images

স্পোর্টস / ফুটবল

বিশ্বজয়ের মহালড়াইয়ে মাতবে দুনিয়া, পর্দা উঠতে যাচ্ছে বিশ্বকাপের

১০ জুন ২০২৬, ০১:১৩ পিএম

চার বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষা, কোটি কোটি ভক্তের নির্ঘুম রাত আর ফুটবল রোমাঞ্চের চূড়ান্ত মুহূর্তটি অবশেষে চলেই এলো। আগামী কাল ১১ জুন, পর্দা উঠছে বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনের সবচেয়ে বড় মহাযজ্ঞ ফিফা বিশ্বকাপের। ‘শুরু হচ্ছে বিশ্বকাপ’ এই একটিমাত্র বাক্যে এখন উদ্বেলিত গোটা পৃথিবী। ল্যাটিন আমেরিকার সাম্বা নৃত্য থেকে শুরু করে ইউরোপের পাওয়ার ফুটবল, কিংবা এশিয়া-আফ্রিকার গতিময় লড়াই। সব মিলিয়ে আগামী এক মাস ফুটবলপ্রেমীরা বুঁদ হয়ে থাকবেন এক জাদুকরী উন্মাদনায়।

এবারের বিশ্বকাপটি শুধু আরেকটি টুর্নামেন্ট নয়, এটি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম অনন্য এবং ঐতিহাসিক একটি আসর হিসেবে ইতোমধ্যেই জায়গা করে নিয়েছে।

এবারের বিশ্বকাপটি বেশ কিছু কারণে ফুটবল ইতিহাসে অনন্য। এবারই প্রথম রেকর্ডসংখ্যক দল নিয়ে দলগুলোর শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই অনুষ্ঠিত হচ্ছে। টুর্নামেন্টের পরিধি বাড়ায় স্বাভাবিকভাবেই উন্মাদনার পারদ চড়েছে বহুগুণ। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ফুটবল ভক্তদের জন্য এটি এক মহোৎসব। স্টেডিয়ামের গ্যালারি থেকে শুরু করে পাড়ার চায়ের দোকান, সর্বত্রই এখন একটাই আলোচনা—কার মাথায় উঠবে বিশ্বফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট?

ব্যানার, ফেস্টুন আর প্রিয় দলের জার্সিতে ছেয়ে গেছে চারপাশ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে চলছে ভক্তদের চেনা দ্বৈরথ। সব মিলিয়ে ফুটবল রোমাঞ্চের এক চরম বহিঃপ্রকাশ দেখছে বিশ্ব।

এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো প্রজন্মের এক অদ্ভুত ও রোমাঞ্চকর মেলবন্ধন। একদিকে এটি ফুটবল ইতিহাসের দুই জীবন্ত কিংবদন্তি—লিওনেল মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর ক্যারিয়ারের গোধূলিলগ্নের সবচেয়ে বড় মঞ্চ। বিশ্বমঞ্চে হয়তো শেষবারের মতো দেখা যাবে এলএমটেন আর সিআরসেভেনের সেই চিরচেনা জাদু। কোটি ভক্তের চোখ থাকবে তাঁদের দিকে, প্রিয় তারকাকে ট্রফি হাতে বিদায় জানানোর এক আবেগঘন মুহূর্তের অপেক্ষায় থাকবে পুরো দুনিয়া।

অন্যদিকে, ফুটবল বিশ্বকে শাসন করতে প্রস্তুত বর্তমানের মহাতারকারা। কিলিয়ান এমবাপে কিংবা জুলিয়ান আলভারেজের মতো খেলোয়াড়রা, যাঁরা গত আসরগুলোতেই নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছেন, তাঁরা এবার এসেছেন নিজেদের সাম্রাজ্য আরও পাকা করতে।

তবে এবারের বিশ্বকাপের আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে একঝাঁক তরুণ ও উদীয়মান তুর্কিদের মধ্যে। বিশ্বফুটবলের নতুন জোয়ার নিয়ে হাজির হয়েছেন দেজিরে দুয়ে, এন্দ্রিক, নিকো পাজদের মত তারকারা। কিংবদন্তিদের অভিজ্ঞতা আর এই তরুণদের রক্তগরম করা পারফরম্যান্সের লড়াই-ই হবে এবারের বিশ্বকাপের মূল আকর্ষণ।

