স্পোর্টস ডেস্ক
১০ জুন ২০২৬, ০৭:৪২ পিএম
বিশ্ব ফুটবলের এক নতুন যুগের বার্তা নিয়ে দুয়ারে কড়া নাড়ছে ফিফা পুরুষ বিশ্বকাপ ২০২৬। কাতার বিশ্বকাপের সাফল্যের রেশ ধরে এবার উত্তর আমেরিকার তিন দেশ- যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে বসছে এই মেগা আসর। ৩২ দলের চেনা গণ্ডি পেরিয়ে এবারই প্রথম ৪৮টি দল অংশ নিতে যাচ্ছে বিশ্বমঞ্চে। আর এই বর্ধিত ফরম্যাটে বিশ্ব ফুটবল দেখছে এক অনন্য রেকর্ড- ইতিহাসের সর্বোচ্চ ১৩টি মুসলিম-প্রধান দেশ এবার একসঙ্গে বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করেছে, যা টুর্নামেন্টের ইতিহাসে অন্যতম বৈচিত্র্যময় লাইন-আপ তৈরি করেছে।
এবারের আসরে জায়গা করে নেওয়া ১৩টি মুসলিম দেশ হলো- মরক্কো, মিশর, আলজেরিয়া, সেনেগাল, তিউনিসিয়া, সৌদি আরব, কাতার, জর্ডান, ইরাক, ইরান, উজবেকিস্তান, তুরস্ক এবং বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা। মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি এই দলগুলোর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের কঠোর পরিশ্রম, তৃণমূল পর্যায়ে কাঠামোগত বিনিয়োগ এবং বিশ্বমঞ্চে নিজেদের চেনানোর এক অদম্য গল্প।
৪ দশক পর ইরাকের ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন ও অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্ক
এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম বড় এবং আবেগঘন গল্প হলো ইরাকের ফিরে আসা। দীর্ঘ ৪০ বছর পর আবারও বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে জায়গা করে নিয়েছে তারা, যা পুরো মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম বিশ্বে এক নতুন উন্মাদনা সৃষ্টি করেছে।
দলের দায়িত্ব নেওয়ার পর অস্ট্রেলিয়ান হেড কোচ গ্রাহাম আর্নল্ড বোর্ডের ওপর বড় করে লিখেছিলেন- ‘Believe’ (বিশ্বাস করো)। তিনি খেলোয়াড়দের জিজ্ঞেস করেছিলেন, তারা আসলেই বিশ্বাস করে কি না যে তারা কোয়ালিফাই করতে পারবে। কোচের সেই বিশ্বাসকে সত্য প্রমাণ করেই গত শনিবার ভোরে যুক্তরাষ্ট্রে পা রেখেছে ইরাক দল।
তবে তাদের এই আগমনে কিছুটা বিষাদের ছায় ফেলেছে শিকাগো বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। ইরাকের প্রধান তারকা ও স্ট্রাইকার আয়মেন হুসেইনকে বিমানবন্দরে প্রায় ৭ ঘণ্টা আটকে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। টুর্নামেন্টের বাকি সময়ে অন্য কোনো মুসলিম ফুটবলারকে যেন মার্কিন বিমানবন্দরগুলোতে এমন বিব্রতকর ও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে না হয়, সেটাই এখন ফুটবলপ্রেমীদের প্রত্যাশা।
২৪ বছরের খরা কাটিয়ে ফিরল শক্তিশালী তুরস্ক
দীর্ঘ ২৪ বছর অপেক্ষার পর আবারও বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করেছে ইউরোপের অন্যতম পরাশক্তি তুরস্ক। দলটির বামহাতি ফরোয়ার্ড কেনান ইলদিজ এবং অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার আরদা গুলেরের জুটি এখন প্রতিপক্ষের জন্য এক আতঙ্কের নাম। সব ধরনের প্রতিযোগিতা মিলিয়ে এই দুই তরুণের ঝুলিতে রয়েছে মোট ৪৮টি গোল। আর বাছাইপর্বের মাত্র ৬টি ম্যাচেই তুরস্ক দল ১৭টি গোল উপহার দিয়েছে দর্শকদের। ২৪ বছর আগের সেই দুর্দান্ত তুরস্কের স্মৃতি ফিরিয়ে আনতে তারা এবার মরিয়া।
মরক্কো কি পারবে কাতারের রূপকথা ধরে রাখতে?
চার বছর আগে কাতারের মাটিতে মরক্কো আফ্রিকার এবং আরব ফুটবলের ইতিহাস চিরদিনের জন্য বদলে দিয়েছিল। প্রথম আফ্রিকান ও মুসলিম দেশ হিসেবে সেমিফাইনালে উঠে বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল ‘অ্যাটলাস লায়ন্স’রা। স্পেন ও পর্তুগালের মতো ফুটবল পরাশক্তিদের হারিয়ে তাদের সেই রূপকথা আজো ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা গল্প।
ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, মরক্কোর এই উত্থান প্রমাণ করে যে ফুটবলের পরাশক্তিদের একক আধিপত্যের দিন এখন শেষ। আন্তর্জাতিক ফুটবল এখন এমন সব দেশ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে যারা পরিকল্পিতভাবে নিজেদের ফুটবল কাঠামো শক্তিশালী করেছে, কোচিংয়ের মান উন্নত করেছে এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন কৌশল গ্রহণ করেছে।

