স্পোর্টস ডেস্ক
১০ জুন ২০২৬, ০৭:৫১ পিএম
ফুটবল বিশ্বকাপ শুধু ট্রফি জয়ের গল্প নয়, এটি অপূর্ণ স্বপ্ন, ব্যর্থতা, হতাশা এবং আক্ষেপেরও ইতিহাস। প্রতি চার বছর পরপর বিশ্বের সেরা ফুটবলাররা নিজেদের দেশের জার্সি গায়ে চড়িয়ে মাঠে নামেন একটি মাত্র লক্ষ্য নিয়ে বিশ্বকাপ জয়। কিন্তু ইতিহাস বলে, সব মহান ফুটবলারের ভাগ্যে সেই সোনালি ট্রফি ছুঁয়ে দেখা জোটে না। কেউ বিশ্বকাপের ফাইনালে গিয়েও খালি হাতে ফিরেছেন, কেউ আবার বারবার চেষ্টা করেও শিরোপার নাগাল পাননি। অথচ ক্লাব ফুটবলে তাদের অর্জনের তালিকা এতটাই সমৃদ্ধ যে ফুটবল ইতিহাসে তারা চিরকাল রাজা হিসেবেই স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। বিশ্বকাপের মঞ্চে সেই মুকুটহীন রাজাদের গল্প আজও ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে এক গভীর আক্ষেপ হয়ে বেঁচে আছে।
ফুটবল ইতিহাসে মুকুটহীন রাজাদের তালিকায় সবার আগে উচ্চারিত হয় নেদারল্যান্ডসের কিংবদন্তি ইয়োহান ক্রুইফের নাম। আধুনিক ফুটবলের অন্যতম স্থপতি হিসেবে বিবেচিত এই মহাতারকা ১৯৭৪ বিশ্বকাপে পুরো পৃথিবীকে মুগ্ধ করেছিলেন। তার নেতৃত্বে নেদারল্যান্ডস খেলেছিল নান্দনিক ও বিপ্লবী ফুটবল। সেই দলকে অনেকেই ইতিহাসের অন্যতম সেরা দল বলে মনে করেন। কিন্তু ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির কাছে পরাজিত হয়ে স্বপ্নভঙ্গ হয় ক্রুইফের। ফুটবল দর্শনের পরিবর্তন ঘটিয়েও বিশ্বকাপ ট্রফি ছুঁতে না পারার আক্ষেপ তাকে সারাজীবন তাড়া করে বেড়িয়েছে।
বিশ্বকাপ না জেতা আরেক কিংবদন্তি হলেন ফেরেঙ্ক পুসকাস। হাঙ্গেরির এই কিংবদন্তি ফুটবলারকে অনেকেই সর্বকালের সেরা গোলদাতাদের একজন মনে করেন। ১৯৫৪ বিশ্বকাপে তার নেতৃত্বে হাঙ্গেরি ছিল অপ্রতিরোধ্য। পুরো টুর্নামেন্টে দাপট দেখিয়ে ফাইনালে পৌঁছেছিল তারা। কিন্তু ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির কাছে অবিশ্বাস্যভাবে হেরে যায় হাঙ্গেরি। সেই ম্যাচ আজও "বার্নের বিস্ময়" নামে পরিচিত। পুসকাসের মতো একজন কিংবদন্তির ক্যারিয়ারে বিশ্বকাপ না থাকা ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বড় আক্ষেপ।

ফরাসি তারকা মিশেল প্লাতিনির নামও এই তালিকায় উজ্জ্বলভাবে লেখা আছে। আশির দশকে ইউরোপীয় ফুটবলে তার আধিপত্য ছিল চোখে পড়ার মতো। অসাধারণ পাস, দূরদর্শিতা এবং গোল করার ক্ষমতা তাকে কিংবদন্তির মর্যাদা দিয়েছে। কিন্তু বিশ্বকাপের মঞ্চে তিনি কখনও শিরোপা জিততে পারেননি। ১৯৮২ এবং ১৯৮৬ বিশ্বকাপে ফ্রান্সকে অনেক দূর নিয়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত স্বপ্ন পূরণ হয়নি।
আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকারদের একজন রোনালদো নাজারিও বিশ্বকাপ জিতেছিলেন, কিন্তু তার স্বদেশি জিকোর ভাগ্যে সেই সুখ জোটেনি। আশির দশকের ব্রাজিল দলকে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা দল বলা হয়। জিকো, সক্রেটিস, ফ্যালকাওদের নিয়ে গড়া সেই দল নান্দনিক ফুটবলের প্রতীক ছিল। কিন্তু শিরোপা তাদের অধরাই থেকে যায়। আজও অনেক ফুটবলপ্রেমী মনে করেন, জিকোর মতো প্রতিভাবান একজন খেলোয়াড়ের বিশ্বকাপ না জেতা ফুটবলের অন্যতম বড় অবিচার।

