images

স্পোর্টস / ফুটবল

রেকর্ডের মেগা আসরে ডার্ক হর্সদের উত্থান, বিশ্বকাপে চমকে দিতে পারে যারা

স্পোর্টস ডেস্ক

১০ জুন ২০২৬, ০৩:২১ পিএম

প্রতিটি ফুটবল বিশ্বকাপেই এমন কিছু দলের আবির্ভাব ঘটে, যারা বাছাইপর্বে দুর্দান্ত খেলে, মহাদেশীয় টুর্নামেন্টগুলোতে সাফল্যের ছাপ রেখে এবং মূল মঞ্চে এসে বিশ্ব ফুটবলের ভারী ও ঐতিহ্যবাহী পরাশক্তিদের হিসাব-নিকাশ ওলট-পালট করে দেওয়ার প্রচ্ছন্ন হুমকি দেয়। ফুটবলীয় পরিভাষায় এই দলগুলোকেই বলা হয় ‘ডার্ক হর্স’ বা কালো ঘোড়া।

২০২৬ সালের এই বর্ধিত ৪৮ দলের বিশ্বকাপে প্রতিটি মহাদেশীয় কনফেডারেশন থেকে (ওশেনিয়া অঞ্চলে একমাত্র প্রতিনিধি হওয়ায় নিউজিল্যান্ড স্বয়ংক্রিয়ভাবেই তালিকায় রয়েছে) এমন পাঁচটি উদীয়মান ডার্ক হর্স দলের শক্তিমত্তা ও সম্ভাবনা চলুন বিশ্লেষণ করা যাক:

১. উত্তর আমেরিকা: মেক্সিকো

আগামী বৃহস্পতিবার (১১ জুন) স্বাগতিক মেক্সিকো দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে ম্যাচ দিয়ে এই বিশ্বকাপের পর্দা তুলবে, যা ২০১০ সালের উদ্বোধনী ম্যাচের এক চমৎকার পুনরাবৃত্তি। হাভিয়ের আগুইরের এই দল এবার বেশ সুবিধাজনক গ্রুপে রয়েছে, যেখানে তাদের বাকি দুই প্রতিপক্ষ চেক প্রজাতন্ত্র এবং দক্ষিণ কোরিয়া।

২০২৬ সালে মেক্সিকো এখনো অপরাজিত। কোচ আগুইরের ৪-৩-৩ ফরমেশনের মূল চালিকাশক্তি ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার ও অধিনায়ক এডসন আলভারেজ এবং ফুলহ্যামের অভিজ্ঞ স্ট্রাইকার রাউল জিমেনেজ। জিমেনেজ ১২৫ ম্যাচে ৪৪টি গোল করে হাভিয়ের হার্নান্দেজের অল-টাইম রেকর্ড (৫২ গোল) ভাঙার থেকে মাত্র ৮ গোল দূরে আছেন।

গত গ্রীষ্মে তারা চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী যুক্তরাষ্ট্রকে ২-১ গোলে হারিয়ে গোল্ড কাপ জিতেছে। তার তিন মাস আগে নেশনস লিগের সেমিফাইনালে কানাডাকে ২-০ গোলে এবং ফাইনালে জিমেনেজের জোড়া গোলে পানামাকে ২-১ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়।

মেক্সিকো ১৯৯৪ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে প্রতিটি বিশ্বকাপেই গ্রুপ পর্ব পার করলেও কখনোই কোয়ার্টার ফাইনালের মুখ দেখেনি। গত বিশ্বকাপে তো গোল ব্যবধানে পিছিয়ে থেকে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিয়েছিল। এবার দীর্ঘ ৪০ বছর পর নকআউটের প্রথম ম্যাচ জেতাই তাদের মূল লক্ষ্য।

এছাড়া কোচ আগুইরে এর আগেও দুইবার (২০০২ ও ২০১০) মেক্সিকোর ডাগআউটে ছিলেন। এবার যদি মেক্সিকো গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হতে পারে, তবে শেষ ৩২ এবং শেষ ১৬-র ম্যাচগুলো তারা নিজেদের ঘরের মাঠ ঐতিহাসিক ‘এস্তাদিও আসতেকা’ স্টেডিয়ামে খেলার বিশাল সুবিধা পাবে।

২. ইউরোপ: নরওয়ে

নরওয়ে সর্বশেষ যখন ১৯৯৮ সালে বিশ্বকাপ খেলেছিল, তখন দলটির বর্তমান কোচ স্টেল সোলবাকেন নিজে স্কোয়াডের খেলোয়াড় ছিলেন। দীর্ঘ প্রায় ৩০ বছর পর এবার এক অবিশ্বাস্য ‘সোনালি প্রজন্ম’ নিয়ে বিশ্বমঞ্চে পা রেখেছে নরওয়ে।

