স্পোর্টস ডেস্ক
১০ জুন ২০২৬, ০৩:৪৩ পিএম
১৯৭০ সালে ফুটবলবিশ্ব যখন ব্রাজিলের তৃতীয়বার বিশ্বকাপ জয়ের সাক্ষী হলো, তখন বিশ্ব ফুটবলের গভর্নিং বডি ফিফাকে এক নতুন সংকটে পড়তে হয়েছিল। ফুটবলের দূরদর্শী সংগঠক এবং ফিফার সাবেক সভাপতি জুলে রিমে নিজেই একটি নিয়ম করে গিয়েছিলেন।
যে দেশ প্রথম তিনবার বিশ্বকাপ জিতবে, চিরদিনের জন্য আসল ট্রফিটি তাদের দিয়ে দেওয়া হবে। ব্রাজিল সেই কীর্তি গড়ায় ঐতিহাসিক ‘জুলে রিমে ট্রফি’ স্থায়ীভাবে চলে যায় তাদের শো-কেসে। ফলে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের পুরস্কৃত করার জন্য ফিফাকে একদম নতুন একটি ট্রফির নকশা তৈরির প্রতিযোগিতা আহ্বান করতে হয়।
ফিফার আহ্বানে সাড়া দিয়ে ট্রফির নকশা করতে শুরু করেন অনেকেই। বিশ্বজুড়ে জমা পড়া অসংখ্য নকশার মধ্য থেকে ফিফা বেছে নেয় ইতালির বিখ্যাত ট্রফি নির্মাতা সিলভিও গাজানিগার ডিজাইনটি। গাজানিগা চেয়েছিলেন নতুন ট্রফিটিকে আগের জুলে রিমে ট্রফির চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা এবং আধুনিক রূপ দিতে।

২০২২ সালে তাঁর ছেলে জর্জো গাজানিগা ‘দ্য অ্যাথলেটিক’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “জুলে রিমে ট্রফিটি ছিল মূলত ‘আর্ট নুভো’ বা উনবিংশ শতকের শিল্পকলার একটি বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু আমার বাবা চেয়েছিলেন বিংশ শতাব্দীর শিল্পভাবনার আদলে ফুটবলের নতুন এক আত্মাকে ফুটিয়ে তুলতে।”
গাজানিগার তৈরি এই ট্রফিটি কেবল একটি সোনার পাত্র নয়, এর প্রতিটি ভাঁজে লুকিয়ে আছে গভীর অর্থ। ট্রফিটির ওপরের অংশে রয়েছে একটি ভূগোলক, যার কারণটি বেশ স্পষ্ট- ফুটবল একটি বৈশ্বিক খেলা। এই বিশ্ব গোলকটিকে দুই দিক থেকে হাত দিয়ে ধরে রেখেছে দুইজন মানুষ। এই দুইজন মূলত মাঠে লড়াই করা দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী দলকে ইঙ্গিত করে।

একই সাথে তাদের হাতগুলো আকাশের দিকে প্রসারিত, যা জয়ের মুহূর্তের পরম আনন্দ এবং ফুটবলের গতিশীলতাকে ফুটিয়ে তোলে। এই ট্রফিটি একই সাথে খেলোয়াড়দের গৌরব এবং সেই গৌরব অর্জনের পেছনের কঠোর পরিশ্রমের এক অনন্য নিদর্শন। খেয়াল করলে দেখা যাবে, ট্রফির ওপরের মহাদেশগুলো উজ্জ্বল সোনালি রঙের, কিন্তু ট্রফির মূল বডি বা শরীরটি কিছুটা অনুজ্জ্বল ফিনিশিংয়ের- যা বোঝায় কঠোর পরিশ্রমের পরই কেবল সাফল্যের উজ্জ্বল আলো চকমক করে ওঠে।
দুর্ভাগ্যবশত, জুলে রিমের মতো এই ট্রফিটির কোনো আকর্ষণীয় বা কাব্যিক নাম নেই; দাপ্তরিকভাবে একে ডাকা হয় ‘ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ ট্রফি’ ।

