images

স্পোর্টস / ফুটবল

বিধ্বস্ত জনপদ থেকে ফুটবলের জয়গানে বিশ্বমঞ্চে হাইতি

স্পোর্টস ডেস্ক

০৮ জুন ২০২৬, ০৩:২৯ পিএম

কল্পনা করুন, একটি দেশ যেখানে প্রতিদিন বন্দুকের আওয়াজ আর অনিশ্চয়তার ছায়া ঘনিয়ে থাকে, সেখান থেকে উঠে এসে ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে পা রাখা। হাইতি ঠিক তাই করেছে। ১৯৭৪ সালের পর প্রথমবারের মতো ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে জায়গা করে নিয়ে ক্যারিবীয় এই দ্বীপরাষ্ট্র ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয় জয় করে নিয়েছে। এই যোগ্যতা অর্জন কোনো সাধারণ সাফল্য নয়, এটি একটি জাতির অদম্য মানসিকতা আর লড়াইয়ের জয়গান।

হাইতির ইতিহাস সবসময় সংগ্রামের। রাজনৈতিক অস্থিরতা, গৃহযুদ্ধ, ভূমিকম্প আর সাম্প্রতিককালের গ্যাং ভায়োলেন্স দেশটাকে বিপর্যস্ত করেছে। রাজধানী পোর্ট-অ-প্রিন্সের বড় বড় স্টেডিয়ামসহ অনেক এলাকা গ্যাংদের নিয়ন্ত্রণে। ফলে জাতীয় দলের ফুটবলাররা নিজ দেশের মাটিতে একটিও হোম ম্যাচ খেলতে পারেনি। সব 'হোম' ম্যাচ হয়েছে কুরাসাওয়ের নিরপেক্ষ ভেন্যুতে। কোচ সেবাস্তিয়েন মিগনে নিজেও দেশে পা রাখতে পারেননি নিরাপত্তার কারণে। তবু এই প্রতিকূলতার মাঝে দলটি অসাধ্য সাধন করেছে।

যোগ্যতা অর্জনের নাটকীয় গল্প

কনকাকাফ বাছাইপর্বে হাইতি (লেস গ্রেনাডিয়ার্স) দ্বিতীয় রাউন্ডে কুরাসাওয়ের পিছনে দ্বিতীয় হয়ে তৃতীয় রাউন্ডে উঠে। সেখানে কোস্টারিকা, হন্ডুরাস ও নিকারাগুয়ার সঙ্গে গ্রুপে লড়াই করে শেষ ম্যাচে নিকারাগুয়াকে ২-০ গোলে হারিয়ে গ্রুপের শীর্ষে উঠে সরাসরি বিশ্বকাপে জায়গা করে নেয়। এই জয়ের দিনটি ছিল হাইতির ইতিহাসে বিশেষ। ভের্তিয়েরেসের যুদ্ধের বার্ষিকী, যা হাইতীয় বিপ্লবের শেষ বড় লড়াই।

দেশে উদযাপন হয়েছে রাস্তায় রাস্তায়। কিন্তু ফুটবলাররা সেই আনন্দ সরাসরি অনুভব করতে পারেননি। তারা নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে লড়াই চালিয়ে গেছেন। এটি ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এমন দল যারা নিজ দেশে একটি ম্যাচ না খেলে বিশ্বকাপে উঠেছে।

দল পরিচিতি: অভিজ্ঞতা আর তরুণ প্রতিভার মিশ্রণ

হাইতি দলের স্কোয়াডে বড় বড় ইউরোপীয় তারকা নেই, কিন্তু আছে অভিজ্ঞতা, দৃঢ়তা আর ক্ষুধা। কোচ সেবাস্তিয়েন মিগনে (ফরাসি) দলকে আধুনিক, দ্রুত ট্রানজিশনভিত্তিক ফুটবল খেলতে শিখিয়েছেন। ৪-৪-২ বা ৪-২-৩-১ ফর্মেশনে তারা শক্তিশালী ডিফেন্স থেকে দ্রুত আক্রমণে যায়।

গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়রা

ডাকেন্স নাজন (স্ট্রাইকার) দলের সর্বকালের সেরা গোলদাতা। বাছাইপর্বে ৬ গোল, কোস্টারিকার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক। ইরানের ক্লাবে খেললেও দেশের জন্য সবসময় উপস্থিত। তার লড়াকু মানসিকতা দলের প্রতীক। জোহনি প্লাসিদ (গোলকিপার ও অধিনায়ক) অভিজ্ঞতায় ভরপুর, ডিফেন্সের নেতৃত্ব দেন। উইলসন ইসিডর (স্ট্রাইকার) সান্ডারল্যান্ডে খেলেন, সম্প্রতি হাইতির হয়ে খেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। গতি ও দক্ষতায় ভয়ঙ্কর।

জাঁ-রিকনার বেলেগার্ড (মিডফিল্ডার) উলভারহ্যাম্পটনের খেলোয়াড়, মাঝমাঠের ইঞ্জিন। ড্যানলে জ্যাঁ জ্যাক (মিডফিল্ডার): ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়নে খেলেন, ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডে অপরিহার্য। রুবেন প্রভিডেন্স (উইঙ্গার): তরুণ প্রতিভা, একক দক্ষতায় ম্যাচ ঘুরিয়ে দিতে পারেন। ফ্রানজডি পিয়েরো, রিকার্ডো আদে, কার্লেন্স আর্কুস সহ অন্যরা দলকে ভারসাম্য দিয়েছেন।

স্কোয়াডে বেশিরভাগ খেলোয়াড় ডায়াসপোরা থেকে আসা, কয়েকজন হাইতিতে থাকেন। একজন হাইতি-ভিত্তিক খেলোয়াড়ের ভিসা জটিলতাও ছিল, কিন্তু সব বাধা পেরিয়ে দল এক হয়েছে।

গ্রুপ পর্বের চ্যালেঞ্জ

হাইতি গ্রুপ সি-তে ব্রাজিল, মরক্কো ও স্কটল্যান্ডের সঙ্গে লড়বে। কাগজে-কলমে তারা সবচেয়ে দুর্বল, কিন্তু ফুটবলে কিছুই অসম্ভব নয়। প্রথম ম্যাচ স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে (১৩ জুন, বোস্টন), তারপর ব্রাজিল (১৯ জুন) ও মরক্কো (২৪ জুন)। লক্ষ্য অন্তত একটি পয়েন্ট বা নক-আউটে ওঠা—যা তাদের জন্য ঐতিহাসিক হবে।

১৯৭৪ সালে হাইতি তিন ম্যাচে ১৪ গোল খেয়েছিল। এবার তারা আরও প্রস্তুত, আরও ঐক্যবদ্ধ। কোচ মিগনে বলেছেন, 'একটি ম্যাচে সবকিছু ঘটতে পারে। আমরা নতুন ইতিহাস লিখতে চাই।'  দলের খেলোয়াড়রা জানেন, তারা শুধু নিজেদের নয়, পুরো জাতির প্রতিনিধিত্ব করছেন।