স্পোর্টস ডেস্ক
০১ জুন ২০২৬, ০২:৫৬ পিএম
মাত্র দশ দিন। ১১ জুন বাংলাদেশ সময় দিবাগত রাত ১টায় মেক্সিকো সিটির অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামে গড়াবে ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর উদ্বোধনী ম্যাচ। এবারের আসরটি ইতিহাসে সবচেয়ে বড়—৪৮টি দলের অংশগ্রহণ, তিন দেশের (যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো) যৌথ আয়োজন। কিন্তু শুধু সংখ্যা বা আয়োজন নয়, এবারের বিশ্বকাপে ফুটবলের নিয়ম-কানুনেও এসেছে বড় পরিবর্তন। ফুটবলের আইন প্রণয়নকারী সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বোর্ড (আইএফএবি) অনুমোদিত এসব নতুন নিয়ম খেলাকে আরও দ্রুত, ন্যায্য, আকর্ষণীয় এবং সমস্যামুক্ত করার লক্ষ্যে আনা হয়েছে।
ফিফার প্রধান রেফারিং কর্মকর্তা পিয়েরলুইজি কলিনা বলেছেন, 'আমরা চাই মাঠে বৈষম্য কমুক, সময় নষ্ট কমুক, খেলার গতি বাড়ুক এবং খেলোয়াড়-দর্শক উভয়ের অভিজ্ঞতাই সমৃদ্ধ হোক।' নতুন নিয়মগুলো ইতোমধ্যে বিভিন্ন টুর্নামেন্টে পরীক্ষিত হয়েছে এবং বিশ্বকাপে পূর্ণাঙ্গভাবে প্রয়োগ করা হবে। এই পরিবর্তনগুলো ফুটবলকে আরও আধুনিক ও পেশাদার করে তুলবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সবচেয়ে আলোচিত নিয়মটি হলো মুখ ঢেকে কথা বলা। কোনো খেলোয়াড় বিতর্কিত পরিস্থিতিতে হাত, বাহু বা জার্সি দিয়ে মুখ ঢেকে কথা বললে তাকে সরাসরি লাল কার্ড দেখানো হবে। এই নিয়মের উদ্দেশ্য বর্ণবাদ, অশালীন মন্তব্য বা উসকানিমূলক আচরণ রোধ করা। তবে সতীর্থ বা প্রতিপক্ষের সঙ্গে স্বাভাবিক, বন্ধুত্বপূর্ণ কথোপকথনের সময় মুখ ঢেকে রাখলে কোনো শাস্তি দেওয়া হবে না।
এই নিয়ম চালু করার পেছনে রয়েছে বেনফিকার জিয়ানলুকা প্রেস্তিয়ান্নির একটি ঘটনা। ইউয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগে মুখ ঢেকে বর্ণবাদী মন্তব্য করার অভিযোগে তাকে ছয় ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। নতুন নিয়মটি রেফারিদের জন্য স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে. যাতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলেই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া যায়। এটি খেলোয়াড়দের আচরণে আরও শৃঙ্খলা আনবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
রেফারির সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে মাঠ ছেড়ে চলে যাওয়া এখন সরাসরি লাল কার্ডের কারণ হবে। টিম কর্মকর্তারা যদি খেলোয়াড়দের এমন আচরণে উসকানি দেন, তাদের ক্ষেত্রেও একই শাস্তি। আর যদি পুরো দল ম্যাচ পরিত্যাগ করে, তাহলে সেই দল স্বয়ংক্রিয়ভাবে ম্যাচ হেরে যাবে।
এই পরিবর্তন এসেছে আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের ফাইনালে সেনেগালের মরক্কোর বিপক্ষে মাঠ ছাড়ার ঘটনার পর। আইএফএবি চায়, খেলা যেন কোনোভাবেই বন্ধ না হয় এবং দলগুলো রেফারির সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে খেলা চালিয়ে যায়। এতে প্রতিবাদের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হবে কি না; এ নিয়ে কিছু বিতর্ক থাকলেও, খেলার ধারাবাহিকতা রক্ষায় এটি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