ইতালির রবার্তো বাজ্জিওর গল্প আরও বেদনাদায়ক। ১৯৯৪ বিশ্বকাপে তার অসাধারণ নৈপুণ্যে ইতালি ফাইনালে পৌঁছেছিল। পুরো টুর্নামেন্টে তিনি ছিলেন দলের প্রাণভোমরা। কিন্তু ফাইনালের টাইব্রেকারে তার নেওয়া শট ক্রসবারের ওপর দিয়ে চলে যায়। সেই মুহূর্তেই বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন ভেঙে যায় ইতালির। বাজ্জিওর মাথা নিচু করে মাঠ ছেড়ে যাওয়ার দৃশ্য আজও বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্তগুলোর একটি।
নেদারল্যান্ডসের আরেক কিংবদন্তি মার্কো ফন বাস্তেনও বিশ্বকাপ শিরোপা জয়ের স্বাদ পাননি। ইউরোপীয় ফুটবলে তার গোল করার দক্ষতা ছিল অসাধারণ। চোট তার ক্যারিয়ারকে সংক্ষিপ্ত করে দেয়। ফলে বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজের সামর্থ্যের পূর্ণ প্রমাণ দেওয়ার সুযোগও তিনি পুরোপুরি পাননি।
সাম্প্রতিক সময়ে মুকুটহীন রাজাদের তালিকায় অন্যতম আলোচিত নাম ছিল ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। ক্লাব ফুটবলে অসংখ্য সাফল্য, ব্যক্তিগত পুরস্কার এবং গোলের রেকর্ড গড়লেও বিশ্বকাপ ট্রফি এখনও তার নাগালের বাইরে। একাধিক বিশ্বকাপ খেলেও তিনি পর্তুগালকে শিরোপা এনে দিতে পারেননি। ফলে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হয়েও বিশ্বকাপহীন কিংবদন্তিদের তালিকায় তার নাম আলোচিত থাকবে।

বিশ্বকাপের ইতিহাসে এমন আরও অসংখ্য নাম রয়েছে, যাদের প্রতিভা, অর্জন এবং জনপ্রিয়তা আকাশছোঁয়া হলেও বিশ্বকাপ ট্রফি তাদের হাতে ওঠেনি। জর্জ বেস্ট কখনও বিশ্বকাপ খেলতেই পারেননি। পাওলো মালদিনি, অলিভার কান, লোথার ম্যাথাউসের মতো অনেক কিংবদন্তির ক্যারিয়ারেও অপূর্ণতার গল্প রয়েছে। কেউ ফাইনালে হেরেছেন, কেউ সেমিফাইনালে থেমেছেন, কেউ আবার ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সুযোগই পাননি।
ফুটবল ইতিহাসে শিরোপাজয়ীদের নাম যেমন স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকে, তেমনি মুকুটহীন রাজাদের গল্পও সমানভাবে স্মরণীয়। কারণ ফুটবল কেবল ট্রফির হিসাব নয়; এটি প্রতিভা, সৌন্দর্য, সংগ্রাম এবং আবেগের গল্প। অনেক সময় একটি বিশ্বকাপ না জিতেও কোনো ফুটবলার কোটি মানুষের হৃদয়ে চিরস্থায়ী আসন গড়ে নেন। তাদের খেলা, তাদের অবদান এবং তাদের অসমাপ্ত স্বপ্নই ফুটবলকে আরও মানবিক ও আবেগময় করে তোলে।