আর্লিং হালান্ড, মার্টিন ওডেগার্ড, আলেক্সান্ডার সরলথ, জুলিয়ান রাইয়ারসন, অস্কার বব, স্যান্ডার বার্গ- ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগের কাঁপানো সব তারকা এখন এই দলে।

ইউরোপীয় বাছাইপর্বে নরওয়ে ছিল সবচেয়ে বিধ্বংসী দল, যেখানে তারা সর্বোচ্চ ৩৭টি গোল করেছে এবং ১৬ গোল করে টপ-স্কোরার হয়েছেন হালান্ড। বাছাইপর্বে তারা পরাশক্তি ইতালিকে দুইবার হারিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়; যার মধ্যে মিলানের মাঠে ৪-১ গোলের দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন এবং ওসলোর মাটিতে প্রথমার্ধের তিন গোলেই জয় নিশ্চিত করার ম্যাচ দুটি অন্যতম।

সরলথ এবং হালান্ডের উপস্থিতির কারণে নরওয়ে বাতাসে ভাসানো ক্রসে সবচেয়ে বিপজ্জনক। বাছাইপর্বে তারা সর্বোচ্চ ৮টি হেড গোল এবং কাউন্টার অ্যাটাক থেকে ৭টি গোল করেছে। তবে তাদের বড় মাইনাস পয়েন্ট হলো ফ্রান্স, সেনেগাল এবং ইরাকের সাথে টুর্নামেন্টের ‘গ্রুপ অফ ডেথ’-এ পড়া। এছাড়া দলগতভাবে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট খেলার অভিজ্ঞতার অভাবও রয়েছে। তবে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে এই খেলোয়াড়দের গভীর অভিজ্ঞতা নরওয়েকে যেকোনো দলের জন্য এক মূর্তিমান আতঙ্ক করে তুলেছে।

৩. আফ্রিকা: সেনেগাল

সেনেগালের এই চেনা দলটির জন্য এটাই সম্ভবত শেষ সুযোগ। সাদিও মানে, ইদ্রিসা গেয়ি, কালিদু কুলিবালি এবং এদুয়ার্দ মেন্ডির মতো দলের মূল স্তম্ভরা এখন তাদের ক্যারিয়ারের গোধূলি লগ্নে দাঁড়িয়ে। কাতার বিশ্বকাপে শেষ ১৬-তে ইংল্যান্ডের সাথে সমানে সমানে লড়েও প্রথমার্ধের শেষের দিকের দুই ভুলে ম্যাচ থেকে ছিটকে গিয়েছিল তারা।

দলে এখন যুক্ত হয়েছে নিকোলাস জ্যাকসন, লামিন কামারা, এল হাজি মালিক দিউফ এবং হাবিব দিয়ারার মতো প্রতিভাবান তরুণরা। সব মিলিয়ে কোচ পাপে থিয়াও-এর এই দলটির রক্ষণভাগ যেমন অভেদ্য, তেমনই স্কোয়াডের গভীরতা এবং ব্যালেন্সড একাদশ টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা।

গত জানুয়ারিতে আফ্রিকান কাপ অব নেশনসের ফাইনালে মরক্কোকে অতিরিক্ত সময়ে ১-০ গোলে হারিয়েছিল সেনেগাল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের শেষভাগে মরক্কোর এক বিতর্কিত পেনাল্টির প্রতিবাদে সেনেগালের খেলোয়াড়রা মাঠ ত্যাগ করায় পরবর্তীতে সেই ফলাফল ও তাদের আফ্রিকান শিরোপা বাতিল করা হয়। এই সিদ্ধান্ত সেনেগাল দলকে মানসিকভাবে প্রচণ্ড একতাবদ্ধ করেছে এবং তারা বিশ্বমঞ্চে এর প্রতিশোধ নিতে মুখিয়ে আছে।

বাছাইপর্বে তারা অপরাজিত থেকে কোয়ালিফাই করেছে। থিয়াও সাধারণত ৪-৩-৩ ফরমেশন পছন্দ করলেও প্রয়োজনে ৩-৪-৩-এ চলে যান। কোচ হিসেবে ৩১ ম্যাচের মধ্যে তিনি মাত্র ৪টিতে হেরেছেন।

৪. এশিয়া: জাপান

২০২২ বিশ্বকাপে জার্মানিকে ২৬% পজিশন নিয়ে ২-১ গোলে এবং স্পেনকে মাত্র ১৮% পজিশন নিয়ে একই ব্যবধানে হারিয়ে বিশ্বকে স্তব্ধ করেছিল ‘সামুরাই ব্লু’রা। দীর্ঘমেয়াদি কোচ হাজিমে মরিয়াসুর এই দল বড় বড় দলকে বধ করতে ওস্তাদ। চলতি বছরের মার্চে তারা ওয়েম্বলিতে ইংল্যান্ডকে হারিয়েছে এবং গত বছর ব্রাজিলকে হারিয়েছে ৩-২ গোলে।

