে বাঁ পায়ের মাপা শটে নাইজেরিয়ান গোলরক্ষককে কোনো সুযোগ না দিয়ে বলটি টপ লেফট কর্নারে জড়িয়ে দেন এলএম১০। ম্যাচটি আর্জেন্টিনা ৩-২ ব্যবধানে জেতে এবং এই জয়টি তাদের ফাইনাল পর্যন্ত যাওয়ার যাত্রায় বড় টনিক হিসেবে কাজ করেছিল।

ডেভিড লুইজ বনাম কলম্বিয়া (২০১৪)
ব্রাজিল বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল দুই লাতিন পরাশক্তি ব্রাজিল ও কলম্বিয়া। থিয়াগো সিলভার গোলে স্বাগতিক ব্রাজিল ১-০ তে এগিয়ে থাকার পর, ৬৯তম মিনিটে প্রায় ৩০ গজ দূর থেকে ডিফেন্ডার ডেভিড লুইজ এক রকেট গতির লং-রেঞ্জ ফ্রি-কিক নেন। বলটি বাতাসে ভাসতে ভাসতে ডান দিকের টপ কর্নারে আছড়ে পড়ে এবং ব্রাজিল ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায়। পরবর্তীতে কলম্বিয়া একটি গোল শোধ করলেও লুইজের এই দুর্দান্ত গোলটির কারণেই ব্রাজিল সেমিফাইনালে কোয়ালিফাই করতে পেরেছিল।

ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো বনাম স্পেন (২০১৮)
রাশিয়া বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের উদ্বোধনী ম্যাচেই স্পেন ও পর্তুগাল উপহার দিয়েছিল এক ক্লাসিক থ্রিলার। ম্যাচের ৮৬ মিনিট পর্যন্ত স্পেন ৩-২ ব্যবধানে এগিয়ে ছিল এবং পর্তুগালের হার যখন সময়ের ব্যাপার মনে হচ্ছিল, তখনই ত্রাতা হয়ে আসেন সিআর সেভেন। ৮৭তম মিনিটে বক্সের ঠিক বাইরে সেন্ট্রাল পজিশন থেকে রোনালদোর নেওয়া ‘নাকলবল’ ফ্রি-কিকটি স্প্যানিশ গোলরক্ষক ডেভিড ডি হেয়াকে পুরোপুরি স্তব্ধ করে দিয়ে টপ রাইট কর্নার দিয়ে জালে প্রবেশ করে। হ্যাটট্রিক পূর্ণ করার পাশাপাশি দলকে ৩-৩ গোলের নাটকীয় ড্র এনে দেন রোনালদো।

টনি ক্রুস বনাম সুইডেন (২০১৮)
২০১৮ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে সুইডেনের বিপক্ষে জার্মানির বিদায়ঘণ্টা বাজার উপক্রম হয়েছিল। ৯৫তম মিনিটেও ম্যাচটি ১-১ সমতায় ছিল এবং টুর্নামেন্টে টিকে থাকতে জার্মানির জয় অলিখিত বাধ্যতামূলক ছিল। ঠিক তখন বক্সের বাঁ কোণে একটি ফ্রি-কিক পায় চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। টনি ক্রুস বলটি আলতো করে মার্কো রয়েসকে পাস দিয়ে কোণ তৈরি করে নেন এবং ডান পায়ের এক অবিশ্বাস্য বাঁকানো শটে ফার-পোস্ট দিয়ে বল জালে জড়ান। শেষ মুহূর্তের এই গোলে জার্মানি ৩ পয়েন্ট পেলেও দুর্ভাগ্যবশত তারা নকআউটে যেতে পারেনি।

কিরান ট্রিপিয়ার বনাম ক্রোয়েশিয়া (২০১৮)
রাশিয়া বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার মুখোমুখি হয়েছিল ইংল্যান্ড। ম্যাচের মাত্র ৫ম মিনিটে বক্সের ঠিক বাইরে ফ্রি-কিক পায় থ্রি লায়ন্সরা। ইংল্যান্ডের ফ্রি-কিক স্পেশালিস্ট কিরান ট্রিপিয়ার মানবদেওয়ালের ওপর দিয়ে দারুণ দক্ষতায় বলটি টপ কর্নারে পাঠিয়ে দেন, যেখানে ক্রোয়াট গোলরক্ষকের কিছুই করার ছিল না। এই গোলে ইংল্যান্ড ১-০ তে এগিয়ে গিয়ে ফাইনালের স্বপ্ন দেখতে শুরু করলেও, অতিরিক্ত সময়ে ২-১ ব্যবধানে হেরে শেষ পর্যন্ত ইংলিশদের হৃদয় আবারও ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।

মার্কাস র্যাশফোর্ড বনাম ওয়েলস (২০২২)
কাতার বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের এই ব্রিটিশ ডার্বিতে প্রথমার্ধ গোলশূন্য ড্র থাকার পর দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই ডেডলক ভাঙেন মার্কাস র্যাশফোর্ড। ৫০তম মিনিটে বক্সের বাঁ দিক থেকে র্যাশফোর্ডের নেওয়া জোরালো ও বাঁকানো ফ্রি-কিকটি ওয়েলসের গোলরক্ষক ড্যানি ওয়ার্ডকে সম্পূর্ণ পরাস্ত করে টপ রাইট কর্নার দিয়ে জালে জড়ায়। এই গোলের পর ওয়েলস মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে এবং ইংল্যান্ড সহজেই ৩-০ ব্যবধানের বড় জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে।

বিশ্বকাপের ইতিহাসজুড়ে হওয়া এই ১০টি ফ্রি-কিক গোল কেবল স্কোরলাইনেই অবদান রাখেনি বরং গোলগুলো জাদুকরী শৈলী ও ম্যাচ ডমিনেশনের কারণে ফুটবল ইতিহাসের টাইমক্যাপসুলে চিরদিনের জন্য অমর হয়ে রয়েছে।