স্পোর্টস ডেস্ক
১০ জুন ২০২৬, ০৪:৪৫ পিএম
চার বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আবারও শুরু হতে যাচ্ছে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় মহোৎসব- ফিফা পুরুষ বিশ্বকাপ ২০২৬। তবে এবারের আসরটি শুধু একটি সাধারণ টুর্নামেন্ট নয়, বরং পরিধি, দলসংখ্যা এবং উত্তেজনার দিক থেকে ফুটবল ইতিহাসের সব রেকর্ড ভেঙে দিতে প্রস্তুত। উত্তর আমেরিকার দেশ- যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডার যৌথ আয়োজনে এবার ফুটবল বিশ্ব দেখতে যাচ্ছে এক ঐতিহাসিক মেগা আসর।
২০২৬ বিশ্বকাপ ফুটবলকে সম্পূর্ণ নতুন রূপ দিতে যাচ্ছে। এই মেগা টুর্নামেন্টের সমস্ত খুঁটিনাটি ও আকর্ষণীয় দিকগুলো চলুন জেনে নেওয়া যাক:
নতুন ফরম্যাট: ৪৮ দল ও ১০৪ ম্যাচের মহোৎসব
বিশ্বকাপের ইতিহাসে এবারই প্রথম ৩২ দলের চেনা গণ্ডি পেরিয়ে ৪৮টি দেশ মূল পর্বে অংশ নিচ্ছে। দল বাড়ার কারণে স্বাভাবিকভাবেই টুর্নামেন্টের পরিধি এবং ম্যাচের সংখ্যাও বেড়েছে। কাতার বিশ্বকাপের ৬৪টি ম্যাচের জায়গায় ৩৯ দিন জুড়ে এবার মোট ১০৪টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে।
গ্রুপ পর্বের সমীকরণেও এসেছে বড় পরিবর্তন। এবার ৪৮টি দলকে ভাগ করা হয়েছে ১২টি গ্রুপে (গ্রুপ ‘এ’ থেকে ‘এল’), যেখানে প্রতি গ্রুপে থাকছে ৪টি করে দল। এই গ্রুপগুলো থেকে প্রতি গ্রুপের শীর্ষ ২টি দল সরাসরি নকআউট পর্বে চলে যাবে।

১২টি গ্রুপের মধ্যে পয়েন্ট টেবিলে এগিয়ে থাকা সেরা ৮টি ‘তৃতীয় স্থান’ অধিকারী দলও সুযোগ পাবে নকআউট রাউন্ডে। ফলে এবারই প্রথম বিশ্বকাপে যুক্ত হচ্ছে ‘রাউন্ড অব ৩২’ তথা ১৬টি বাড়তি নকআউট ম্যাচ। ট্রফি জিততে হলে ফাইনালিস্ট দুই দলকে এবার ৭টির বদলে মোট ৮টি ম্যাচ খেলতে হবে।
খেলা হবে ৩টি দেশের ১৬টি বিশ্বমানের ভেন্যুতে
উত্তর আমেরিকার মোট ১৬টি শহরের চোখ ধাঁধানো সব স্টেডিয়ামে বসবে এই ফুটবল যুদ্ধ। সবচেয়ে বেশি ম্যাচ হবে যুক্তরাষ্ট্রে। তাই সেখানে ভেন্যুও ব্যবহার হবে বেশি।
যুক্তরাষ্ট্র (১১টি শহর): আটলান্টা, বোস্টন, ডালাস, হিউস্টন, কানসাস সিটি, লস অ্যাঞ্জেলেস, মিয়ামি, নিউ ইয়র্ক/নিউ জার্সি, ফিলাডেলফিয়া, সান ফ্রান্সিসকো এবং সিয়াটল। (সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৭৫% ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে এখানে)।
এছাড়া মেক্সিকোর ৩টি শহরে অনুষ্ঠিত হবে ম্যাচ। এগুলো হল মেক্সিকো সিটি, গুয়াদালাহারা এবং মনটেরি। আরেক আয়োজক দেশ কানাডার ২টি শহরে বসবে বিশ্বকাপে আসর- টরন্টো এবং ভ্যাঙ্কুভার।

