স্পোর্টস ডেস্ক
১১ জুন ২০২৬, ০৬:৪৬ এএম
ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই তারকাদের মহামঞ্চ। একসময় এই মঞ্চ শাসন করেছেন পেলে, ম্যারাডোনা, জিদান কিংবা রোনালদো নাজারিও। গত দুই দশকে সেই আলো পুরোপুরি ভাগ করে নিয়েছেন দুই মহাতারকা লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপের দুয়ারে দাঁড়িয়ে ফুটবল বিশ্ব নতুন এক প্রশ্নের মুখোমুখি। এই মঞ্চ কি এখন ধীরে ধীরে কিলিয়ান এমবাপের হাতে চলে যাচ্ছে? একদিকে ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ খেলতে নামছেন মেসি ও রোনালদো। অন্যদিকে নিজের সেরা সময়ের মধ্যে থাকা এমবাপে প্রস্তুত আরও বড় কিছু অর্জনের জন্য। ফলে এবারের বিশ্বকাপ শুধু শিরোপার লড়াই নয়, বরং ফুটবল বিশ্বের নেতৃত্ব বদলের গল্পও।
দর্শকদের হৃদয়ে এখনো মেসির জাদু
বিশ্বকাপ শুরুর আগেই টিকিট বিক্রির পরিসংখ্যান একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে, মেসির জনপ্রিয়তা এখনো আকাশচুম্বী। আর্জেন্টিনার গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলোর টিকিট সবচেয়ে দ্রুত বিক্রি হয়ে গেছে। ফুটবলপ্রেমীদের বড় একটি অংশ হয়তো শেষবারের মতো বিশ্বকাপের মঞ্চে মেসিকে দেখার সুযোগ হাতছাড়া করতে চাননি। যুক্তরাষ্ট্রে ইন্টার মায়ামির হয়ে খেলার কারণে স্থানীয় দর্শকদের মধ্যেও তার জনপ্রিয়তা বেড়েছে কয়েক গুণ। তবে পর্তুগাল ও ফ্রান্সের ম্যাচগুলোর চাহিদাও ছিল ব্যাপক, যা রোনালদো ও এমবাপের বৈশ্বিক আবেদনকেই সামনে নিয়ে আসে।
বিশ্বকাপের মঞ্চে সবচেয়ে ভয়ংকর এমবাপে
পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্বকাপে সবচেয়ে কার্যকর আক্রমণভাগের খেলোয়াড় বর্তমানে এমবাপে। মাত্র দুটি বিশ্বকাপ খেলেই তিনি ১২ গোল করেছেন, যা রোনালদোর বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের মোট গোলসংখ্যার চেয়েও বেশি। অন্যদিকে মেসির রেকর্ড ছুঁতে তার প্রয়োজন মাত্র একটি গোল। বিশ্বকাপের বড় ম্যাচে পারফর্ম করার ক্ষমতা ইতোমধ্যে প্রমাণ করেছেন ফরাসি এই ফরোয়ার্ড। ২০১৮ সালে বিশ্বকাপ জয় এবং ২০২২ সালের ফাইনালে হ্যাটট্রিক তাকে আধুনিক ফুটবলের অন্যতম বড় ম্যাচ উইনার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
জনপ্রিয়তার রাজা এখনো রোনালদো
মাঠের বাইরে জনপ্রিয়তার বিচারে এখনো বাকিদের অনেক ওপরে অবস্থান করছেন রোনালদো। গুগলে সবচেয়ে বেশি খোঁজা ক্রীড়াবিদদের তালিকায় দীর্ঘদিন ধরেই শীর্ষে রয়েছেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তার আধিপত্য স্পষ্ট। ইনস্টাগ্রামে ৬৬ কোটির বেশি অনুসারী নিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রীড়াবিদ রোনালদোই। মেসি দ্বিতীয় স্থানে থাকলেও অনুসারীর সংখ্যায় তার সঙ্গে পার্থক্য অনেক। আর এমবাপে জনপ্রিয় হলেও এখনো দুই কিংবদন্তির তৈরি করা বিশাল ডিজিটাল সাম্রাজ্যের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারেননি।
অর্থের খেলায়ও এগিয়ে পর্তুগিজ মহাতারকা
বিশ্ব ফুটবলে সবচেয়ে বেশি আয় করা খেলোয়াড়দের তালিকায়ও শীর্ষে রয়েছেন রোনালদো। সৌদি আরবের ক্লাব ফুটবলে যোগ দেওয়ার পর তার আয় নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। বেতন, বাণিজ্যিক চুক্তি এবং ব্যক্তিগত ব্র্যান্ড মূল্য মিলিয়ে তিনি এখনো ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় আর্থিক শক্তি। মেসি ও এমবাপেও বিপুল আয় করেন, তবে বাণিজ্যিক বাজারে রোনালদোর প্রভাব এখনো আলাদা মাত্রার।
বর্তমান ফুটবলের মুখ এমবাপে
তবে বর্তমান পারফরম্যান্সের বিচারে আলোটা ক্রমেই এমবাপের দিকে সরে যাচ্ছে। রিয়াল মাদ্রিদের জার্সিতে নিয়মিত গোল করছেন তিনি। ইউরোপের সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লিগে নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছেন। বয়স, গতি, ধারাবাহিকতা এবং বড় ম্যাচে প্রভাব—সব দিক থেকেই তিনি আগামী এক দশকের ফুটবলের সবচেয়ে বড় মুখ হওয়ার পথে এগিয়ে আছেন। বিশ্ব ফুটবলের বড় বড় ব্র্যান্ডও ইতোমধ্যে এমবাপেকে ভবিষ্যতের প্রধান বাণিজ্যিক সম্পদ হিসেবে দেখতে শুরু করেছে।
শেষ বিশ্বকাপ বনাম নতুন যুগের সূচনা
২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে আবেগঘন দিক সম্ভবত এটাই। একদিকে মেসি ও রোনালদোর মতো কিংবদন্তিদের বিশ্বকাপ যাত্রার শেষ অধ্যায়, অন্যদিকে এমবাপের মতো তারকার জন্য নতুন যুগের দরজা। ফুটবলের ইতিহাসে প্রজন্ম বদলের মুহূর্তগুলো সবসময়ই বিশেষ। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। হয়তো বিশ্বকাপ শেষে শিরোপা, গোল কিংবা ব্যক্তিগত অর্জনের বাইরে সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হবে একটি প্রশ্ন ফুটবল বিশ্বের সিংহাসন কি এখনো মেসি-রোনালদোর দখলে, নাকি নতুন রাজা হিসেবে নিজের জায়গা পাকা করে ফেলেছেন কিলিয়ান এমবাপে? ২০২৬ বিশ্বকাপ সেই উত্তর খুঁজে পাওয়ার সবচেয়ে বড় মঞ্চ।