২৬ মে ২০২৬, ১১:৫৫ এএম
ফুটবল ইতিহাসে এমন কিছু রাত আছে, যেগুলো শুধু একটি ম্যাচ নয় একটি জাতির পুনর্জন্মের গল্প। ১৯৫৪ সালের ৪ জুলাই সুইজারল্যান্ডের বার্নে ঠিক তেমনই এক অলৌকিক গল্প লিখেছিল পশ্চিম জার্মানি। সেই ম্যাচ ইতিহাসে অমর হয়ে আছে 'মিরাকল অব বার্ন' নামে। আর সেই রাতেই ভেঙে গিয়েছিল দুর্দান্ত হাঙ্গেরির বিশ্বজয়ের স্বপ্ন।
জার্মান-হাঙ্গেরি এটি ছিল কেবল একটি ফাইনাল নয়, বরং যুদ্ধবিধ্বস্ত এক দেশের আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার লড়াই।
১৯৫৪ বিশ্বকাপের আগে হাঙ্গেরিকে বলা হতো 'ম্যাজিক ম্যাজার্স'। ফেরেঙ্ক পুসকাসের নেতৃত্বে দলটি টানা ৩০ ম্যাচ অপরাজিত ছিল। তারা ইংল্যান্ডকে ওয়েম্বলিতে ৬-৩ গোলে হারিয়ে ইউরোপ কাঁপিয়ে দিয়েছিল। একই বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে পশ্চিম জার্মানিকে ৮-৩ গোলে উড়িয়ে দেয় হাঙ্গেরি। ফলে ফাইনালে সবাই ধরেই নিয়েছিল, ট্রফি উঠবে হাঙ্গেরির হাতেই।

কিন্তু বার্নের বৃষ্টিভেজা রাতে ফুটবল লিখল অন্য চিত্রনাট্য। ম্যাচের প্রথম ৮ মিনিটেই ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় হাঙ্গেরি। মনে হচ্ছিল আরেকটি গোলবন্যা অপেক্ষা করছে। কিন্তু সেখান থেকেই ঘুরে দাঁড়ায় জার্মানি। ম্যাক্স মরলক ও হেলমুট রানের গোলে সমতা ফেরানোর পর ৮৪ মিনিটে রান করেন সেই ঐতিহাসিক গোল। যা বদলে দেয় জার্মান ফুটবলের ভাগ্য। পশ্চিম জার্মানি জিতে নেয় বিশ্বকাপ ৩-২ ব্যবধানে।
সেই ম্যাচ শুধু একটি ট্রফি দেয়নি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে থাকা জার্মান জনগণকে ফিরিয়ে দিয়েছিল আত্মবিশ্বাস। কিংবদন্তি ফ্রানজ বেকেনবাউয়ার পরে বলেছিলেন, 'বার্নের সেই জয় জার্মানিকে আবার মাথা তুলে দাঁড়াতে শিখিয়েছিল।'
সেই অলৌকিক রাতের পর আর পিছনে তাকাতে হয়নি জার্মানদের। চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানি বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে ধারাবাহিক দলগুলোর একটি। তাদের অর্জন- বিশ্বকাপ শিরোপা ১৯৫৪, ১৯৭৪, ১৯৯০, ২০১৪। মোট বিশ্বকাপ অংশগ্রহণ ২১ বার। ফাইনাল খেলেছে ৮ বার। বিশ্বকাপে ম্যাচ জয় ৬৮। মোট গোল ২৩২। মিরোস্লাভ ক্লোসা বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা (১৬ গোল)।

আর টমাস মুলার, গের্ড মুলার, লোথার ম্যাথিউস দের মতো তারকারা গড়ে তুলেছেন জার্মান ফুটবলের ঐতিহ্য। তবে সাম্প্রতিক সময়টা ছিল কঠিন। ২০১৮ ও ২০২২ টানা দুই বিশ্বকাপেই গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নেয় জার্মানি। যা দেশটির ফুটবল ইতিহাসে বিরল এক অন্ধকার অধ্যায়।
তবে ২০২৬ বিশ্বকাপে নতুন জার্মানির উত্থান? এখন আবার নতুন স্বপ্ন দেখছে জার্মানি। কোচ জুলিয়ান নাগেলসম্যান তরুণদের নিয়ে তৈরি করছেন নতুন এক দল। জামাল মুসিয়ালা, ফ্লোরিয়ান উইর্টজ, কাই হাভার্টজ ও লেরয় সানেদের ঘিরে আবারও বিশ্বমঞ্চে ভয়ংকর হয়ে উঠছে চারবারের চ্যাম্পিয়নরা।
২০২৬ বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে স্লোভাকিয়াকে ৬-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে দাপটের সঙ্গে মূলপর্ব নিশ্চিত করেছে জার্মানি। ফুটবল ইতিহাস বলে, জার্মানিকে কখনোই শেষ ভাবা যায় না। কারণ তারা শুধু একটি দল নয়, তারা প্রত্যাবর্তনের প্রতীক। ১৯৫৪ সালে তারা হাঙ্গেরির স্বপ্ন ভেঙে নিজেদের ইতিহাস লিখেছিল। ২০২৬ সালে সেই জার্মানি আবারও কি বিশ্বফুটবলের সিংহাসনে ফিরবে?