১৭ মে ২০২৬, ০৪:৩১ পিএম
১৯৮২ সালের স্পেন বিশ্বকাপ। এল সালভাদরের তরুণ গোলরক্ষক লুইস রিকার্ডো গুয়েভারা মোরা (ডাকনাম ‘এল নেগ্রো’) মাত্র ২০ বছর বয়সে দাঁড়িয়েছিলেন বিশ্বমঞ্চে। শুরুতে বাস্কেটবল খেললেও পরে ফুটবলে মনোনিবেশ করা এই প্রতিভাবান খেলোয়াড় দেশের হয়ে জিতেছিলেন সেরা গোলরক্ষকের খেতাব। কিন্তু একটি ম্যাচ তার জীবনকে চিরতরে বদলে দেয়।
স্পেন বিশ্বকাপ ১৯৮২-এ এলচে শহরের নুয়েভো স্টেডিয়াম। হাঙ্গেরির বিপক্ষে এল সালভাদরের ম্যাচ। ফলাফল ১০-১। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এক ম্যাচে সবচেয়ে বেশি গোল খাওয়ার অবিস্মরণীয় (এবং অনাকাঙ্ক্ষিত) রেকর্ড গড়েন মোরা। এখনও পর্যন্ত কেউ এই রেকর্ড ভাঙতে পারেনি। হাঙ্গেরির হয়ে লাসজলো কিস মাত্র সাত মিনিটে হ্যাটট্রিক করেন, আর টিবর নাইলাসি, ফাজেকাসসহ অন্যরা মিলে গোলের বন্যা বইয়ে দেন।
মোরা সেদিন যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু দলের সামগ্রিক দুর্বলতা, অভিজ্ঞতার অভাব আর প্রতিপক্ষের তীব্র আক্রমণের সামনে একা কতটুকুই বা করতে পারেন একজন গোলরক্ষক? ম্যাচের পর তিনি নিজেই বলেছিলেন, এটা তাদের দেশের ইতিহাসের এক বেদনাদায়ক দিন।
দেশে ফেরার পর অপেক্ষা করছিল আরও কঠিন বাস্তবতা। সমর্থকদের কটূক্তি, অপমান, অতিরিক্ত সমালোচনা কোনো কিছুরই অভাব হয়নি। অনেকে তাকে দায়ী করতে শুরু করেন পুরো হারের জন্য। চার-পাঁচ বছর কেটে যাওয়ার পরও রাগ কমেনি। একদিন রাজধানীর কাছাকাছি রাস্তায় গাড়ি চালাচ্ছিলেন মোরা। হঠাৎ রাইফেলের গুলির শব্দ। গাড়িতে ২২টি বুলেটের গর্ত। কোনোমতে প্রাণে বেঁচে যান তিনি। পরে দুঃসহ ঘটনার সেই স্মৃতিচারণ নিজেই করেন ইউরোপের বিভিন্ন গণমাধ্যমে।
এই ঘটনা তাকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করে। স্পেনের রিয়াল মুর্সিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও গুয়েতেমালার ক্লাবে (যেমন ক্লাব জেলাজু এমসি, অরোরা এফসি) খেলে কাটিয়ে দেন বেশ কয়েক বছর। পরে দেশে ফিরে অ্যাটলেটিকো মার্তে, আলিয়ানজাসহ বিভিন্ন ক্লাবে খেলেন এবং ২০০৩ সালের দিকে অবসর নেন। জীবনের এই পর্যায়ে এসে তিনি বলেন, বিশ্বকাপে খেলার স্মৃতি এখনও তাকে গর্বিত করে, যদিও দুঃসহ অভিজ্ঞতাগুলো মাঝে মাঝে হানা দেয়।
কিন্তু ফুটবলকে কখনো ছাড়েননি মোরা। জাতীয় দলের গোলরক্ষক কোচ হিসেবে কাজ করেছেন, পরে প্লেয়ার-কোচ হয়ে নিচের ডিভিশনে নেমেও লড়াই করেছেন। বর্তমানে ৬৪ বছর বয়সী এই কিংবদন্তি এল সালভাদরের রাজধানীর কাছে এক যুব একাডেমিতে তরুণ ফুটবলারদের গড়ে তোলায় নিয়োজিত।
মোরার গল্প শুধু একজন গোলরক্ষকের ব্যর্থতার গল্প নয়। এটা যুদ্ধবিধ্বস্ত এল সালভাদরের (১৯৮০-এর দশকে গৃহযুদ্ধ চলছিল) এক প্রতিনিধির গল্প, যেখানে ফুটবল ছিল স্বপ্ন এবং সমালোচনা ছিল নির্মম। এটা দেখায়, বিশ্বকাপ মানে সবসময় গৌরব নয়। কখনো কখনো তা জীবনের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাও হয়ে দাঁড়ায়।
আজও যখন বিশ্বকাপে কোনো দল বড় ব্যবধানে হারে, অনেকে মোরার সেই ১০-১ ম্যাচের কথা স্মরণ করেন।