উপাদান: এটি ১৮ ক্যারেট নিরেট সোনা দিয়ে তৈরি।
উচ্চতা ও ওজন: ট্রফিটি ৩৬ সেন্টিমিটার (১৪.২ ইঞ্চি) লম্বা এবং এর ওজন ৬.১৪২ কেজি।
তৈরির খরচ: সত্তরের দশকে এটি তৈরি করতে খরচ হয়েছিল মাত্র ৭,৬৯০ পাউন্ড (৯,৩৯০ ডলার)। মুদ্রাস্ফীতির হিসাব ধরলে বর্তমান বাজারে যার মূল্য প্রায় ৯৮,৫০০ পাউন্ড বা ১,৩০,৫০০ ডলার।
ট্রফিটির নিচের অংশে ‘ম্যালাকাইট’ নামক সবুজ রঙের পাথরের দুটি রিং বা স্তর রয়েছে। এই স্তরে ২০টি চারকোনা খালি জায়গা রাখা হয়েছে, যেখানে প্রতি আসরের বিশ্বজয়ীদের নাম খোদাই করা হয়। হিসাব করে দেখা গেছে, এই খালি জায়গাগুলো দিয়ে ২০৩০ সালের বিশ্বকাপ পর্যন্ত বিজয়ীদের নাম লেখা যাবে। ২০৩০ সালের পর কি তবে এই ট্রফিটি বদলে যাবে? ফিফার ক্ষেত্রে আসলে আগে থেকে নিশ্চিত করে কিছুই বলা যায় না।

বিশ্বকাপের এই আসল ট্রফিটি স্পর্শ করার ক্ষেত্রে ফিফার অত্যন্ত কড়া এবং কঠোর কিছু নিয়ম রয়েছে। এই ট্রফিটি চাইলেই যে কেউ হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখতে পারেন না। ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, শুধুমাত্র বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্য (খেলোয়াড় ও কোচ), রাষ্ট্রপ্রধান এবং ফিফার নির্দিষ্ট কিছু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছাড়া আর কারও এই ট্রফিতে হাত দেওয়ার অনুমতি নেই।
আর এই কারণেই ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালের পর বিশ্বজুড়ে তীব্র বিতর্কের ঝড় উঠেছিল বিখ্যাত শেফ ‘সল্ট বে’র কাণ্ডকারখানা নিয়ে। তিনি কেবল আর্জেন্টিনার উদযাপনের মাঝখানে ঢুকে বিরক্তই করেননি, বরং ফিফার সেই অলঙ্ঘনীয় নিয়ম ভেঙে আসল ট্রফিটি হাতে নিয়েছিলেন এবং চুমু খেয়েছিলেন। ফিফার নীতিমালায় এমন আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
আধুনিক নিয়মে বিশ্বকাপজয়ীরা আর আসল ট্রফি নিজেদের দেশে নিয়ে যেতে পারেন না। ২০০৬ সাল পর্যন্ত নিয়ম ছিল, চ্যাম্পিয়ন দেশ পরবর্তী চার বছরের জন্য আসল ট্রফিটি নিজেদের কাছে রাখার সুযোগ পেত।
কিন্তু নিরাপত্তার কারণে বর্তমানে ফাইনালের পর মাঠের উদযাপন শেষ হতেই ফিফা আসল ট্রফিটি নিজেদের জিম্মায় নিয়ে নেয়। এর বদলে বিজয়ী দেশকে হুবহু আসল ট্রফির মতো দেখতে একটি ব্রোঞ্জের ওপর সোনার প্রলেপ দেওয়া রেপ্লিকা বা অনুলিপি দেওয়া হয়। আর আসল ট্রফিটি স্থায়ীভাবে রাখা থাকে সুইজারল্যান্ডের জুরিখ শহরে অবস্থিত ফিফার মূল সদর দপ্তরে।
ফুটবল দুনিয়ার সবচেয়ে বড় এই পুরস্কারের দিকেই এখন তাকিয়ে আছে ২০৬৬ বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া ৪৮টি দল। আগামী ১৯ জুলাই নিউ ইয়র্কের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে কোন দেশের অধিনায়কের হাতে উঠবে এই ঐতিহাসিক ট্রফি, সেটাই এখন দেখার অপেক্ষা।
আরএ