স্পোর্টস ডেস্ক
০৯ জুন ২০২৬, ১০:২০ এএম
ফুটবলের ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে যা শুধু গোল নয়, যা হয়ে ওঠে কিংবদন্তি। কল্পনা করুন, একই বলে মাত্র চার মিনিটের ব্যবধানে দুই বিপরীত মেরুর ঘটনা। একবার ঈশ্বরের হাতের ছোঁয়া, আরেকবার মানুষের অসাধারণ প্রতিভার ঝলক। চোখ বন্ধ করলে এখনও দেখা যায় মেক্সিকোর সেই উন্মাদ মাঠ, লক্ষ দর্শকের গর্জন আর এক ছোটখাটো আর্জেন্টাইন জাদুকরের অবিশ্বাস্য দৌড়। হ্যাঁ, আমরা কথা বলছি দিয়াগো আরমান্দো ম্যারাডোনার সেই ঐতিহাসিক ১৯৮৬ বিশ্বকাপ ম্যাচের কথা। প্রথমে ‘হ্যান্ড অব গড’, তারপর ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’। সেই বলটি আজ কোথায়?
১৯৮৬ বিশ্বকাপ। আর্জেন্টিনার অধিনায়ক ম্যারাডোনা তখন বিশ্বের সেরা ফুটবলার। কিন্তু ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটা ছিল শুধু ফুটবল নয় রাজনৈতিক ও আবেগের সংঘাত। ফকল্যান্ড যুদ্ধে হারার ক্ষত এখনও তাজা। মাঠে সেই উত্তাপ ফুটে উঠল।
৫১তম মিনিট। ইংল্যান্ডের গোলরক্ষক পিটার শিলটনের সঙ্গে বল নিয়ে লড়াইয়ে ম্যারাডোনা তার বাম হাত দিয়ে বলটি জালে পাঠিয়ে দিলেন। রেফারি আলি বিন নাসের কিছু দেখতে পাননি। গোল! ম্যারাডোনা পরে বিখ্যাত মন্তব্য করেন, 'একটু ম্যারাডোনার মাথা দিয়ে, একটু ঈশ্বরের হাত দিয়ে।' এটাই ‘হ্যান্ড অব গড’।
মাত্র চার মিনিট পর, মাঝমাঠ থেকে বল পেয়ে ম্যারাডোনা এক অবিশ্বাস্য সোলো রান শুরু করলেন। পাঁচজন ইংলিশ ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে, শিলটনকে বোকা বানিয়ে বল জালে পাঠালেন। ফিফা পরে এটিকে ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ নাম দেয়। আর্জেন্টিনা জিতল ২-১। পরে তারা বিশ্বকাপও জিতল। ম্যারাডোনা টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়।
কিন্তু সেই ম্যাচের বলটি? অ্যাডিডাসের তৈরি সেই সাধারণ দেখতে বলটিই হয়ে উঠল ফুটবলের সবচেয়ে আইকনিক সম্পত্তি।
বলের যাত্রা: রেফারির হাত থেকে নিলামে
ম্যাচ শেষে রেফারি আলি বিন নাসের (তিউনিসিয়া) বলটি সংগ্রহ করেন। ফিফার নিয়ম অনুসারে, ম্যাচ বল প্রায়ই রেফারির কাছে থেকে যায় বা স্মৃতি হিসেবে রাখা হয়। তিনি ৩৬ বছর ধরে এটি যত্ন করে রেখেছিলেন। ২০২২ সালে, কাতার বিশ্বকাপের আগে, তিনি সিদ্ধান্ত নেন এবার এই বলকে বিশ্বের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার সময় হয়েছে।
লন্ডনের গ্রাহাম বাড অকশনসে ১৬ নভেম্বর ২০২২ সালে বলটি নিলামে ওঠে। অনুমান ছিল ২.৫ থেকে ৩ মিলিয়ন পাউন্ড। শেষমেশ বিক্রি হয় প্রায় ২ মিলিয়ন পাউন্ডে (প্রায় ২.৪ মিলিয়ন ডলার)। তখনকার হিসাবে এটি ছিল সবচেয়ে দামি ম্যাচ-ব্যবহৃত ফুটবল বল। রেফারি আশা করেছিলেন নতুন মালিক এটি জনসমক্ষে প্রদর্শন করবেন।

নিলামের পর থেকে ক্রেতার নাম প্রকাশ্যে আসেনি। এটি এখন একটি ব্যক্তিগত সংগ্রহে (প্রাইভেট কালেকশন) রয়েছে। কোনো জাদুঘর বা পাবলিক ডিসপ্লেতে এটি নিয়মিত দেখা যায় না। ফুটবল ইতিহাসের এই অমূল্য সম্পদ আপাতত লোকচক্ষুর আড়ালে, কিন্তু তার কিংবদন্তি জীবন্ত।
কেন এই বল এত মূল্যবান?
একটি সাধারণ বলের এত দাম কেন? কারণ এটি শুধু একটি বল নয়; এটি ফুটবলের আবেগ, বিতর্ক, জাদু ও ইতিহাসের প্রতীক। ‘হ্যান্ড অব গড’ ফুটবলের সবচেয়ে আলোচিত বিতর্কিত গোলগুলোর একটি। আর ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ প্রমাণ করে মানুষের প্রতিভা কীভাবে অসম্ভবকে সম্ভব করে। দুটি গোলই একই বলে।
ম্যারাডোনার জার্সি (যেটি স্টিভ হজের সঙ্গে সোয়াপ হয়েছিল) ২০২২ সালে ৯.৩ মিলিয়ন ডলারে বিক্রি হয়েছে, যা স্পোর্টস মেমোরাবিলিয়ার রেকর্ড। বলটির দাম তার চেয়ে কম হলেও, এর সাংস্কৃতিক মূল্য অপরিসীম। এটি আর্জেন্টিনার জাতীয় গর্ব, ইংল্যান্ডের হতাশা এবং বিশ্ব ফুটবলের রোমাঞ্চের মিশ্রণ।
ম্যারাডোনা ২০২০ সালে মারা যান, কিন্তু তার কিংবদন্তি অমর। বুয়েনোস আইরেসে তার শৈশবের বাড়িতে জাদুঘর আছে। এস্তাদিও আজটেকার বাইরে ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’র স্ট্যাচু দাঁড়িয়ে আছে। ফিফা মিউজিয়ামে তার স্মৃতি সংরক্ষিত।
এসটি