০২ জুন ২০২৬, ০৪:১০ পিএম
লাতিন আমেরিকার দুই ফুটবল দৈত্য ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা শুধু বিশ্বকাপের সাফল্য আর জাদুকরী খেলার জন্য নয়, তাদের জার্সি ও পতাকার রঙ নিয়েও বিশ্বজুড়ে অসংখ্য ভক্তের মনে দাগ কেটেছে। পেলে, ম্যারাডোনা, রোনাল্ডো, মেসি, নেইমারের মতো কিংবদন্তিরা মাঠে যেমন ঝড় তুলেছেন, তেমনি তাদের জার্সির রঙও হয়ে উঠেছে আবেগ, ঐতিহ্য ও জাতীয় পরিচয়ের প্রতীক। এই দুই দেশের জার্সির পেছনের গল্প শুধু ফ্যাশন বা ডিজাইনের নয়, বরং দুঃখ, বিজয়, পরিবর্তন ও সৃজনশীলতার এক অসাধারণ মিশ্রণ।
ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসে ১৯৫০ সালের বিশ্বকাপ এক অমোচনীয় ক্ষত হয়ে আছে। নিজেদের মাঠে, রিও ডি জেনেইরোর বিখ্যাত মারাকানা স্টেডিয়ামে প্রায় দেড় লাখ দর্শকের সামনে উরুগুয়ের কাছে ২-১ গোলে হার। যা ‘মারাকানাজো’ নামে পরিচিত। সেই ম্যাচে ব্রাজিল প্রথমে লিড নিয়েছিল, কিন্তু উরুগুয়ের দুই গোলে স্বপ্ন ভেঙে যায়। শুধু হার নয়, এই পরাজয়ের পর পুরো দেশে শোকের ছায়া নেমে আসে। অনেকে এই হারের দায় চাপিয়েছিলেন সেই সময়ের গোলরক্ষক বারবোসার ওপর, যিনি কৃষ্ণাঙ্গ ছিলেন। জাতীয় দলের সাদা-নীল জার্সিকেও দোষারোপ করা হয়। এটাকে ‘অপর্যাপ্ত দেশপ্রেমের’ প্রতীক মনে করা হয়।
এই ট্র্যাজেডির পর ব্রাজিলিয়ান স্পোর্টস কনফেডারেশন নতুন জার্সির ডিজাইনের জন্য প্রতিযোগিতা আয়োজন করে। উদ্দেশ্য ছিল জাতীয় পতাকার রঙগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা সবুজ (আমাজনের প্রতীক), হলুদ (খনিজ সম্পদ), নীল (আকাশ) এবং তারকা (প্রদেশ ও ফেডারেল ইউনিটের প্রতিনিধিত্ব)। ১৯৫৩ সালে সংবাদপত্র ‘কোরেইও দা মানহা’র আয়োজিত এই প্রতিযোগিতায় প্রায় ৩০০-৪০০টি ডিজাইন জমা পড়ে। বিজয়ী হয় ১৯ বছর বয়সী তরুণ ডিজাইনার আলদির গার্সিয়া শ্লি-এর তৈরি হলুদ জার্সি, যা ‘ক্যানারিনহো’ (ছোট ক্যানারি পাখি) নামে বিখ্যাত হয়।
আলদির ছিলেন উরুগুয়-সীমান্তবর্তী পেলোতাসের বাসিন্দা এবং আশ্চর্যজনকভাবে উরুগুয়ের সমর্থক! তবু তার ডিজাইন নির্বাচিত হয়। ১৯৫৪ সালে চিলির বিপক্ষে প্রথম এই জার্সি পরে খেলে ব্রাজিল জয়লাভ করে। এরপর থেকে এই হলুদ-সবুজ জার্সিতে ব্রাজিল পাঁচবার বিশ্বকাপ জিতেছে (১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৭০, ১৯৯৪, ২০০২)। আলদির ২০১৯ সালে মারা যাওয়ার আগে দেখে গেছেন তার সৃষ্টির সাফল্য।
ব্রাজিলের জার্সির এই পরিবর্তন শুধু রঙের নয়, মানসিকতারও। সাদা জার্সি থেকে হলুদে আসার পর দল আরও আক্রমণাত্মক ও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। ১৯৭০ সালের বিশ্বকাপে পেলে, জার্জিনহো, তোস্তাওদের সেই অমর দল এই জার্সিকে অমরত্ব দিয়েছে। আজও ক্যানারিনহো বিশ্বের সবচেয়ে আইকনিক ফুটবল জার্সির একটি।