মরিয়াসু দলটিকে অত্যন্ত কৌশলগতভাবে বুদ্ধিমান করে গড়ে তুলেছেন। তিনি ৩-৪-৩ ফরমেশনে স্ট্রাইকার আয়াসে উয়েদার পেছনে দুজন ‘নম্বর ১০’ (অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার) খেলান এবং দুই প্রান্তে গতিময় উইং-ব্যাক ব্যবহার করেন। তাকেফুসা কুবো এবং জুনিয়া ইতোর মতো দারুণ সৃজনশীল খেলোয়াড় থাকলেও, ব্রাইটনের উইঙ্গার কাওরু মিতোমা গত মাসে হ্যামস্ট্রিং ইনজুরির অস্ত্রোপচারের কারণে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে গেছেন, যা জাপানের জন্য বড় ধাক্কা।

এশিয়ার দুই স্তরের বাছাইপর্বে তারা সর্বোচ্চ ৩০টি গোল করে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। তবে জাপানের মূল সমস্যা হলো, তারা আজ পর্যন্ত বিশ্বকাপের ইতিহাসে কোনো নকআউট ম্যাচ জিততে পারেনি। এছাড়া ২০২৪-এর শুরুতে এশিয়ান কাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইরানের কাছে হেরে বিদায় নিয়েছিল। পরাশক্তিদের হারাতে পারলেও নিজেদের সমপর্যায়ের দলের বিপক্ষে খেলার মানসিকতা তাদের আরও উন্নত করতে হবে।

৫. দক্ষিণ আমেরিকা: ইকুয়েডর

সেবাস্তিয়ান বেকাসেসে ইকুয়েডরের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে দলটির পরিসংখ্যান এককথায় অবিশ্বাস্য: ১৯ ম্যাচে ৭টি জয়, ১১টি ড্র এবং মাত্র ১টি পরাজয়! একমাত্র হারটি এসেছিল বেকাসেসে-র প্রথম ম্যাচে ব্রাজিলের বিরুদ্ধে ১-০ ব্যবধানে। এরপর থেকে তারা এমন এক নিখুঁত ও নিরেট রক্ষণাত্মক দেওয়াল তুলেছে যার কোনো উত্তর প্রতিপক্ষের জানা নেই।

দক্ষিণ আমেরিকার কঠিন ড্রপ-রবিন বাছাইপর্বে একমাত্র আর্জেন্টিনা বাদে সবাইকে পেছনে ফেলে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে ইকুয়েডর। তারা মূলত ৪-৪-২ ব্লকে অত্যন্ত কমপ্যাক্ট এবং ফিজিক্যাল ফুটবল খেলে। দীর্ঘ সময় বল পজিশন ছাড়াও তারা ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

চেলসির মোইসেস কাইসেদো, পিএসজির উইলিয়ান পাচো এবং আর্সেনালের পিয়েরো হিনকাপি- এই তিন তরুণ, যারা ‘ইন্ডিপেন্ডিয়েন্তে দেল ভালে’র একাডেমি থেকে উঠে এসে ইউরোপের বড় বড় ক্লাবে খেলছেন, তারাই এই দলের মূল মেরুদণ্ড।

দলটির একমাত্র দুর্বলতা হলো গোল করার খরা। তারা আজো বুড়ো স্ট্রাইকার এনার ভ্যালেন্সিয়ার ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। তবে ২০২৪ সালের আগস্টে দায়িত্ব নেওয়া বেকাসেসে-র অধীনে ১৯ ম্যাচে ১২টি ক্লিন শিট এবং মাত্র ৭টি গোল হজম করার রেকর্ডটিই তাদের মূল শক্তি। ২০০৬ সালের পর তারা বিশ্বকাপের নকআউটে উঠতে পারেনি, তবে কাতারের গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায়ের অভিজ্ঞতা এবার তরুণ দলটিকে আরও পরিপক্ব করেছে।

এই পাঁচ ‘ডার্ক হর্স’ কেবল নিজেদের কনফেডারেশনের প্রতিনিধিত্ব করছে না, বরং আধুনিক ফুটবলের নিখুঁত কৌশল আর তারুণ্যের শক্তিতে বলীয়ান হয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপে যেকোনো ট্র্যাডিশনাল জায়ান্টদের সাম্রাজ্য গুঁড়িয়ে দিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত।

আরএ/এসটি