images

স্পোর্টস / ফুটবল

এক আত্মঘাতী গোল যেভাবে কেড়ে নিয়েছিল জীবন

স্পোর্টস ডেস্ক

২০ মে ২০২৬, ১০:০৮ এএম

কলম্বিয়ার ইতিহাসে 'এস্কোবার' নামটি উচ্চারণ হলেই সামনে আসে দুই ভিন্ন চরিত্রের গল্প। একজন কুখ্যাত ড্রাগ সম্রাট পাবলো এস্কোবার, আর অন্যজন ফুটবল মাঠের ভদ্র ও নিরহংকার এক যোদ্ধা আন্দ্রেস এস্কোবার। দুই জনের জীবনপথ ছিল সম্পূর্ণ আলাদা, কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস তাদের মৃত্যুই জড়িয়ে আছে সহিংসতা আর কলম্বিয়ার অস্থির সময়ের সঙ্গে।

আন্দ্রেস এস্কোবার ছিলেন এমন একজন ফুটবলার, যিনি কঠোর ডিফেন্স খেলেও কখনও আগ্রাসী আচরণের জন্য পরিচিত ছিলেন না। শান্ত স্বভাব, পরিচ্ছন্ন ফুটবল আর প্রতিপক্ষের প্রতি সম্মান দেখানোর কারণে তাকে বলা হতো 'ফুটবলের ভদ্রলোক'। কলম্বিয়ার ক্লাব আতলেতিকো ন্যাশনালের হয়ে খেলতে খেলতেই তিনি খ্যাতির শীর্ষে পৌছান। ১৯৮৯ সালে ক্লাবটির ঐতিহাসিক কোপা লিবার্তাদোরেস জয়ে বড় ভূমিকা ছিল তার।

তার পারফরম্যান্সে মুগ্ধ ছিল ইউরোপের বড় বড় ক্লাবও। ইতালির ঐতিহ্যবাহী ক্লাব এসি মিলানে যোগ দেওয়ার আলোচনা চলছিল। অনেকেই তাঁকে কিংবদন্তি ডিফেন্ডার ফ্রাঙ্কো বারেসির সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে দেখছিলেন।

১৯৯৪ সালের ফিফা বিশ্বকাপে কলম্বিয়াকে টুর্নামেন্টের অন্যতম শক্তিশালী দল ধরা হচ্ছিল। দলটির ওপর ছিল প্রবল প্রত্যাশার চাপ। সেই সময় দেশজুড়ে ড্রাগ কার্টেলের প্রভাবও ভয়াবহ ছিল। ফুটবল ও অবৈধ জুয়ার সঙ্গে অপরাধচক্রের যোগ নিয়ে নানা অভিযোগও ছিল।

২২ জুন, যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ঘটে সেই দুঃস্বপ্নের মুহূর্ত। প্রতিপক্ষের একটি ক্রস ঠেকাতে গিয়ে ভুলবশত নিজের জালেই বল পাঠিয়ে দেন আন্দ্রেস এস্কোবার। আত্মঘাতী সেই গোলের পর ২-১ ব্যবধানে হেরে যায় কলম্বিয়া এবং বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয় দল।

ফুটবল মাঠের একটি ভুল যে এত ভয়ংকর পরিণতি ডেকে আনতে পারে, তা আন্দ্রেসের ঘটনায় দেখায়। 

বিশ্বকাপ শেষে দেশে ফেরার পর ঘনিষ্ঠজনেরা তাকে সতর্ক থাকতে বলেছিলেন। উত্তেজিত সমর্থক ও অপরাধচক্রের হুমকির খবরও ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু আন্দ্রেস স্বাভাবিক জীবনই বেছে নিতে চেয়েছিলেন।

Andres_Escobar

১৯৯৪ সালের ২ জুলাই বন্ধুদের সঙ্গে মেডেলিনের একটি নাইটক্লাবে যান তিনি। পরে পার্কিং এলাকায় কয়েকজনের সঙ্গে কথাকাটাকাটির এক পর্যায়ে তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলাকারী প্রতিটি গুলির সময় বিদ্রূপ করে 'গোল!' বলে চিৎকার করছিল।

মাত্র ২৭ বছর বয়সে প্রাণ হারান আন্দ্রেস এস্কোবার। তার মৃত্যুর মাত্র এক বছর আগেই নিহত হয়েছিল পাবলো এস্কোবার।

এই হত্যাকাণ্ডে পরে দায় স্বীকার করে হাম্বার্তো কাস্ত্রো মুনিয়োজ নামের এক ব্যক্তি। সে ছিল গ্যালোন ব্রাদার্স চক্রের সহযোগী ও চালক। আদালত তাকে ৪৩ বছরের কারাদণ্ড দিলেও প্রায় ১১ বছর কারাভোগের পর প্যারোলে মুক্তি পেয়ে যায়।

আন্দ্রেস এস্কোবারের মৃত্যু শুধু একটি হত্যাকাণ্ড ছিল না; এটি ছিল সেই সময়ের কলম্বিয়ার অন্ধকার বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। ফুটবল, মাদকচক্র, অবৈধ জুয়া এবং সহিংসতার ভয়াবহ সম্পর্ক তখন বিশ্ববাসীর সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মেডেলিনে তার শেষকৃত্যে লাখের বেশি মানুষ অংশ নিয়েছিল। আজও তিনি স্মরণীয় শান্ত, সৎ এবং মানবিক এক ফুটবলারের প্রতীক হিসেবে।