ডালাসের চমৎকার এটিঅ্যান্ডটি স্টেডিয়ামে টুর্নামেন্টের একটি সেমিফাইনালসহ সবচেয়ে বেশি ৯টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। আর ১৯ জুলাই বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন নির্ধারণী ফাইনাল ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে নিউ ইয়র্ক/নিউ জার্সির বিখ্যাত মেটলাইফ স্টেডিয়ামে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ও মাঠের লড়াইয়ের সূচনা
আগামী ১১ জুন মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক 'এস্তাদিও আসতেকা' স্টেডিয়ামে জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পর্দা উঠবে এই আসরের। এই স্টেডিয়ামটি বিশ্বের প্রথম ভেন্যু হিসেবে তিনটি ভিন্ন বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ আয়োজনের অনন্য রেকর্ড গড়তে যাচ্ছে (এর আগে ১৯৭০ ও ১৯৮৬ সালের ফাইনালও এখানে হয়েছিল, যেখানে পেলে ও ম্যারাডোনা ট্রফি উঁচিয়ে ধরেছিলেন)।
উদ্বোধনী ম্যাচে মাঠে নামবে সহ-আয়োজক মেক্সিকো এবং দক্ষিণ আফ্রিকা। ৩টি দেশে খেলা হওয়ায় এবার মোট ৩টি উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হবে- ১১ জুন মেক্সিকোতে, ১২ জুন কানাডার টরন্টোতে এবং একই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে।
সংগীত ও বিনোদনের মহাপরিকল্পনা
মাঠের খেলা শুরু হওয়ার আগেই ফুটবল মাঠ রূপ নেবে এক রাজকীয় গীতিমঞ্চে। চারবারের গ্র্যামিজয়ী এবং ‘লাতিন মিউজিকের রানি’ শাকিরা নাইজেরিয়ান সেনসেশন বার্না বয়ের সঙ্গে গেয়েছেন এবারের অফিশিয়াল থিম সং ‘দাই দাই’। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানগুলোতে পারফর্ম করবেন পপ তারকা ক্যাটি পেরি, অ্যালানিস মরিসেট, তায়লা, জে বালভিন এবং নোরা ফাতেহির মতো বিশ্বখ্যাত তারকারা। এছাড়া বিশ্বকাপের উদ্বোধনী আসরে মঞ্চ মাতাবেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত ডিজে সঞ্জয়ও।

সবচেয়ে বড় চমক থাকছে সমাপনী দিনে। ১৯ জুলাই ফাইনাল ম্যাচের মধ্যবিরতিতে আমেরিকার বিখ্যাত ‘সুপার বোল’ স্টাইলের একটি জমকালো 'হাফ-টাইম শো' চালু করতে যাচ্ছে ফিফা। যেখানে একসঙ্গে মঞ্চ মাতাবেন কে-পপ দুনিয়ার সুপারগ্রুপ বিটিএস, পপ-সম্রাজ্ঞী ম্যাডোনা এবং শাকিরা।
কার্যকর নতুন নিয়ম
এছাড়া এবারের আসর দিয়েই মাঠের খেলায় কার্যকর হতে যাচ্ছে কিছু নতুন নিয়ম। সবচেয়ে আলোচিত ও কঠোর নিয়মটি হলো মুখ ঢেকে রাখার ওপর নিষেধাজ্ঞা। মাঠের ভেতর প্রতিপক্ষের কোনো খেলোয়াড়ের সাথে কোনো ধরণের উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় বা বাদানুবাদের সময় কোনো ফুটবলার যদি হাত, বাহু কিংবা জার্সি দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে রাখেন, তবে রেফারি তাকে সরাসরি লাল কার্ড দেখাতে পারবেন।
এছাড়া ৫ সেকেন্ডের থ্রো-ইন ও ১০ সেকেন্ডের সাবস্টিটিউশন নিয়মও আসছে। ফারি যদি মনে করেন কোনো খেলোয়াড় থ্রো-ইন বা গোল কিক নিতে অতিরিক্ত সময় নিচ্ছেন, তবে তিনি হাত তুলে ৫ সেকেন্ডের উল্টো গণনা শুরু করবেন। এই সময়ের মধ্যে বল মাঠে না পাঠালে পজিশন হাতবদল হয়ে যাবে। থ্রো-ইনের ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষ থ্রো-ইন পাবে এবং গোল কিকের ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষ সরাসরি কর্নার কিক পেয়ে যাবে!
১০ সেকেন্ডের সাবস্টিটিউশন: মাঠ থেকে তুলে নেওয়া খেলোয়াড়কে নিকটবর্তী সীমানা দিয়ে মাত্র ১০ সেকেন্ডের মধ্যে মাঠের বাইরে যেতে হবে। তা না হলে, নতুন যে খেলোয়াড় মাঠে নামবেন তাঁকে পরবর্তী খেলার বিরতি পর্যন্ত কমপক্ষে ১ মিনিট সাইডলাইনে অপেক্ষা করতে হবে, যার ফলে ওই ১ মিনিট দলকে ১০ জন নিয়ে খেলতে হবে।
এক নজরে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ:
আয়োজক দেশ: যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডা।
সময়সীমা: ১১ জুন থেকে ১৯ জুলাই, ২০২৬ (মোট ৩৯ দিন)।
অংশগ্রহণকারী দল: ৪৮টি (১২টি গ্রুপে বিভক্ত)।
মোট ম্যাচের সংখ্যা: ১০৪টি।
ফাইনাল ম্যাচ: ১৯ জুলাই, মেক্সিকোর এস্তাদিও আসতেকা নয় বরং যুক্তরাষ্ট্রের মেটলাইফ স্টেডিয়াম, নিউ ইয়র্ক/নিউ জার্সিতে।
মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি সংগীত, সংস্কৃতি আর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এই ফুটবল মহাযজ্ঞ দেখার জন্য এখন অধীর আগ্রহে প্রহর গুনছে পুরো বিশ্ব।
আরএ