অর্থনৈতিক দিক থেকেও ২০২৬ বিশ্বকাপের গুরুত্ব অনেক। লাখো পর্যটকের আগমন, বিপুল বাণিজ্যিক কার্যক্রম, স্পন্সরশিপ এবং সম্প্রচারস্বত্বের মাধ্যমে আয়োজক দেশগুলো বিপুল অর্থনৈতিক সুবিধা পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক পর্যটন বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এই আসর।

বিশ্বকাপের মঞ্চে প্রতিবারই জন্ম নেয় নতুন গল্প। কোনো দল অপ্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন করে, কোনো তারকা নিজেকে কিংবদন্তির কাতারে নিয়ে যান, আবার কোনো ম্যাচ স্মরণীয় হয়ে থাকে নাটকীয়তার জন্য। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপও তার ব্যতিক্রম হবে না বলেই বিশ্বাস ফুটবলপ্রেমীদের। নতুন ফরম্যাট, নতুন ভেন্যু এবং নতুন সম্ভাবনার এই আসর ফুটবল ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে।

কাউন্টডাউন প্রায় শেষের পথে। উত্তেজনার পারদ প্রতিদিনই বাড়ছে। বিশ্বের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমী এখন তাকিয়ে আছেন সেই মাহেন্দ্রক্ষণটির দিকে, যখন মাঠে গড়াবে বল, শুরু হবে স্বপ্ন, সংগ্রাম আর গৌরবের লড়াই। বিশ্বকাপ শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়, এটি এক মহোৎসব। যেখানে জয়-পরাজয়ের সীমা ছাড়িয়ে উদযাপিত হয় মানবিক বন্ধন, আবেগ এবং খেলাধুলার সৌন্দর্য।

বিশ্বকাপের এবারের আসরটি শুধু মাঠের লড়াইয়েই নয়, মাঠের বাইরের প্রযুক্তিগত দিক থেকেও ইতিহাস গড়তে যাচ্ছে। সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন স্টেডিয়ামগুলোতে ব্যবহার করা হচ্ছে উন্নত সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তি এবং নিখুঁত ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি ব্যবস্থা। এর ফলে মাঠের ভুলত্রুটি কমে আসবে এবং খেলা হবে আরও গতিময় ও নিখুঁত।

এছাড়াও দর্শকদের যাতায়াত এবং স্টেডিয়ামের ভেতরের অভিজ্ঞতাকে স্মরণীয় করে রাখতে যুক্ত করা হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত নানা সেবা।

খেলার খাতা-কলমের হিসাবে এবারও ফেবারিটের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা এবং ইউরোপের পরাশক্তি ফ্রান্স। তবে হেক্সা মিশনের খোঁজে নামা ব্রাজিল, তারুণ্য ও অভিজ্ঞতার মিশ্রণে গড়া ইংল্যান্ড, স্পেনের ‘টিকি-টাকা’ কিংবা জার্মানির গোছানো ফুটবল যেকোনো মুহূর্তে পাশা উল্টে দিতে পারে। মরক্কো কিংবা ক্রোয়েশিয়ার মতো দলগুলো আবারও কোনো রূপকথা লিখবে কিনা, তা নিয়েও চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।

সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে কাল যখন রেফারি তাঁর রেফারির বাঁশিতে ফুঁ দেবেন, তখন ফুটবল উন্মাদনায় মেতে ওঠবে বিশ্ব। শুরু হবে পায়ের জাদুতে বিশ্বজয়ের মহাকাব্য। ফুটবলারদের পায়ের জাদুতে, গ্যালারির গগনবিদারী চিৎকারে আর কোটি ভক্তের প্রার্থনায় আগামী এক মাসেরও বেশি সময় স্পন্দিত হবে পুরো বিশ্ব।

আরএ/এসটি