খেলার গতি বাড়ানোর জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত নিয়ম হলো থ্রো-ইন ও গোল-কিকে ৫ সেকেন্ডের দৃশ্যমান কাউন্টডাউন। রেফারি কাউন্টডাউন শুরু করবেন এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বল ইন-প্লে না করলে প্রতিপক্ষ দলকে থ্রো-ইন অথবা কর্নার কিক দেওয়া হবে।
এই নিয়মটি ম্যাচের প্রতিটি মুহূর্তকে আরও গতিশীল করবে। আগে দেখা যেতো খেলোয়াড়রা সময় কাটানোর জন্য বল নিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে দেরি করতেন। নতুন নিয়ম সেই সুযোগ অনেকাংশে কমিয়ে দেবে।
খেলোয়াড় বদলের ক্ষেত্রেও এসেছে কড়া বিধিনিষেধ। বদলি হওয়া খেলোয়াড়কে ১০ সেকেন্ডের মধ্যে মাঠ ছাড়তে হবে এবং সবচেয়ে কাছের সাইড লাইন দিয়ে বের হতে হবে। যদি এই সময় মেনে না চলা হয়, তাহলে নতুন খেলোয়াড়কে পরবর্তী খেলা বন্ধ হওয়ার পর অন্তত এক মিনিট অপেক্ষা করে রেফারির অনুমতি নিয়ে মাঠে ঢুকতে হবে।
চোট বা নিরাপত্তাজনিত কারণে এই নিয়ম শিথিল থাকবে। এই পরিবর্তন দলগুলোকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করবে এবং অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব কমাবে।
কোনো খেলোয়াড় মাঠের মধ্যে চিকিৎসা নিলে পরবর্তী রিস্টার্টের পর তাকে অন্তত এক মিনিটের জন্য মাঠের বাইরে থাকতে হবে। এটি সময় নষ্ট রোধ করবে। তবে গোলরক্ষকের চোট, মাথায় আঘাত (কনকাশন), বা একই দলের দুই খেলোয়াড়ের সংঘর্ষের ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রযোজ্য হবে না। এতে খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্যের নিরাপত্তাও নিশ্চিত থাকবে।
২০১৭ সালে চালু হওয়া ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) এবার আরও ক্ষমতাশালী হয়েছে। ভিএআর এখন হস্তক্ষেপ করতে পারবে যদি- ভুলভাবে লাল বা হলুদ কার্ড দেওয়া হয়। ভুল খেলোয়াড়কে শাস্তি দেওয়া হয়। ভুল কর্নার কিক দেওয়া হয়। সেট-পিস শুরুর আগে কোনো ফাউল উপেক্ষিত হয়।
এসব ক্ষেত্রে ভিএআর অন-ফিল্ড রিভিউয়ের সুপারিশ করবে এবং প্রয়োজনে সিদ্ধান্ত সংশোধন করা হবে। এতে বড় ধরনের ভুলের সম্ভাবনা অনেক কমে আসবে।
প্রতি অর্ধে একবার ৩ মিনিটের হাইড্রেশন ব্রেক রাখা হবে, সাধারণত ২২ মিনিটের কাছাকাছি। গরম আবহাওয়ায় খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্য রক্ষায় এটি গুরুত্বপূর্ণ। রেফারি পরিস্থিতি অনুসারে সময় পরিবর্তন করতে পারবেন। অন্যদিকে, গোলরক্ষক আহত হলে দলকে কোচিং স্টাফের সঙ্গে টাইম-আউট নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে না। এটি সময় নষ্ট রোধ করবে।
এসব নিয়ম খেলার গতি বাড়াবে, দর্শকদের বিনোদন বৃদ্ধি করবে এবং অপ্রীতিকর ঘটনা কমাবে। তবে কিছু খেলোয়াড় ও কোচের মতে, এত কড়া নিয়ম খেলোয়াড়দের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে সাবস্টিটিউশন ও চিকিৎসার নিয়ম নিয়ে কিছু উদ্বেগ রয়েছে।
তবু ফিফা আশাবাদী। বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে এই নিয়মগুলো সফলভাবে প্রয়োগ করা গেলে ভবিষ্যতে সব টুর্নামেন্টে এগুলো স্থায়ী হয়ে যাবে। ফুটবলপ্রেমীরা অপেক্ষায় আছেন, নতুন নিয়ম কীভাবে তারকা খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলে এবং কোন দল এই পরিবর্তনের সুবিধা সবচেয়ে বেশি নিতে পারে।