আর্জেন্টিনার জাতীয় জার্সি ‘আলবিসেলেস্তে’ (আকাশী-নীল ও সাদা) সরাসরি জাতীয় পতাকা থেকে অনুপ্রাণিত। ১৯ শতকের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় থেকে এই রঙ দলের সঙ্গে জড়িত। এটি আকাশের নীল এবং মেঘের সাদার প্রতীক হিসেবে পরিচিত।
তবে ১৯৮৬ বিশ্বকাপে এক অবিস্মরণীয় ঘটনা ঘটে। মেক্সিকোর তীব্র গরমে খেলোয়াড়দের স্বস্তির জন্য কোচ কার্লোস বিলার্দো চেয়েছিলেন হালকা জার্সি। কিন্তু ইংল্যান্ডের সঙ্গে কোয়ার্টার ফাইনালে রঙের সংঘাত এড়াতে ডার্ক ব্লু অ্যাওয়ে জার্সি দরকার ছিল। সময়মতো অফিসিয়াল জার্সি পাওয়া যায়নি। কোচিং স্টাফরা মেক্সিকো সিটির টেপিতো মার্কেট থেকে স্থানীয় দোকান থেকে গাঢ় নীল জার্সি কিনে আনেন মোট ৩৭টি! সেই অপ্রত্যাশিত জার্সিতে ডিয়েগো ম্যারাডোনা ‘হ্যান্ড অব গড’ এবং ‘সেঞ্চুরি অব দ্য সেঞ্চুরি’ দুই অমর গোল করে আর্জেন্টিনাকে সেমিফাইনালে তুলে নেন। ফাইনালে অবশ্য তারা আকাশী-নীল জার্সিতেই জার্মানিকে হারিয়ে বিশ্বকাপ জিতে নেয়।
সেই গাঢ় নীল জার্সি আজও আর্জেন্টিনার অ্যাওয়ে কিট হিসেবে রেট্রো সংস্করণে জনপ্রিয়। ম্যারাডোনার জাদুতে এটি হয়ে উঠেছে কিংবদন্তি। ২০২২ সালে মেসির নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা আবার বিশ্বকাপ জিতলে আলবিসেলেস্তে আবার বিশ্বের আলোচনায় উঠে আসে।
ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার ফুটবল শুধু খেলা নয়, এটি তাদের জাতীয় আত্মার প্রকাশ। ব্রাজিলের সাম্বা রিদম, জোগা বোনিতো (সুন্দর খেলা) এবং আর্জেন্টিনার ট্যাঙ্গোর তীব্রতা দুইয়ের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা। কোপা আমেরিকা, বিশ্বকাপ কোয়ালিফায়ারে তাদের ম্যাচ ‘সুপারক্লাসিকো’ হয়ে ওঠে।
ব্রাজিলের জার্সি আজও নাইকির সঙ্গে জড়িত এবং প্রতি বিশ্বকাপে সামান্য পরিবর্তন আসে, কিন্তু মূল রঙ অপরিবর্তিত। আর্জেন্টিনার অ্যাডিডাস জার্সিও একইভাবে ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। এই জার্সিগুলো শুধু খেলোয়াড়দের নয়, লক্ষ লক্ষ সমর্থকেরও পরিচয়। রাস্তায়, স্টেডিয়ামে, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে এই রঙ দেখলেই ফুটবলপ্রেমীরা উন্মাদ হয়ে ওঠেন।
এভাবেই মারাকানাজোর দুঃখ থেকে জন্ম নিয়েছে ব্রাজিলের ক্যানারিনহো জার্সি, আর মেক্সিকোর বাজারের সাধারণ জার্সি হয়ে উঠেছে আর্জেন্টিনার ম্যারাডোনার অমরত্বের সাক্ষী। ফুটবলের এই রোমাঞ্চই বিশ্বকে এক করে।