কোচ মোহাম্মদ ওয়াহবির অধীনে এবারও পোস্টের নিচে দেয়াল হয়ে দাঁড়াতে প্রস্তুত অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনো। মরক্কো এবার রয়েছে ‘গ্রুপ সি’-তে, যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ স্কটল্যান্ড, হাইতি এবং বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে সফল দল ব্রাজিল। নিউ ইয়র্কে ব্রাজিলের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়েই মরক্কো সুযোগ পাবে নিজেদের আরও একবার পরখ করে দেখার।
ফুটবল উন্মাদনায় বুঁদ সৌদি আরব এবং ২০৩৪-এর স্বপ্ন
যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে ৩২ বছর পর বিশ্বকাপ ফিরলেও, ২০৩৪ সালে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় একক ক্রীড়া যজ্ঞের আয়োজন করতে যাচ্ছে সৌদি আরব। তবে আপাতত তাদের পুরো মনোযোগ ২০২৬ বিশ্বকাপের মঞ্চে ‘গ্রিন ফ্যালকন’ হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করা।
২০২২ কাতার বিশ্বকাপে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বড় অঘটন ঘটিয়েছিল সৌদি আরব। যদিও সেই ঐতিহাসিক জয়ের পরও তারা গ্রুপ পর্ব পার হতে পারেনি। সৌদির সাধারণ মানুষের মাঝে ফুটবল নিয়ে উন্মাদনা কতটা তীব্র, তা নিয়ে আল-গামদি নামের এক নারী ভক্ত স্মৃতিচারণ করে বলেন, আর্জেন্টিনাকে হারানোর পর দেশটির বাদশাহ পরদিনই পুরো রাজ্যে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছিলেন, যা সেই জয়কে আরও স্মরণীয় করে তুলেছিল।
তিনি আরও বলেন, “সৌদি আরবের ফুটবল সংস্কৃতি সত্যিই অনন্য। ম্যাচ চলাকালীন ক্যাফে, রেস্তোরাঁ ও রাস্তাঘাটে উৎসবের আমেজ তৈরি হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে হাসপাতাল-ফার্মেসির মতো জরুরি সেবা প্রতিষ্ঠানেও কর্মকর্তা ও স্টাফদের খেলা দেখার জন্য বড় স্ক্রিনের ব্যবস্থা করা হয়। তরুণ প্রজন্ম থেকে শুরু করে বয়োবৃদ্ধ দাদি-নানিরাও সৌদির ম্যাচ নিয়ে মেতে ওঠেন। ফুটবল প্রতিটি প্রজন্মকে এক সুতোয় বেঁধে দেয়।”
পরাশক্তি সেনেগালের ‘বড় স্বপ্ন’
২০০২, ২০১৮ এবং ২০২২ সালের পর এবারও বিশ্বকাপে নিজেদের দাপট দেখাতে প্রস্তুত আফ্রিকার অন্যতম সেরা দল সেনেগাল। সাদিও মানে, মাঝমাঠের চালিকাশক্তি পাপে গেয়ি, গোলরক্ষক এদুয়ার্দ মেন্ডি এবং অভিজ্ঞ অধিনায়ক কালিদু কুলিবালির মতো তারকায় ঠাসা এই দল।
২০০২ সালে তত্কালীন ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সকে ১-০ গোলে হারিয়ে বিশ্বকে নিজেদের আগমনী বার্তা দিয়েছিল সেনেগাল। কাকতালীয়ভাবে, আগামী ১৬ জুন নিউ ইয়র্কে তাদের প্রথম ম্যাচটি আবার সেই দিদিয়ের দেশমের শক্তিশালী ফ্রান্সের বিপক্ষেই (গ্রুপ ‘I’)। দলের অধিনায়ক পাপে বুনা থিয়াও স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, “যদি সেনেগালের হয়ে বিশ্বকাপ জেতার বিশ্বাস আমি এক সেকেন্ডের জন্যও হারিয়ে ফেলি, তবে আমি নিজেই নিজের পদ থেকে ইস্তফা দেব।”

ফুটবল মাঠের এই লড়াই শুধু ট্রফি জয়ের নয়, বরং বিশ্বমঞ্চে এই দেশগুলোর সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং ফুটবলের নতুন শক্তির উত্থান জানান দেওয়ার এক মহাসুযোগ। আগামী ১১ জুন থেকে শুরু হতে যাওয়া এই ফুটবল মহাযজ্ঞে এই ১৩টি দেশ কতটা পথ পাড়ি দিতে পারে, তা দেখতে মুখিয়ে আছে পুরো বিশ্ব।
যুদ্ধ, সহিংসতা আর বৈষ্যমের উত্তরাধিকার ইরান
এবারের বিশ্বকাপে খেলবে মুসলিম বিশ্বের আরেক পরাশক্তি ইরানও। তবে মাঠের ফুটবলের লড়াই শুরুর অনেক আগে থেকেই দেশ ও জাতির জন্য লড়তে হচ্ছে ইরানিদের। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ আগ্রাসন থেমে নেই। বিশ্বকাপে তাদের খেলা নিয়েও জল ঘোলা কম হয়নি।
এসব মাথায় নিয়েই বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছে দেশটি যেখানে মার্কিন আগ্রাসন থেমে নেই। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক বৈরিতার শিকার হয়ে বিশ্বকাপ ক্যাম্প মেক্সিকোয় সরিয়ে নিয়েছে ইরান। এছাড়া ম্যাচ খেলতে ইরানি ফুটবলারদের যুক্তরাষ্ট্রে দিনে গিয়ে দিনেই ফিরে যেতে হবে- এমন কঠিন নিয়মও করেছে যুক্তরাষ্ট্র। সব মিলিয়ে বৈষম্য ও যুদ্ধের স্মৃতি মাথায় নিয়েই বিশ্বকাপে লড়বে ইরান।

এছাড়া ২০২২ বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ কাতার, মোহামেদ সালাহর মিসর, আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া, জর্ডান, উজবেকিস্তান এবং বসনিয়া ও হার্জেগোভিনাও মুসলিম প্রতিনিধিত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে।
আরএ