স্পোর্টস ডেস্ক
০৮ জুন ২০২৬, ০৯:৩০ পিএম
আগামী ১১ জুন যখন মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক পিচে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ কিক-অফ হবে, তখন কোটি কোটি চোখ থাকবে মাঠের তারকা খেলোয়াড়দের ওপর। কিন্তু সেই সবুজ গালিচায় ২২ জন খেলোয়াড়ের সাথে দাপিয়ে বেড়াবে টুর্নামেন্টের আরেকটি অন্যতম বড় আকর্ষণ— ‘ট্রাইওন্ডা’ (TRIONDA)।
বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় এই মহাযজ্ঞের জন্য ক্রীড়াসামগ্রী প্রস্তুতকারক জায়ান্ট অ্যাডিডাস বিশেষ এই অফিশিয়াল ম্যাচ বলটি তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকোর ১৬টি স্টেডিয়ামে পুরো এক মাস ধরে এই বলটিকে তাড়া করে বেড়াবেন ফুটবলাররা। তবে আগের প্রজন্মগুলোর ব্যবহৃত প্রথাগত বলের সাথে এর আকাশ-পাতাল তফাত। এটি স্রেফ একটি চামড়ার ফুটবল নয়; এর উপরিভাগের ঠিক নিচে লুকিয়ে আছে একটি অবিশ্বাস্য প্রযুক্তির মস্তিস্ক, যা প্রতিটি শট, পাস এবং স্পর্শকে রিয়েল-টাইমে রেকর্ড করে ম্যাচ অফিশিয়ালদের কাছে ডেটা পাঠাবে।
ফিফা এবং অ্যাডিডাস আশা করছে, এই বলটি আধুনিক ফুটবলের এক নতুন যুগের সূচনা করবে।
নামের রহস্য ও তিন দেশের মিলনমেলা
‘ট্রাইওন্ডা’ নামটি মূলত দুটি শব্দের চমৎকার সংমিশ্রণ—‘ট্রাই’ (Tri) এবং স্প্যানিশ শব্দ ‘ওন্ডা’ (Onda), যার সম্মিলিত অর্থ দাঁড়ায় ‘তিনটি ঢেউ’ (Three waves)। পুরুষ ফুটবল বিশ্বকাপের ৯৬ বছরের ইতিহাসে এবারই প্রথম যৌথভাবে তিনটি দেশ টুর্নামেন্ট আয়োজন করছে। বলের নাম ও ডিজাইনে সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তটিকেই উদযাপন করা হয়েছে।

বলের উপরিভাগের নকশায় তিন দেশের ঐতিহ্য এবং জাতীয় প্রতীককে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। বলের প্যানেলগুলোতে লাল, সবুজ ও নীল- এই তিন রঙের ঢেউ রয়েছে, যা তিন দেশের মিলনমেলাকে নির্দেশ করে। এছাড়া বলটিতে সূক্ষ্মভাবে খোদাই ও গ্রাফিক্সের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে:
কানাডার জন্য: লাল রঙের সাথে ঐতিহ্যবাহী ‘ম্যাপল পাতা’।
মেক্সিকোর জন্য: সবুজ রঙের সাথে ‘সোনালী ইগলের মাথা’।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য: নীল রঙের সাথে ‘পাঁচকোনা তারকা’।
সোনালী ছোঁয়া: বলটিতে ব্যবহার করা হয়েছে সোনালী রঙের ছোঁয়া, যা বিশ্বকাপের সোনালী ট্রফির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে।
এই তিনটি রঙিন সেকশন বা অংশ বলের কেন্দ্রে এসে একটি ত্রিভুজ আকৃতি ধারণ করেছে, যা তিন আয়োজক দেশের মেলবন্ধন ও ঐক্যকে চমৎকারভাবে প্রতীকায়িত করে।
বলের ভেতরের অদৃশ্য জাদুকর: ৫০০ হার্জের মোশন সেন্সর চিপ
বাইরে থেকে ট্রাইওন্ডা দেখতে যতটা সুন্দর, এর আসল বিস্ময় লুকিয়ে আছে ভেতরে যা খালি চোখে দেখা যায় না। ফিফার তথ্য অনুযায়ী, বলের কেন্দ্রে একটি ৫০০ হার্জের মোশন সেন্সর চিপ বসানো হয়েছে, যা প্রতি সেকেন্ডে শত শত বার নিখুঁত ডেটা পাঠাতে সক্ষম।

এই প্রযুক্তি যেভাবে রেফারিদের সাহায্য করবে:
বুটের স্পর্শের নিখুঁত সময়: একজন খেলোয়াড় ঠিক কোন মিলিসেকেন্ডে বলটি স্পর্শ করেছেন, তা এই সিস্টেমের মাধ্যমে রেফারিরা নিখুঁতভাবে জানতে পারবেন।
ভিএআর (VAR)-এর দ্রুত সিদ্ধান্ত: অফসাইড থেকে শুরু করে হ্যান্ডবলের মতো বিতর্কিত ও জটিল সিদ্ধান্তগুলো বিশ্লেষণ করতে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারিদের রিয়েল-টাইম তথ্য সরবরাহ করবে এই চিপ। এর ফলে মাঠে রেফারিদের ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে।
সহজ কথায়, এই বলটি এখন আর কেবল খেলার উপকরণ নয়, এটি রেফারি প্যানেলের একজন সক্রিয় সদস্য হিসেবে কাজ করবে।

প্যানেল মেকানিজম এবং অ্যারোডাইনামিকস
প্রথাগত ফুটবলগুলো সাধারণত অনেকগুলো প্যানেল একসাথে সেলাই বা জোড়া দিয়ে তৈরি করা হতো। কিন্তু ট্রাইওন্ডা তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে সম্পূর্ণ নতুন ৪-প্যানেল কনস্ট্রাকশন। এর গভীর সিম বা জোড়াতালিগুলো এমনভাবে বৈজ্ঞানিকভাবে ডিজাইন করা হয়েছে, যাতে বলটি যখন বাতাসে ভেসে যাবে, তখন এর স্থায়িত্ব ও ভারসাম্য চমৎকার থাকে; জাবুলানির মতো অদ্ভুত আচরণ করবে না। এছাড়া প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান অ্যাডিডাসের দাবি, এই বিশেষ উপরিভাগের কারণে বৃষ্টি বা ভেজা আবহাওয়াতেও বলের ওপর খেলোয়াড় ও গোলরক্ষকদের গ্রিপ বা নিয়ন্ত্রণ অনেক গুণ বৃদ্ধি পাবে।
আধুনিক ফুটবলে প্রযুক্তি ইতিমধ্যেই খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স ট্র্যাকিং থেকে শুরু করে স্টেডিয়ামের ক্যামেরা অ্যালগরিদম পর্যন্ত সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে। ট্রাইওন্ডা বলটি সেই প্রযুক্তিগত বিপ্লবের একদম কেন্দ্রে অবস্থান করছে।
তবে প্রযুক্তির বাইরে, এই বলের আসল মহাত্ম্য তৈরি হবে মাঠের পারফরম্যান্সে। কোনো বল ফুটবল ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠে তার চমৎকার সব গোল, বিতর্কিত সিদ্ধান্ত কিংবা আনন্দ-বেদনার মহাকাব্যিক সব মুহূর্তের মধ্য দিয়ে। ৪৮টি দলের এই ঐতিহাসিক বিশ্বকাপে ট্রাইওন্ডা কেবল ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকবে না, বরং প্রযুক্তি দিয়ে সেই ইতিহাসকে নিখুঁতভাবে রেকর্ড করতে সাহায্য করবে।