images

স্পোর্টস / ফুটবল

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে কে হাসবে শেষ হাসি? লাতিন না ইউরোপ

সালমান ইসলাম

১০ জুন ২০২৬, ১১:০৮ এএম

‘মরুর জাহাজ’ উট যেমন বালুর সমুদ্রে মানুষের স্বপ্ন বয়ে নিয়ে চলে, তেমনি একসময় কাতারের মরুভূমি ছুঁয়ে গিয়েছিল বিশ্বকাপের উন্মাদনা। আর এখন সেই বিশ্বকাপের পরবর্তী অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে আরও বড় পরিসরে ২০২৬ সালে, যেখানে ফুটবলের এই মহাযজ্ঞ প্রথমবারের মতো আয়োজিত হবে তিন দেশে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে। মরুভূমির সীমিত জলাশয়ের বদলে এবার থাকবে মহাদেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বিশাল শহর, আধুনিক স্টেডিয়াম আর আরও বড় পরিসরের দর্শক উন্মাদনা।

ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই শুধু খেলা নয়, এ এক বৈশ্বিক উৎসব, আবেগ, বিতর্ক আর স্বপ্নের মিলনমেলা। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ যেমন মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় লিখেছিল, তেমনি ২০২৬ বিশ্বকাপ লিখতে যাচ্ছে আরও বিস্তৃত ও বহুজাতিক এক ক্রীড়া ইতিহাস। এবার অংশ নেবে ৪৮টি দেশ যা আগে কখনো হয়নি। ফলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে নতুন চমকের সম্ভাবনাও।

ইউরোপ বনাম লাতিন আমেরিকা: হারানো ক্লাসিক দ্বৈরথের নতুন রূপ

ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে আবেগঘন ও চিরায়ত লড়াইগুলোর একটি হলো ইউরোপ বনাম লাতিন আমেরিকা। একদিকে ইউরোপের সংগঠিত, ট্যাকটিক্যাল ও সিস্টেমনির্ভর ফুটবল; অন্যদিকে লাতিন আমেরিকার সৃজনশীলতা, ফ্লেয়ার আর ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের জাদু। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপে এসে সেই ক্লাসিক দ্বৈরথ আর আগের মতো সরাসরি দুই মহাদেশের যুদ্ধ হিসেবে দাঁড়াচ্ছে না। বরং এটি রূপ নিয়েছে বহুস্তরীয়, ভাঙা-ভাঙা এক প্রতিযোগিতায়।

২০২৬ বিশ্বকাপে এখন আর ইউরোপ বনাম লাতিন আমেরিকাকে আলাদা যুদ্ধ হিসেবে দেখা হচ্ছে না। এবার শিরোপার দৌড়ে রয়েছে একসাথে কয়েকটি দল স্পেন, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা এবং পর্তুগাল। অর্থাৎ প্রতিযোগিতা এখন মহাদেশভিত্তিক নয়, বরং দলভিত্তিক সুপার-পাওয়ারের লড়াই। ইউরোপের মধ্যে আবার নিজস্ব প্রতিদ্বন্দ্বিতাই এত বেশি যে আলাদা করে 'লাতিন বনাম ইউরোপ' ফ্রেমটি দুর্বল হয়ে পড়েছে।

ইউরোপীয় ফুটবল এখন সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। স্পেন, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড তিনটি দলই টেকনিক্যালি পরিপূর্ণ এবং স্কোয়াড ডেপথে সমৃদ্ধ। ফ্রান্স তারকায় ভরপুর ও ভারসাম্যপূর্ণ, স্পেন পজেশন-ডমিন্যান্ট আধুনিক ফুটবল আর ইংল্যান্ড শারীরিক শক্তি ও গতি। এই তিনটি দলের পাশাপাশি জার্মানি, নেদারল্যান্ডস ও পর্তুগালও রয়েছে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে। ফলে ইউরোপের সবচেয়ে বড় শক্তি এখন 'একক আধিপত্য' নয়, বরং অভ্যন্তরীণ গভীর প্রতিযোগিতা।

এদিকে লাতিন আমেরিকা দুই তারকার কাঁধে পুরো মহাদেশ। মূল আলোচনার কেন্দ্র ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা। এখন অনেক বেশি সংকুচিত। আর্জেন্টিনা বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন, মেসি-পরবর্তী যুগের প্রস্তুতি চলছে। অপরদিকে ব্রাজিল নতুন প্রজন্মের গতি ও আক্রমণভিত্তিক ফুটবল ফিরিয়ে আনছে কার্লো আনচেলত্তির মাধ্যমে। 

কিন্তু সমস্যা হলো, আগের মতো উরুগুয়ে বা কলম্বিয়ার ধারাবাহিক শিরোপা-চ্যালেঞ্জিং শক্তি আর নেই। ফলে মহাদেশ বনাম মহাদেশ লড়াইয়ে ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। তবে বিশ্বকাপে সবচেয়ে বড় সত্য হলো- নামের বড়ত্ব নয়, পারফরম্যান্সই শেষ কথা বলে।

তিন দেশের বিশ্বমঞ্চ: নতুন এক বিশ্বকাপ

২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো আয়োজক কাঠামো। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক, লস অ্যাঞ্জেলেস, ডালাস; কানাডার টরন্টো ও ভ্যাঙ্কুভার; এবং মেক্সিকোর মেক্সিকো সিটি ও গুয়াদালাহারা। সব মিলিয়ে ছড়িয়ে থাকা শহরগুলো বিশ্বকাপকে দেবে এক মহাদেশীয় রূপ। মরুভূমির সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে এবার ফুটবল পৌঁছে যাবে আকাশচুম্বী স্কাইস্ক্র্যাপার, বিশাল স্টেডিয়াম আর প্রযুক্তিনির্ভর ভেন্যুতে। এই আয়োজন নিয়ে যেমন উচ্ছ্বাস আছে, তেমনি আছে প্রশ্নও। এত বড় পরিসরের টুর্নামেন্ট কি খেলোয়াড়দের উপর চাপ বাড়াবে? ভ্রমণ, আবহাওয়া আর সময় অঞ্চলের পার্থক্য কি খেলায় প্রভাব ফেলবে? উত্তরগুলো পাওয়া যাবে মাঠেই।

বিতর্ক, শ্রম আর বাস্তবতা

কাতার বিশ্বকাপের মতোই ২০২৬ নিয়েও আলোচনা আছে আয়োজনের খরচ, অবকাঠামো এবং বৈশ্বিক ফুটবল অর্থনীতির প্রভাব নিয়ে। বিশ্বকাপ মানেই কোটি কোটি ডলারের বিনিয়োগ, হাজার হাজার শ্রমিকের পরিশ্রম এবং দীর্ঘমেয়াদি নগর উন্নয়ন। কিন্তু সেই উন্নয়নের আড়ালে শ্রমিকদের জীবনমান, অধিকার এবং নিরাপত্তা সবসময়ই আলোচনার কেন্দ্রে থাকে। বিশ্বকাপ যতই রঙিন হোক, এর পেছনের বাস্তবতা কখনো কখনো কঠিন। ইতিহাস বলছে, বড় আয়োজন মানেই বড় দায়িত্ব, আর সেই দায়িত্ব পালনের প্রশ্ন থেকেই যায়।

৪৮ দলের বিশ্বযুদ্ধ

২০২৬ বিশ্বকাপে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো ৪৮ দলের অংশগ্রহণ। ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা, এশিয়া এবং ওশেনিয়া। সব মহাদেশ থেকে আরও বেশি দেশ সুযোগ পাবে বিশ্বমঞ্চে। এতে করে ছোট দলগুলোর জন্যও তৈরি হচ্ছে ইতিহাস গড়ার সুযোগ। ফুটবলের মানচিত্র বদলে যেতে পারে। যেখানে শুধু ঐতিহ্যবাহী শক্তিশালী দল নয়, উঠে আসতে পারে নতুন কোনো চমক, যেমনটা আগে দেখা গিয়েছিল ক্রোয়েশিয়া বা মরক্কোর মতো দলের ক্ষেত্রে।

মেসি-রোনালদো পরবর্তী যুগের প্রশ্ন

২০২৬ বিশ্বকাপ অনেকের জন্য এক নতুন যুগের সূচনা। লিওনেল মেসি বা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর যুগ ধীরে ধীরে শেষের দিকে। তাদের পর কে? কিলিয়ান এমবাপে কি বিশ্বকাপকে নিজের যুগে রূপ দেবেন? নাকি নতুন কোনো তরুণ তারকা হঠাৎ করেই বিশ্বমঞ্চ কাঁপিয়ে দেবেন? ফুটবলের সৌন্দর্য এখানেই। এটি কোনো একক নায়কের গল্প নয়, এটি দলের গল্প, প্রজন্মের গল্প।